রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে যে ছয়টি মেট্রোরেল নির্মাণ হচ্ছে তার মধ্যে অন্যতম ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন-৫-এর সাউদার্ন রুট। গাবতলী থেকে আফতাবনগর পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটার পাতাল ও আফতাবনগর থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত চার কিলোমিটার উড়াল মিলিয়ে মোট ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ হবে এ পথ। আগামী বছরের জানুয়ারিতে শুরু হয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ করার পরিকল্পনা সরকারের। তবে ২০২২ সালে সম্ভাব্যতা যাচাই হলেও অর্থায়ন নিশ্চিত হয়নি এখনো। সাড়ে ৫৪ হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্পটি সময়মতো শুরু হওয়া নিয়ে তাই তৈরি হয়েছে শঙ্কা। দ্রুতই অর্থসংস্থান না হলে কাজটি পিছিয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা।
উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের (ডিপিপি) তথ্যমতে, এমআরটি লাইন-৫-এর সাউদার্ন রুটটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৪ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ১৫ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা। ৩৯ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা নেয়া হবে প্রকল্প সহায়তা হিসেবে, যেখানে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বা সাড়ে ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ পাওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। বাকি ১২ হাজার ১০০ কোটি টাকা পেতে আলোচনা চলছে কোরিয়ান এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে। সবকিছু ঠিক থাকলে দেশটির অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগিতা তহবিলের (ইডিসিএফ) মাধ্যমে এ অর্থায়ন আসবে। যদিও সংস্থা দুটির কোনোটি থেকেই এখনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্র অবশ্য বলছে, অর্থায়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত পেতে আরো দু-তিন মাস সময় লাগতে পারে। আবার বেশকিছু কারণে প্রকল্পটিতে অর্থায়নের বিষয়ে কোরিয়ার আগ্রহ কমে এসেছে বলেও একটি সূত্র জানিয়েছে। এর মধ্যে অর্থায়নকারী সংস্থা দুটির পৃথক গাইডলাইন, ক্রয়পদ্ধতি ও নকশা নিয়ে ভিন্নতা অন্যতম কারণ হিসেবে সামনে এসেছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটির নকশা প্রণয়নের কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে ডিপিপি; যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, মেট্রোরেলের এ রুটে ১১টি পাতাল ও চারটি উড়ালসহ মোট ১৫টি স্টেশন নির্মাণ করা হবে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার কারণে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বিনিয়োগ (মূল) প্রকল্পটি অনুমোদন জরুরি। আর যদি সেটি না হয় এবং অর্থায়নে ঋণ নিশ্চিত করা না যায় তাহলে জটিলতা সৃষ্টি হবে। এক্ষেত্রে বর্তমানে চলমান কারিগরি প্রকল্প ও বিনিয়োগ প্রকল্পের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হবে না। ধরে রাখা যাবে না বর্তমান প্রকল্পে নিয়োজিত অভিজ্ঞ জনবলও। সেই সঙ্গে বর্তমান নিয়োজিত পরামর্শকের মেয়াদ শেষ হবে ২০২৪ সালের মার্চে। মূল প্রকল্পের ডিপিপি অনুমোদন না হলে কনস্ট্রাকশন সুপারভিশন কনসালট্যান্ট নিয়োগ দেয়াও সম্ভব হবে না। সবকিছু মিলিয়ে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে মূল প্রকল্পটি অনুমোদন না হলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। সম্প্রতি সংস্থাটির প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির বৈঠকে এমন উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
প্রকল্পটির সার্বিক অর্থায়ন পরিস্থিতি নিয়ে ইআরডি সূত্র জানায়, কো-ফাইন্যান্সিং নিশ্চিত না হওয়ায় এডিবির সঙ্গে অর্থায়ন চুক্তির বিষয়টি সামনে এগোয়নি। এতে আরো দু-তিন মাস সময় লাগতে পারে। আর কোরিয়ান অর্থায়ন নিয়ে এশিয়া উইংয়ের একটি সূত্র জানায়, এখনো বলার মতো কোনো অগ্রগতি হয়নি। যদিও এডিবির এশিয়া শাখা এবং সড়ক বিভাগের মধ্যে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। তবে কোরিয়ান অর্থায়ন নিয়ে ইআরডির সঙ্গে গত ২০ আগস্ট বৈঠক করে ডিএমটিসিএলে। আলোচনায় উঠে আসে, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা, নকশা ও ডিটেইল ডিজাইন পর্যালোচনা করতে চায় কোরিয়া। তবে তাদের এসব চাহিদা নিয়ে আপত্তি জানায় প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাটি। ডিটিসিএল জানায়, এসব করতে গেলে এখন প্রকল্পটির নকশা পরিবর্তন করতে হবে, এতে বেশি সময় লাগবে।
অন্যদিকে প্রকল্পের ক্রয় প্রক্রিয়ায় কোরিয়া শুধু নিজস্ব কোম্পানির অংশগ্রহণ চায়। আর এডিবির চাওয়া সবাই টেন্ডারে অংশ নিতে পারবে। আবার টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন বা বিভিন্ন প্রযুক্তিরও পরিবর্তন চায় কোরিয়া। ডিটিসিএল অবশ্য বলছে, একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সব মেট্রোরেল করা হচ্ছে। এখন এ প্রকল্পে পরিবর্তন আনলে তা হযবরল অবস্থা তৈরি করবে এবং এমআরটি নেটওয়ার্ক মেইনটেইন করার ব্যয় বাড়বে। তাছাড়া কোরিয়ান চাহিদামতো শুধু তাদের ঠিকাদার নিয়োগ করলে প্রকল্পের ব্যয় আরো বেড়ে যাওয়ারও আশঙ্কা করা হচ্ছে। নিজস্ব নিরাপত্তা গাইডলাইনও প্রকল্পে যুক্ত করতে চায় দেশটি। যেখানে প্রকল্পটি এরই মধ্যে এডিবির নিরাপত্তা গাইডলাইন আনুযায়ী তৈরি করা হয়েছে। প্রকল্প ব্যয়ও পর্যালোচনা করতে চায় কোরিয়া। এতে বাড়তি সময় ব্যয় হওয়ায় মূল প্রকল্প এবং চলমান টেকনিক্যাল প্রকল্পের মধ্যে ফারাক তৈরি হয়ে সমস্যা সৃষ্টি হবে বলছে ডিএমটিসিএল।
এসব জটিলতা বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্পটির বৈদেশিক অর্থায়নের সম্পূর্ণ অংশ এডিবি থেকে নেয়ার জন্য গত ১২ জুলাই সড়ক ও পরিবহন বিভাগ থেকে ইআরডিতে একটি চিঠি দেয়া হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ইআরডিতে যোগাযোগ করা হলে নাম না প্রকাশ করার শর্তে সংশ্লিষ্ট উইংয়ের এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাস্তবায়নকারী সংস্থা তাদের মতামত বা পরামর্শ দিতেই পারে। কিন্তু কার মাধ্যমে অর্থায়ন করা হবে তা নিশ্চিত করবে ইআরডি।’
এদিকে অর্থায়ন দেরি হলেও অ্যাডভান্স মেথডে কিছু কাজ এগিয়ে রাখবেন বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহাব। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘দ্রুতই প্রকল্পটির অর্থায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত পাওয়া যাবে। আর ঋণ চুক্তি হতে ৯-১০ মাস সময় লাগলেও সমস্যা নাই। কারণ এখন বিজ্ঞাপন দিয়ে ঠিকাদার বাছাই করে কাজ দিতে দিতে এক বছর সময় লেগে যাবে। আর এ সময়ে তেমন টাকার প্রয়োজন হবে না।’ আবার প্রকল্পটি অনুমোদন পাওয়ার পরও ঋণ চুক্তি হতে পারে বলে জানান তিনি।
প্রকল্প গ্রহণের পরিপত্র অনুযায়ী অবশ্য অর্থায়ন ছাড়া প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয় না। এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত ও অবকাঠামো বিভাগের সদস্য ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অর্থায়ন নিশ্চিত না হয়ে প্রকল্প পাসের সুযোগ নেই।’ তারা এমন কোনো কাজ করছেন না বলেও জানান সরকারের এ সচিব।
প্রকল্পটির অর্থায়নে জটিলতা নিয়ে কথা বলতে চাইলে ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএএন ছিদ্দিক এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে ডিপিপি তৈরি হওয়ায় প্রকল্পটি অনুমোদন পেতে দেরি হবে না বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের এমআরটি অধিশাখার যুগ্ম সচিব মো. আনিসুর রহমান। অর্থায়ন নিশ্চিত না হওয়ার বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি এ নিয়ে কোনো মন্তব্য না করে সংস্থাটির পরিকল্পনা বিভাগে কথা বলার পরামর্শ দেন। সে অনুযায়ী সংস্থাটির পরিকল্পনা অনুবিভাগের একাধিক কর্মকর্তাকে কয়েক দফা ফোন করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
অর্থায়ন নিশ্চিত না করে প্রকল্প অনুমোদন হয় না বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নানও। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘টাকা নাই কিন্তু প্রকল্প পাস, এটা কীভাবে সম্ভব? ঋণ চুক্তি হয়ে গেলে তারপর প্রকল্প পাস হতে পারে। আর এ প্রকল্পটি এখনো আমার কাছে আসে নাই।’ প্রকল্পটি তার দপ্তরে আসার পর বিষয়টি দেখবেন বলে জানান সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এ মন্ত্রী।










