কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মাণাধীন বঙ্গবন্ধু টানেলের ৯৮ শতাংশের বেশি কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এ বছরের শুরুতে উদ্বোধনের কথা থাকলেও সরকারি সিদ্ধান্তে সেপ্টেম্বরে খুলে দেয়া হচ্ছে টানেলটি। প্রথমে নকশায় না থাকলেও পরবর্তী সময়ে টানেলের উভয় প্রবেশমুখে অত্যাধুনিক স্ক্যানার বসানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তবে সময়মতো স্ক্যানার সরবরাহ না হওয়ায় আন্ডার ভেহিকল সার্ভিল্যান্স সিস্টেম (ইউভিএসএস) বসিয়ে টানেল উদ্বোধনের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ)। 

বিশ্বের কোনো টানেলেই স্ক্যানার বসানোর নজির নেই। তবে বঙ্গবন্ধু টানেলের সুরক্ষায় উভয় পাশে পাঁচটি করে মোট ১০টি অত্যাধুনিক স্ক্যানার বসানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ইংল্যান্ডে তৈরি এসব স্ক্যানারের চারটি জুন নাগাদ সরবরাহের কথা ছিল। বিলম্ব হওয়ায় উদ্বোধনের সময় ইউভিএসএস বসানোর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ইউভিএসএস বসানোর কাজও শুরু করেছে সেতু কর্তৃপক্ষ। স্ক্যানার সরবরাহ বিলম্ব হলে ইউভিএসএস দিয়েই টানেলে যানবাহন চলাচলের উদ্বোধন করতে চায় সংস্থাটি।

সেতু বিভাগের তথ্যমতে, জুন নাগাদ টানেলের জন্য আপাতত চারটি স্ক্যানার সরবরাহের কথা ছিল। ইংল্যান্ডে নির্মাণাধীন এসব স্ক্যানার দেশে পৌঁছাতে বিলম্ব হচ্ছে। কিন্তু সেপ্টেম্বরের মধ্যেই টানেলটি উদ্বোধনের ঘোষণা আসায় তড়িঘড়ি করে ইউভিএসএস বসানোর পরিকল্পনা করা হয়। জুনের মাঝামাঝিতে পাঁচটি ইউভিএসএস বসানোর কাজ শুরু করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। টানেলের আনোয়ারা প্রান্তে দুটি এবং নদীর পতেঙ্গা প্রান্তে তিনটি ইউভিএসএস বসানোর কাজ চলমান রয়েছে। ইউভিএসএস দিয়ে ট্রাক, বাস, মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কারসহ বড় যানবাহনের নিম্নাংশের ছবি তুলে বিস্ফোরক সরঞ্জাম আছে কিনা তা যাচাই করা যায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু টানেলের প্রকল্প পরিচালক হারুনুর রশীদ চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌টানেল নির্মাণকাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন করা হয়েছে। এখন বিভিন্ন প্রকৌশলকাজের শেষ মুহূর্তের সমন্বয় করা হচ্ছে। টানেলে স্ক্যানার বসানোর বিষয়টি আগে ছিল না। যার কারণে নতুন করে জমির প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। শুরুতে চারটি স্ক্যানার বসানোর মতো জায়গা থাকলেও বাড়তি ছয়টি স্ক্যানারের জন্য ভূমি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মাধ্যমে অতিরিক্ত জমি অধিগ্রহণ করতে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। সময়মতো স্ক্যানার না এলে বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহার করে হলেও ঘোষিত সময়ে টানেল প্রকল্পটি উদ্বোধন করা হবে।’

সেতু বিভাগের তথ্যমতে, স্ক্যানার আমদানি, সরবরাহ ও স্থাপনে বিলম্বের বিষয়ে বিবিএর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে টানেলের উভয় প্রান্তে স্ক্যানার বসানোর সিদ্ধান্ত ছিল না। প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনীতে স্ক্যানার বসানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পের মূল বাজেটে এটি যুক্ত না করে টানেলের টোল আহরণে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্ক্যানার বসানোর চুক্তি করা হয়। টোল আহরণ, রক্ষণাবেক্ষণ, স্ক্যানার বসানো ও স্ক্যানার পরিচালনায় বছরব্যাপী একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পাবে চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিসিসিসি) লিমিটেড। এ বাবদ সিসিসিসিকে পাঁচ বছরে ৯৮৩ কোটি ৮২ লাখ ৬২ হাজার ১৬৬ টাকা দেবে সেতু কর্তৃপক্ষ।

নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত প্রকৌশলীরা জানান, টানেলের উভয় মুখে স্ক্যানার বসানোর পরিকল্পনা না থাকায় ওই পরিমাণ জমি রাখা হয়নি। ১০টি স্ক্যানার বসানোর মতো পর্যাপ্ত জমি না থাকায় নতুন করে প্রায় সাত একর ভূমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে। ভূমি অধিগ্রহণ শেষে স্ক্যানার বসাতে বিলম্ব হওয়ায় বিকল্প হিসেবে ইউভিএসএস বসিয়ে টানেলটি উদ্বোধনের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এর আগে আপাতত টানেলের উভয় পাশে দুটি করে চারটি স্ক্যানার বসিয়ে টানেল চালু করার কথা থাকলেও সরবরাহ বিলম্বের কারণে স্ক্যানারের পরিবর্তে ইউভিএসএসের দিকেই ঝুঁকছে কর্তৃপক্ষ। ইউভিএসএস দিয়ে স্ক্যানারের মতো নিরাপত্তা সুরক্ষা পাওয়া না গেলেও উদ্বোধনের জন্য এর চেয়ে ভালো বিকল্প সেতু বিভাগের কাছে আর নেই বলে মনে করছেন তারা।

মূল প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) ডিজাইন না থাকলেও নতুন করে যানবাহনের স্ক্যানার বসানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ফলে বাড়তি ভূমির প্রয়োজন দেখা দেয়ায় অধিগ্রহণ ছাড়া এসব যন্ত্রপাতি বসানোর সুযোগ নেই।  

প্রসঙ্গত, নির্মাণকাজ শেষে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি কিংবা মার্চের মধ্যেই যানবাহন চলাচলের ঘোষণা দিয়েছিল বিবিএ। গত ২৬ এপ্রিল সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সেপ্টেম্বরে প্রকল্পটি উদ্বোধনের ঘোষণা দেন। ২০২২ সালের ২৬ নভেম্বর প্রথম টানেল টিউবের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বহু লেনের এ টানেল চালু হলে চট্টগ্রামের সঙ্গে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সরাসরি সংযোগ স্থাপিত হবে। চীনের সাংহাই নগরীর আদলে কর্ণফুলী নদীতে বঙ্গবন্ধু টানেল ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ হিসেবে গড়ে উঠবে চট্টগ্রাম। টানেলটি চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে আশা করা হচ্ছে।