মূলত বর্ষা মৌসুমে পার্বত্যাঞ্চলে পাহাড় ধসের ঝুঁকি তৈরি হয়। টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে এক সময় তা ধসে পড়ে। ২০১৭ সালের ১৩ জুন রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধসে পাঁচ সেনা সদস্যসহ ১২০ জনের প্রাণহানি ঘটে। পরের বছর জুনে নানিয়ারচর উপজেলায় ফের পাহাড় ধসে দুই শিশুসহ ১১ জন এবং ২০১৯ সালের জুনে কাপ্তাইয়ে তিনজনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। জেলা প্রশাসনের তথ্য বলছে, রাঙ্গামাটির ১০ উপজেলা ও পৌরসভাসহ প্রায় ১০০টি এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় পাহাড় ধসের উচ্চ ঝুঁকি থাকলেও বন্ধ হয়নি বসতি স্থাপন। ঝুঁকিতে থাকা বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসনের কোনো উদ্যোগ নেয়নি স্থানীয় প্রশাসন।
এরই মধ্যে জেলার ১০০টি এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে জেলা প্রশাসন। এর মধ্যে রাঙ্গামাটি শহরেই রয়েছে ২৯টি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। জেলার ২০ হাজারের বেশি মানুষ ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে।
জেলা প্রশাসন বলছে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং, সচেতনতামূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করলেও বসতবাড়ি ছাড়তে রাজি নয় পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীরা।
২০১৭ সালের ১৩ জুন টানা বর্ষণে পাহাড় ধসে পাঁচ সেনা সদস্যসহ ১২০ জন ও ২০১৮ সালের ১১ জুন ১১ জনের প্রাণহানি হয়। ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাঙ্গামাটি শহরসহ বিভিন্ন উপজেলা। বন্ধ হয়ে যায় সারা দেশের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ। প্রাণহানির পাশাপাশি কৃষিজমি ও ঘরবাড়িরও ব্যাপক ক্ষতি হয়। এ ঘটনার পর পাহাড় কাটা ও পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসের বিষয়টি সামনে এলেও রোধ করা যায়নি বসতি স্থাপন। তবে নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসন করলে যেতে রাজি সাধারণ মানুষ। নিরুপায় হয়ে পাহাড়ে বসবাস করতে হচ্ছে বলে দাবি তাদের।
শহরের রূপনগর এলাকার বাসিন্দা সোমেলা আক্তার বলেন, ২০১৭ সালে ঘটনা মনে হলে ভয় লাগে। সেদিন আমাদের পাশের বাড়ির একটি পরিবারের সবাই মারা যান। তাদের মরদেহ খুঁজে পাওয়া যায়নি। এখন ঝড়-বৃষ্টি হলে প্রশাসনের লোকজন আসেন, আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে বলেন। ভয় লাগলেও ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে মন চায় না।’
একই এলাকার শাহনাজ বেগম বলেন, ‘আমরা গরিব বলেই পাহাড়ে থাকি। বৃষ্টি হলে তো ভয় লাগে, কিন্তু আমাদের তো যাওয়ার জায়গায় নেই। শুধু বৃষ্টি হলে প্রশাসনের লোকজন আসেন, এরপর আর খবর রাখেন না। আমরা চাই সরকার আমাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করুক। তখন আমাদের যেখানে জায়গা দেবে সেখানে যাব। আর না হলে আমরা এখান থেকে যাব না, ঝুঁকি হলেও থাকতে হবে।’
পাহাড় কেটে অবৈধ বসতি স্থাপন এবং বন উজাড় পাহাড় ধসের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখেন বিশেষজ্ঞরা।
পরিবেশ কর্মী রিকোর্স চাকমা বলেন, ‘প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম এলেই প্রশাসনের সাইনবোর্ড টানানো, লিফলেট বিলি, স্থানীয়দের নিয়ে জনসচেতনতাসহ দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়। এটি কেবল মৌসুমকেন্দ্রিক। এরপর যখন বর্ষা কেটে যায়, আবার সবাই চুপচাপ থাকে। এভাবে প্রতি বছর নিয়ম করে একই ধরনের কর্মসূচি পালনের মধ্য দিয়েও ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসতি কমছে না।’
সার্বিক বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হাবিব উল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো আমরা চিহ্নিত করেছি। পুরো জেলায় শতাধিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা রয়েছে। সেখানে বসবাসকারীদের পুনর্বাসনের একটা প্রক্রিয়া চলমান। তিন পার্বত্য জেলায় এ প্রক্রিয়াটা একটু জটিল, এখানকার ভূমি ব্যবস্থাপনার কারণে। সেটি সরকারের নিয়ম অনুসারে চলমান থাকবে। তবে এই মুহূর্তে আমাদের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে বর্ষায় এখানকার মানুষের জীবন যেন হুমকির মুখে না পড়ে, সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি।’










