সিমেন্ট খাতে বড় পরিসরের নতুন বিনিয়োগ করেছে চট্টগ্রামভিত্তিক কনফিডেন্স গ্রুপ। দেশের সিমেন্ট বাজারে জাতীয় পর্যায়ে বিস্তৃত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে নরসিংদীতে স্থাপন করা হয়েছে কোম্পানিটির অত্যাধুনিক নতুন সিমেন্ট কারখানা। এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হয়েছে ৭৫০ কোটি টাকার বেশি। গতকাল শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন কারখানায় উৎপাদিত সিমেন্টের বাজারজাত কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়।
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলা নরসিংদীর পলাশ উপজেলার ডাঙ্গা বাজারে ১০ একর জমির ওপর নতুন এই কারখানাটি স্থাপন করা হয়েছে। এখানে সিমেন্ট উৎপাদনে ব্যবহার করা হয়েছে জার্মানির ভিআরএম প্রযুক্তি। কারখানা নির্মাণে প্রাইম ব্যাংকের নেতৃত্বে কয়েকটি ব্যাংক ঋণ সহায়তা দিয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে কনফিডেন্স সিমেন্ট ছিল মূলত চট্টগ্রামকেন্দ্রিক একটি প্রতিষ্ঠান। নরসিংদীতে নতুন কারখানা চালুর মাধ্যমে এবার প্রথমবারের মতো কনফিডেন্স ব্র্যান্ডের সিমেন্ট দেশের সব অঞ্চলে বাজারজাত করা হবে। এর মধ্য দিয়ে কোম্পানিটি জাতীয় পর্যায়ের সিমেন্ট কোম্পানি হিসেবে নতুন যাত্রা শুরু করছে।
কোম্পানি সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, নতুন কারখানাটির বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ১৮ লাখ টন, যা দৈনিক হিসেবে প্রায় ৬ হাজার টন। ২০২০ সালে এই প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হলেও করোনাভাইরাস মহামারির কারণে কিছু সময় কাজ বন্ধ ছিল। পরে ২০২২ সালে আবার নির্মাণকাজ শুরু হয়। নতুন কারখানা যুক্ত হওয়ায় কনফিডেন্স সিমেন্টের মোট উৎপাদনক্ষমতা বেড়ে দাঁড়াবে বার্ষিক ৩০ লাখ টনে। চট্টগ্রামে অবস্থিত বিদ্যমান কারখানাটির উৎপাদনক্ষমতা ১২ লাখ টন, সে হিসাবে নতুন কারখানাটি দেড় গুণেরও বেশি উৎপাদন সক্ষম।
উল্লেখ্য, ১৯৯৪ সালে কনফিডেন্স সিমেন্ট চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে দেশের প্রথম বেসরকারি সিমেন্ট কারখানা চালু করে। সেই কারখানায় উৎপাদিত সিমেন্ট এতদিন চট্টগ্রাম অঞ্চলেই বাজারজাত করা হতো। নরসিংদীতে নতুন কারখানা চালুর মাধ্যমে এবার কোম্পানিটি দেশব্যাপী বাজারে প্রবেশ করছে।
এ বিষয়ে কনফিডেন্স সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহির উদ্দিন আহমেদ বলেন, নতুন কারখানা চালুর মাধ্যমে কনফিডেন্স সিমেন্ট এখন চট্টগ্রামকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান থেকে সারা দেশের কোম্পানিতে রূপ নিচ্ছে। এ লক্ষ্য সামনে রেখে কোম্পানির নতুন স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে—‘বাংলাদেশের হৃদয়জুড়ে’। তিনি জানান, নতুন কারখানায় উৎপাদিত সিমেন্ট ঢাকা ও আশপাশের এলাকা ছাড়াও উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গে বাজারজাত করা হবে। বাজার জরিপে দেশে এখনো ভালো মানের সিমেন্টের চাহিদা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
কোম্পানি সূত্রে আরও জানা গেছে, নরসিংদীর এই নতুন কারখানায় কর্মকর্তা–কর্মচারী মিলিয়ে প্রায় এক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। গত ২৯ ডিসেম্বর কারখানাটিতে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হলেও আনুষ্ঠানিক বাজারজাত কার্যক্রম উদ্বোধন উপলক্ষে আজ সন্ধ্যায় ঢাকার বনানীর শেরাটন হোটেলে একটি উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে।
কনফিডেন্স সিমেন্ট কনফিডেন্স গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান এবং এটি দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত। ১৯৯৫ সালে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানিটি বর্তমানে ‘এ’ শ্রেণিভুক্ত।
আর্থিক দিক থেকে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে কনফিডেন্স সিমেন্ট প্রায় ৯৭ কোটি টাকা মুনাফা অর্জন করে এবং ওই বছরে কোম্পানির মোট ব্যবসার পরিমাণ ছিল ৪০৯ কোটি টাকা। চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই–সেপ্টেম্বর) কোম্পানিটি ৩৪ কোটি টাকা মুনাফা করেছে, যেখানে ব্যবসার পরিমাণ ছিল ১০৪ কোটি টাকা।
কোম্পানি সংশ্লিষ্ট সূত্রের ধারণা, নতুন কারখানার উৎপাদিত সিমেন্টের বিক্রি পুরোপুরি শুরু হলে কোম্পানির ব্যবসা ও মুনাফা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে, যদিও এর নির্দিষ্ট পরিমাণ এখনো নির্ধারিত হয়নি।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে দেশে সিমেন্টের বাজারের আকার ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। দেশে বছরে সিমেন্টের চাহিদা প্রায় চার কোটি টন, অথচ বিদ্যমান কোম্পানিগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় আট কোটি টন। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় উৎপাদন সক্ষমতা দ্বিগুণেরও বেশি, যার ফলে সিমেন্ট খাতে তীব্র প্রতিযোগিতা বিরাজ করছে। বর্তমানে দেশে ৩৫ থেকে ৪০টি সিমেন্ট কোম্পানি উৎপাদনে রয়েছে।










