শিল্প ও পর্যটনের অপার সম্ভাবনা সত্ত্বেও যোগাযোগ অবকাঠামোর অভাবে পিছিয়ে ছিল বরিশাল। নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে কাজে না লাগানোর ফলে তেমন গড়ে ওঠেনি ভারী শিল্প-কারখানাও। তবে পদ্মা সেতু চালু হলে এ চিত্র অনেকটাই বদলে যাবে বলে আশাবাদী সংশ্লিষ্টরা।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, সেতুটি চালু হলে সড়কপথের উন্নয়নের পাশাপাশি অবকাঠামোরও উন্নয়ন হবে, যা ব্যবসা-বাণিজ্যেরও প্রসারে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। পদ্মা সেতু পুরোপুরি চালু হলে বরিশাল বিভাগের পর্যটন খাতে বিশেষ উন্নয়ন ঘটবে। পটুয়াখালী জেলার কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতসহ বরিশাল-পিরোজপুর ও ঝালকাঠি জেলার ভাসমান হাটবাজার, বরিশালের শাপলার বিল ঘিরে পর্যটকদের সমাগম বাড়বে। এসব পর্যটন এলাকা ঘিরে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে এবং কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার খুলবে। পদ্মা সেতু ঘিরে এ অঞ্চলে এরই মধ্যে গড়ে ওঠছে একের পর এক শিল্প-কারখানা, কৃষি শিল্প, পর্যটন শিল্প, স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ নানা প্রতিষ্ঠান। আর এসব খাতে উদ্যোক্তাদের নীরব প্রতিযোগিতায় সৃষ্টি হচ্ছে বিশাল কর্মসংস্থান। উন্নয়নের অপার সম্ভাবনাময় এ বরিশালের দিকে তাই সবার চোখ।

ঢাকা-বরিশাল-পটুয়াখালী মহাসড়কের দুই পাশে এখন কেবলই দেখা যায় অবকাঠামোগত উন্নয়নকাজ। বিশেষ করে দপদপিয়া, বিমানবন্দর, গড়িয়ার পাড়, শিকারপুর এলাকায় মহাসড়কের দুপাশে বেসরকারি খাতে অবকাঠামো উন্নয়ন চলছে একের পর এক। আর কলাপাড়া ছাড়িয়ে কুয়াকাটাসংলগ্ন সড়কে সাইনবোর্ডের যেন শেষ নেই। জানা গেছে, এ সবই হচ্ছে পদ্মা সেতুকে টার্গেট করে।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সদস্য ও বিএম কলেজের অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান  মো. আখতারুজ্জামান খান বলেন, পদ্মা সেতু দক্ষিণাঞ্চলের বিনিয়োগ ব্যবস্থার দ্বার খুলে দিয়েছে। সৃষ্টি হচ্ছে কর্মসংস্থান। পদ্মা সেতুকে ঘিরে এ অঞ্চলের মৎস্য, কৃষি, পর্যটন, অকাঠামো, ব্লু ইকোনমিসহ সব খাতের প্রসার ঘটবে। পায়রা বন্দরের আমদানি-রফতানির প্রভাব বরিশালের মানুষের ওপর পড়বে। পায়রা তাপবিদ্যুৎ ও ভোলার গ্যাস এ উন্নয়নকে আরো এক ধাপ এগিয়ে নেবে।

অর্থনীতিবিদ আক্তারুজ্জামান বলেন, দক্ষিণাঞ্চলে বিনিয়োগের জন্য এরই মধ্যে উদ্যোক্তাদের মধ্যে নীরব প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। পদ্মা থেকে পায়রা দুপাশে বিনিয়োগের গোল্ডেন লাইন সৃষ্টি হচ্ছে। তার মতে, বিশ্বব্যাংক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, পদ্মা সেতুর কারণে দক্ষিণাঞ্চলে এক ভাগ প্রবৃদ্ধি বেড়ে যাবে। এতে সারা দেশের প্রবৃদ্ধি বাড়বে শূন্য দশমিক ৬ ভাগ। তবে এক্ষেত্রে এখনই বৃহৎ পরিকল্পনা ও পরিবেশ সৃষ্টি করা দরকার।

তিনি বলেন, বরিশালে সাউথ অ্যাপোলো নামে একটি বেসরকারি হসপিটাল সম্প্রতি অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এখন দরকার ফাইভ স্টার হোটেল, আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম, কুয়াকাটার মাস্টারপ্ল্যান, আধুনিক বিমানবন্দর। এসব বাস্তবায়নে দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে মাস্টারপ্ল্যান দরকার। পরিবেশ রক্ষায় গড়তে হবে গ্রিন ইকোনমি।

বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি সদর উপজেলার চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান রিন্টু বলেন, পদ্মা সেতু এখন দৃশ্যমান। পদ্মা সেতু ঘিরে এ অঞ্চলে নানা ধরনের ইন্ডাস্ট্রি, গার্মেন্টস করার জন্য উদ্যোক্তারা আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এতে দক্ষিণাঞ্চলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এরই মধ্যে অনেকে জমি কিনে শিল্প-কারখানা করার জন্য প্রাথমিক কাজ শুরু করছে। এতে সুবিধা হলো, এ অঞ্চলের শ্রমিক এখানে কাজ করতে পারবেন। ফলে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়া যাবে।

চিকিৎসা খাতে বরিশালে বিনিয়োগকারী সাউথ অ্যাপোলো মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হসপিটালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইকবাল হোসেন তাপস বলেন, পদ্মা সেতুতে সময় এবং অর্থ উভয়ই সাশ্রয় হবে। এতে অবহেলিত দক্ষিণের মানুষের উন্নত চিকিৎসার জন্য দুর্ভোগ কমে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, এ অঞ্চলের প্রথম বেসরকারি হাসপাতাল হিসেবে সাউথ অ্যাপোলো মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হসপিটালকে সরকার চলতি মাসেই অনুমোদন দিয়েছে। ফলে বরিশাল বিভাগের রোগীরাসহ পদ্মার ওপারের মানুষও চাইলে ঢাকা না গিয়ে হয়তো বরিশালে আসবেন চিকিৎসা নিতে। বিভিন্ন এলাকার শিক্ষার্থীরা লেখাপড়ায় সুযোগ পাবে। পদ্মা সেতু চিকিৎসা ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

তার মতে, আমরা চিকিৎসাকে ব্যবসার পাশাপাশি সমাজসেবাও মনে করি। তাই এ অঞ্চলের মানুষের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে অগ্রাধিকার হিসেবে হার্ট, কিডনি ডায়ালাইসিসকে গুরুত্ব দেব।

এ ব্যাপারে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. সাদেকুল রহমান বলেন, পদ্মা সেতুর দুই পারের সংযোগে দক্ষিণের ২১ জেলার আর্থসামাজিক এবং শিক্ষা খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। এতে দেশের অন্যসব অঞ্চলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় সমভাবে এগিয়ে যাবে বরিশালের শিক্ষা খাত।