দূর থেকে দেখে মনে হবে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দেয়ার জন্য প্রস্তুত গাড়িগুলো। যেকোনো সময় সওয়ারি নিয়ে রওনা হবে। কিন্তু একটু কাছে গেলেই বোঝা যায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা দুটি পাজেরো জিপ ও তিনটি কার আসলে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। চাকার চারপাশে গজিয়ে উঠেছে ঘাস ও আগাছা। কোটি টাকা মূল্যের গাড়িগুলোর ওপরে জমেছে ধুলোর আস্তরণ।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন অফিসের সামনে দেখা মিলবে গাড়িগুলোর। গত তিন-পাঁচ বছর এভাবেই খোলা আকাশের নিচে বসিয়ে রাখা হয়েছে এ রকম ১৫টি গাড়ি। অথচ নিয়ম অনুযায়ী কাজে না এলে সেগুলো মেরামত করে বিক্রি করে দেয়ার কথা। তার জন্য যথেষ্ট সুযোগও ছিল কর্তৃপক্ষের। কিন্তু তার কিছুই করা হয়নি।

জানা গিয়েছে, এ ১৫টি গাড়ির ক্রয়মূল্য ছিল ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এর মধ্যে রয়েছে পরিবহন পুলের ছয়টি বাস-মিনিবাস এবং ১৫টি কার, মাইক্রোবাস, জিপ ও অ্যাম্বুলেন্স।

পরিবহন অফিস জানিয়েছে, গাড়িগুলো ৮-৪২ বছরের পুরনো। এর মধ্যে রয়েছে বেসিক ব্যাংকের উপহারের এসি মিনি বাস, প্রো-উপাচার্যের (প্রশাসন) ব্যবহূত পাজেরো জিপ, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও উচ্চশিক্ষা মানোন্নয়ন প্রকল্প (হেকেপ) শেষে পাওয়া পাজেরো জিপ ইত্যাদি। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কাজে বা কোনো প্রকল্পে ব্যবহূত গাড়ির কাজ শেষ হয়ে গেলে সেগুলো পরিবহন পুলে জমা দেয়া হয়। পরিবহন পুল গাড়ির অবস্থা বিবেচনা করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়। সেক্ষেত্রে এসব বাহন টেন্ডারের মাধ্যমে বিক্রি করে দেয়া হতে পারে, মেরামত প্রয়োজন হলে তা করা যেতে পারে। কিন্তু এ ১৫টি গাড়ির ক্ষেত্রে এসবের কিছুই হয়নি। বরং পরিবহন পুলে যুক্ত হওয়ার পর থেকে খোলা আকাশের নিচেই পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে গাড়িগুলো।

পরিবহন অফিসের কর্মকর্তারা জানান, পড়ে থাকতে থাকতেই বাসগুলো ধীরে ধীরে মেরামতের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। এর মধ্যে যেসব গাড়ি বিক্রয়যোগ্য সেগুলোরও বাজারদর কমছে। যেমন ২০১০ ও ২০১১ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া ছয়টি বাসের যে পরিণতি হয়েছে। এসব বাস এখন ময়লার ভাগাড় আর মাদকসেবীদের আড্ডাখানা হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে।

সর্বশেষ ২০১৮ সালে নিলামে পরিত্যক্ত গাড়ি বিক্রি করা হয়। সে সময় চারটি গাড়ি বিক্রির জন্য দরপত্র আহ্বান করা হলেও দুটি কার বিক্রি করা সম্ভব হয়। অন্যদিকে মেরামত বা বিক্রি না করা হলেও এরই মধ্যে চারটি নতুন বাস কেনা হয়েছে। যার মূল্য ১ কোটি ৮৪ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। টিও অ্যান্ড ই (টেবল অব অর্গানাইজেশন অ্যান্ড ইকুইপমেন্টস) প্রাধিকার না থাকা সত্ত্বেও বাস কেনায় ৬০ লাখ টাকা অনিয়মিত ব্যয়ের অভিযোগ করেছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর।

অর্থাৎ নিয়মানুযায়ী নতুন গাড়ি কেনার আগে কতটি গাড়ি প্রয়োজন, আগের গাড়িগুলোর কী অবস্থা, সেগুলোর কী ব্যবস্থা করা হয়েছে, কাদের জন্য প্রয়োজন; এসব বিষয় জানাতে হয়। কিন্তু এ চারটি বাস কেনার ক্ষেত্রে সে নিয়মও মানা হয়নি। সে কারণেই অনিয়মিত ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে অডিটে।

এসব বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন অফিসের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক অধ্যাপক ছায়েদুর রহমান জানান, মাত্র তিন মাস হলো তিনি দায়িত্ব নিয়েছেন। পরিবহন অফিসে কিছু জটিলতা ছিল। সেগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে। এরই মধ্যে গাড়িগুলো পরীক্ষার জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে। যেগুলো বিক্রিযোগ্য সেগুলো বিক্রি করে দেয়া হবে। মেরামতযোগ্য হলে মেরামত করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাময়িক উপাচার্য অধ্যাপক নূরুল আলম বলেন, করোনা মহামারী চলাকালে অনেক কাজ জমে গিয়েছে। পর্যায়ক্রমে সেগুলোর বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। মেরামতযোগ্য বাস মেরামত করা এবং পরিত্যক্ত বাসগুলো বিক্রির সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে।