থমকে গিয়েছে সিলেটের সিটি করপোরেশনের বর্ধিত এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। প্রায় এক বছর ধরে বর্ধিত এলাকার ১৫টি ওয়ার্ডের বাসিন্দারা নানা দুর্ভোগকে সঙ্গী করে সময় পার করছে। বর্ষায় জলাবদ্ধতা, ভাঙাচোরা রাস্তা, সুপেয় পানির অভাব, ভঙ্গুর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, মশার অসহ্য যন্ত্রণা অতিষ্ঠ করে তুলছে বাসিন্দাদের। সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, বর্ধিত ওয়ার্ডের উন্নয়নে ৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে জমা রয়েছে। সেই প্রকল্প পাস হলেই সুফল পাবে বর্ধিত এলাকার বাসিন্দারা।
অন্যদিকে বর্ধিত এলাকায় প্রতিযোগিতা করে যেন গড়ে উঠছে বহুতল ভবন। অভিযোগ রয়েছে অনেকেই ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড মানছেন না। নগরবিদরা মনে করছেন পরিকল্পিত নগরী গড়তে বর্ধিত এলাকায় তদারকি বাড়ানো জরুরি।
সিলেট পৌরসভা থেকে ২০০১ সালে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) গঠিত হয়। ২৬ দশমিক ৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে যাত্রা হয় এ সিটি করপোরেশনের। এসব এলাকাকে ২৭টি সাধারণ ওয়ার্ড ও ৯টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে বিভক্ত করা হয়। ২০১৪ সালের ২২ জুলাই স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের তত্কালীন সিনিয়র সচিব বরাবর একটি চিঠি দিয়ে সিসিকের আয়তন বাড়ানোর বিষয়ে আবেদন করেন বর্তমান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। পরবর্তী সময়ে ২০১৫ সালের ২৩ জুন নগরীর বর্তমান আকারের প্রায় ছয় গুণ (১৭৯ বর্গকিলোমিটার) আয়তন বাড়ানোর একটি প্রস্তাব স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হয়। এরপর প্রয়োজনীয় জরিপ, মতামত গ্রহণ প্রভৃতি কাজ শেষে ২০২০ সালের ৯ আগস্ট সিসিকের আয়তন বাড়ানোর বিষয়ে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে জেলা প্রশাসন।
২০২১ সালের ২৬ জুলাই ঢাকায় প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস-সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির সভায় সিলেট নগরীর আয়তন ৩৩ বর্গকিলোমিটার বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন পায়। এরপর ২০২১ সালের আগস্টে বর্ধিত এলাকাগুলোকে ওয়ার্ডে বিভক্ত করে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। আগের ২৭টি সাধারণ ওয়ার্ডের সঙ্গে নতুন ১৫টি ওয়ার্ড মিলে সিসিকের সর্বমোট সাধারণ ওয়ার্ড সংখ্যা দাঁড়ায় ৪২-এ।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, সিসিকে অন্তর্ভুক্তি শুরু হওয়ার পর থেকে উন্নয়নবঞ্চিত বর্ধিত এলাকাগুলো। সিসিকের বর্ধিত এলাকায় আঞ্চলিক কার্যালয় রয়েছে সিসিকের। কিন্তু এক বছরেও ওই কার্যালয়গুলোর কোনো কার্যক্রম নেই। ফলে সমস্যার সঙ্গে ভোগান্তিও বাড়ছে।
নগরীর টুকেরবাজার ও তেমুখীর বাসিন্দারা জানান, সিসিকের বর্ধিত এলাকার উত্তরের ৩৮ ও ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডে যত্রতত্র পড়ে আছে গৃহস্থালি বর্জ্য। দুটি ওয়ার্ড যেন ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। এসব এলাকার সরকারি রাজস্ব আগে যেত ইউনিয়ন পরিষদে। ফলে ইউপি চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে কিছু কাজ করা সম্ভব হতো। কিন্তু এখন রাজস্ব চলে যায় সিসিকের তহবিলে। কিন্তু বিপরীতে উন্নয়নবঞ্চিত এসব এলাকার বাসিন্দারা। বাড়ির খাজনা, পয়োনিষ্কাশন, ড্রেনেজসহ সব খাতের টাকা জমা হচ্ছে সিসিকে। সর্বশেষ বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার জন্য চরম দুর্ভোগের শিকার হয়েছে বাসিন্দারা।
সিটি করপোরেশনের বর্ধিত ৩৯ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, তারা আগে টুকেরবাজার ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। টুকেরবাজার ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষে একসময় সাপ্লাইয়ের পানির ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সিসিকে অন্তর্ভুক্তির পর থেকে সেই পানি সরবরাহ অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। এতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় বাসিন্দাদের।
৩৮ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা গুলজার আহমদ বলেন, গত বর্ষা মৌসুমে বাসাবাড়িতে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছিল। তেমুখী পয়েন্টে লেগে থাকত জলাবদ্ধতা। বর্তমানে মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ এলাকাবাসী। পাড়া-মহল্লার রাস্তাঘাটও ভাঙাচোরা। এটা যেন দেখার কেউ নেই।
বর্ধিত এলাকা ৩৩ নং ওয়ার্ডের খাদিমপাড়ার শাহপরান মাজারসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, এখন সিটি করপোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করতে হয়। ট্যাক্স নেয়া শুরু করেছে অথচ উন্নয়নের খবর নেই। নাগরিক কোনো সুবিধা আমরা এখনো পাইনি।
দক্ষিণ সুরমার নবগঠিত ২৮ নং ওয়ার্ডের গাংগু এলাকার বাসিন্দা সুলেমান মিয়া জানান, মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ আমরা। কেউ যেন দেখার নেই। সব ক্ষেত্রেই অসুবিধা হচ্ছে।
৩২ নং ওয়ার্ডের ভাটপাড়ার বাসিন্দা সুমন মিয়া বলেন, যে প্রত্যাশা নিয়ে আমরা সিটি করপোরেশনে ঢুকেছিলাম, তার সিকিভাগও পাইনি। বলা হচ্ছে, হাজার কোটি টাকার প্রকল্প পাঠানো হয়েছে মন্ত্রণালয়ে। তবে কবে তা পাস হয়ে আসবে কেউ নির্দিষ্ট করে বলছে না।
সিলেট সদর উপজেলার টুকেরবাজার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শহীদ আহমদ জানান, ৩৭, ৩৮ ও ৩৯ নং ওয়ার্ড একসময় তার ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ছিল। গত বন্যা আমাদের এলাকায় সবক’টি রাস্তাঘাটের অবস্থা বেহাল করে গিয়েছে। এ ব্যাপারে উপজেলা পরিষদকে বলা হলে তাদের উত্তর—এটি এখন উপজেলা পরিষদের আওতাভুক্ত নয়, আরবান এরিয়া হিসেবে যুক্ত হয়েছে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকেও করা যাচ্ছে না। এখন যা করার সিটি করপোরেশনকেই করতে হবে।
লিডিং ইউনিভার্সিটির স্থাপত্য বিভাগের প্রধান রাজন দাস বলেন, সিলেট নগরের পরিসর বেড়েছে। এমনিতেই নগরীতে ড্রেনেজ ব্যবস্থা অপরিকল্পিত হওয়ার কারণে নাগরিকরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। যানজট, সুপেয় পানির সংকট, জলাবদ্ধতা, মশার উপদ্রবসহ নানা নাগরিক দুর্ভোগ তো আছেই। এর মধ্যে বর্ধিত এলাকা দ্রুততম সময়ে তদারকিতে নিয়ে আসা প্রয়োজন। বিশেষ করে বহুতল ভবন নির্মাণে যাতে বিল্ডিং কোড মানা হয় সেই বিষয়ে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে।
সিসিকের প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) নূর আজিজুর রহমান বলেন, ‘বর্ধিত এলাকার লোকজন বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে অনুমোদন নিতে আবেদন করে থাকেন। আমরা বিষয়টি তদারকিতে নিয়ে এসেছি।’
সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী জানান, আমরা ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের ডিপিপি (ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল) প্রণয়ন করে গত ফেব্রুয়ারিতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছি। প্রকল্পটি অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। তিনি বলেন, প্রকল্পটা পাস হলেই বর্ধিত এলাকার জনগণ সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার প্রকৃত সুফল পাবে।










