অভ্যন্তরীণ নদ-নদীতে জেলের জালে ইলিশ না মেলা ও সমুদ্রে আহরণ বন্ধের সরকারি সিদ্ধান্তে বরিশাল মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে নেই ক্রেতা-বিক্রেতাদের কোলাহল। এতে বেকার হয়ে পড়েছেন এ মৎস্য কেন্দ্রের প্রায় ১২০০ শ্রমিক। ইলিশ না আসায় ফাঁকা হয়ে পড়েছে কেন্দ্রটি। ফলে অলস সময় পার করছেন এখানকার শ্রমিকরা। মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, তীব্র গরম ও পানি কম থাকায় সাগরের ইলিশ অভ্যন্তরীণ নদ-নদীতে আসছে না।

সরেজমিন দেখা গেছে, অবতরণ কেন্দ্রের এক পাশে অল্প কিছু বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বিক্রি হচ্ছে। শ্রমিকরা কেউ কেউ আড্ডা দিচ্ছেন, কেউ ঘুমাচ্ছেন, কেউ লুডু খেলছে। অনেকে আবার মোবাইল ফোনে গান শুনছেন। কথা হয় সেখানকার শ্রমিক বেলায়েত হোসেন, হুমায়ুন কবির, ইউনুসসহ কয়েকজনের সঙ্গে।

তারা জানান, সমুদ্রে ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা চলছে। উপকূলের নদ-নদীতেও ধরা পড়ছে না ইলিশ। মাছ না আসায় এখন বেকার অবস্থায় অর্থ সংকটে পড়েছেন তারা। সরকার জেলেদের জন্য বিভিন্ন বরাদ্দ রাখলেও তাদের দিকে ফিরেও তাকায় না। মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের এসব শ্রমিকও সরকারি সহায়তার দাবি জানান।

বরিশাল মৎস্য শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম ফোরকান বলেন, অভ্যন্তরীণ নদীতে ইলিশশূন্যতা ও সাগরে ইলিশ আহরণ বন্ধ রয়েছে। এ কেন্দ্রের ১৬৫টি আড়তে প্রায় ১২০০ শ্রমিকের কেউ কেউ এখন পুকুরের মাছ ধরে ব্যবসা করছেন। বাকিরা বেকার। সরকারিভাবে শুধু জেলেদের সহায়তা করা হচ্ছে। শ্রমিকদের জন্য কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে কোনো কোনো আড়তদার শ্রমিকদের নানাভাবে সহযোগিতা করছেন।

এদিকে বরিশালের মুলাদী, হিজলা, মেহেন্দীগঞ্জের মেঘনা, কালাবদর, আড়িয়লখাঁ, তেঁতুলিয়া, মাসকাটা, কীর্তনখোলা, ঝুনাহার, সুগন্ধা ও বরিশাল-ভোলার মাঝে বহমান ইলিশায় জেলেদের জালে মিলছে না ইলিশ।

মৌসুমের এ সময়ে ইলিশে সয়লাব থাকার কথা দক্ষিণের সবচেয়ে বড় ইলিশ মোকাম বরিশালের পোর্ট রোড মৎস্য আড়ত। কিন্তু সাগরে সব ধরনের মাছ শিকারে ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলছে। অভ্যন্তরীণ নদীতেও মিলছে না। জেলেরা জাল ফেলে ফিরছেন প্রায় শূন্য হাতে।

বরিশাল মৎস্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, গত ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত দেশের সামুদ্রিক জলসীমায় ৬৫ দিন সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ রয়েছে। তবে জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চার মাস ইলিশের ভরা মৌসুম। মৌসুম শুরুর প্রাক্কালে প্রতি বছর এ সময় শত শত মণ ইলিশে সয়লাব থাকত বরিশালের ইলিশ মোকাম। গভীর সমুদ্র ও অভ্যন্তরীণ নদীতে শিকার করা ইলিশ নিয়ে ব্যস্ততম সময় কাটত পাইকার, আড়তদারসহ শ্রমিকদের। কিন্তু এ বছর ব্যতিক্রম।

মৎস্য অধিদপ্তর বলছে, সাগর মোহনায় ও অভ্যন্তরীণ নদীতে ধরা পড়া কিছু ইলিশ বাজারে এলেও দাম চড়া, যা সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে বলছেন ক্রেতারা। যদিও আগামী কয়েক দিন পর অভ্যন্তরীণ নদী ও সাগরে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়বে আশা বরিশাল মৎস্য বিভাগের।

বরিশাল মৎস্য আড়তদার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং মহানগর আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদক নীরব হোসেন টুটুল বলেন, ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞার কারণে সাগরে মাছ ধরতে পারছেন না জেলেরা। আর অভ্যন্তরীণ নদীতেও মাছ ধরা পড়ছে না। এ কারণে অনেকটা ইলিশশূন্য বরিশালের মোকাম।

ইলিশ ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা জানান, জাটকা শিকারে প্রতি বছর মৎস্য বিভাগের আট মাসের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এছাড়া অভয়াশ্রমে মাছ শিকারে দুই মাসের এবং মা ইলিশের ডিম নিরাপদ প্রজননের জন্য ইলিশ শিকারে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এর ওপর আবার সমুদ্রে মাছ শিকারে ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলছে। এ কারণে জেলেরা সারা বছরই নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে নদী-সাগরে মাছ শিকার করতে পারছেন না। তাই মোকামগুলোতেও ইলিশের সরবরাহ শূন্যের কোটায়।

গতকাল অভ্যন্তরীণ নদী এবং সাগর মোহনায় জেলেদের জালে ধরা পড়া মাত্র ২০ থেকে ২৫ মণ ইলিশ এসেছে বরিশাল মোকামে। যেখানে স্বাভাবিক সময়ে ইলিশ আসত ১ থেকে ২ হাজার মণ। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় দামও ছিল বেশ চড়া।

গতকাল বরিশালের মোকামে ৬০০-৯০০ গ্রাম (এলসি) সাইজ প্রতি মণ ইলিশ ৪৫ হাজার থেকে ৬০ হাজার, ১ কেজি সাইজের প্রতি মণ ৬০ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকায়।

চড়া দাম হওয়ায় মানুষ ইলিশের স্বাদ ভুলে যেতে বসেছে বলে মন্তব্য করেছেন পোর্ট রোডের মাছ বাজারের ক্রেতা কাইউম আহম্মেদ। এত দাম দিয়ে সাধারণ জনগণের পক্ষে ইলিশ কিনে খাওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন তিনি।

বরিশাল জেলা মৎস্য দপ্তরের কর্মকর্তা (ইলিশ) ড. বিমল চন্দ্র দাস বলেন, মূলত আগস্ট-সেপ্টেম্বর হচ্ছে ইলিশের ভরা মৌসুম। এখন এমনিতেই তীব্র গরম, তার ওপর নদীতেও পানি কম। এ কারণে সাগরের মাছ নদীতে আসছে না। তাই জেলেদের জালে ইলিশও ধরা পড়ছে না। তবে আগামী ২৩ জুলাই নিষেধাজ্ঞা শেষ হবে এবং বৃষ্টি হলে অভ্যন্তরীণ নদ-নদীতেও প্রচুর ইলিশ পড়বে। তখন জেলে, আড়তদার ও শ্রমিকদের মুখে হাসি ফুটবে বলে আশা করেন এ ইলিশ বিশেষজ্ঞ ড. বিমল চন্দ্র দাস।