সরকার উপজেলা পর্যায়ে সব ধরনের স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। আজ ঢাকায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (ডিজিএইচএস) আয়োজিত একটি জাতীয় ডিসেমিনেশন কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

কর্মশালাটি আয়োজন করে আলো ক্লিনিক ও স্বাস্থ্য অধিদফতর, সহযোগিতা ছিল সুইডেন দূতাবাস, ইউনিসেফ ও পিএইচডি সংগঠন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা না করেই নগরবাসী যেন সহজে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পায় সে লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। এতে বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়া আরো সহজ হবে।

দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য মানসম্মত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সরকারের প্রধান লক্ষ্য— উল্লেখ করে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, উপজেলা পর্যায়ে কিডনি ডায়ালাইসিস সেবা চালু করা হচ্ছে। একইসঙ্গে ৫০ শয্যা ও জেলা হাসপাতালগুলোয়ও ডায়ালাইসিস সুবিধা সম্প্রসারণ করা হবে।

তিনি বলেন, নতুন অবকাঠামো, ভবন ও বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে যাতে দেশের কোনো গ্রাম চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত না থাকে। চিকিৎসার অভাবে যেন কোনো মানুষের প্রাণহানি না ঘটে, সে লক্ষ্যেই স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়ানো হচ্ছে।

কর্মশালায় ‘আলো ক্লিনিক’ মডেলের প্রমাণভিত্তিক ফলাফল, বাস্তবায়ন অভিজ্ঞতা এবং কার্যক্রম থেকে অর্জিত শিক্ষাগুলো তুলে ধরা হয়, যাতে নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সরকারের ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ নির্ধারণে সহায়তা পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়, বাংলাদেশ সরকার এখন আলো ক্লিনিক মডেল সম্প্রসারণের সম্ভাবনা পর্যালোচনা করছে। কারণ বিভিন্ন প্রমাণে দেখা যাচ্ছে, মডেলটি সুবিধাবঞ্চিত নগর জনগোষ্ঠীর শিশু, নারী ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর জন্য মানসম্মত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করছে।

কর্মশালায় আলো ক্লিনিক মডেলের চার বছরেরও বেশি সময়ের বাস্তবায়ন অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত শিক্ষা তুলে ধরা হয়, যা মডেলটি সম্প্রসারণের বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বে এবং সুইডেন সরকারের অর্থায়নে ইউনিসেফ এ ক্লিনিক মডেলটি উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন করেছে।

এসময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, এদেশের প্রতিটি নাগরিকের মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে, তিনি যেখানেই থাকুন না কেন কিংবা তার আর্থিক সামর্থ্য যেমনই হোক না কেন। সবাইকে একসঙ্গে এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যা হবে সহজপ্রাপ্য, জবাবদিহিমূলক, জনগণমুখী এবং সহনশীল।

নগরায়ণের ফলে শহরের ‘ভাসমান ও নিম্নআয়ের’ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে উল্লেখ করে মন্ত্রী 'আলো ক্লিনিকে'-র কার্যক্রমের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, শহরের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে যেভাবে আলো ক্লিনিক মানসম্মত সেবা পৌঁছে দিচ্ছে, তা সত্যিই অনুকরণীয়। আলো ক্লিনিক কীভাবে সফলভাবে তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে, তা থেকে বাস্তব অভিজ্ঞতা নিতে আগামী সপ্তাহের মধ্যেই আমি নিজে তাদের একটি ক্লিনিক পরিদর্শন করব। সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে আমরা যে ১৯২টি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর দায়িত্ব নিয়েছি, সেখানে এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হবে।

সব মানুষের জন্য টেকসই স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, বিপুল অর্থ খরচ করে বেসরকারি হাসপাতালে সব মানুষের পক্ষে চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব নয়। তাই সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া হবে, যাতে সাধারণ মানুষ সেখানে আস্থা পায়। বিশেষজ্ঞদের মূল্যবান পরামর্শগুলো আমলে করে কাজের পরিধি আরও বাড়ানো হবে।

তিনি বলেন, চিকিৎসার অভাবে আমরা এ দেশের একটি মানুষকেও মরতে দিতে চাই না। দেশের একদম শেষ প্রান্তের মানুষটির কাছেও চিকিৎসা সহজলভ্য করতে চাই এবং আমরা তা করব, আমাদের তা করতেই হবে। দেশের জনসংখ্যা যত বড়ই হোক না কেন, সমগ্র জনগোষ্ঠর জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা আমাদের অঙ্গীকার।

সভায় আলো ক্লিনিক মডেলের চার বছরেরও বেশি সময়ের বাস্তবায়ন অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত শিক্ষা তুলে ধরা হয়, যা মডেলটি সম্প্রসারণের বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।

আলো ক্লিনিক মডেলের আওতায় মাতৃ, নবজাতক ও শিশুসেবা, টিকাদান, পুষ্টি স্ক্রিনিং, রোগনির্ণয় ও চিকিৎসাসহ নানা ধরনের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হয়। প্রতিদিন গড়ে ১৬৮ জন রোগী এসব সেবা গ্রহণ করেন। কমিউনিটি আউটরিচ এবং ডিজিটাল গৃহভিত্তিক পরিদর্শনের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর্মীরা গর্ভবতী নারী শনাক্ত করেন, শিশুদের বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করেন এবং পরিবারগুলোকে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সংযুক্ত করেন। চারটি ক্লিনিকে ২৪/৭ ধাত্রী-নেতৃত্বাধীন নরমাল ডেলিভারি সেন্টার চালু রয়েছে, যেখানে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত এক হাজারের বেশি নিরাপদ প্রসবসেবা দেয়া হয়েছে।

আরবান হেলথ অ্যান্ড ডেমোগ্রাফিক সার্ভেলেন্স সিস্টেম (ইউএইচডিএসএস)-এর তথ্য-প্রমাণে দেখা গেছে, কর্মসূচির আওতাভুক্ত এলাকায় মাতৃ ও শিশুর স্বাস্থ্য-ফলাফলে ইতিবাচক উন্নতি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যকেন্দ্রভিত্তিক প্রসবের হার বৃদ্ধি এবং নবজাতক, শিশু ও পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যু হ্রাস।

বাংলাদেশ সরকার নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদারে আলো ক্লিনিক মডেলকে একটি কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করছে এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের জন্য একটি কনসেপ্ট নোট প্রস্তুত করতে ইউনিসেফকে অনুরোধ জানিয়েছে।

কর্মশালায় বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, বাংলাদেশে সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইক্স, বাংলাদেশে ইউনিসেফের ডেপুটি রিপ্রেজেন্টেটিভ এমমানুয়েল আব্রিউ; ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা, সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধি এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিরা।