নড়াইলের উন্নয়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীন (এলজিইডি) সড়ক। জেলার বেশির ভাগ সড়কই কাঁচা। কাগজে কলমে যেসব সড়ক পাকা রয়েছে তার বেশির ভাগই খানাখন্দে ভরে গেছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে যায় এসব সড়কে। বছরের পর বছর সংস্কারবিহীন এসব সড়ক দিয়ে হেলেদুলে ঝুঁকি নিয়ে চলছে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন। ফলে অভ্যন্তরীণ সড়কে চলতে গিয়ে সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হতে হয় এ জেলার মানুষের। তেমনি উৎপাদিত ফসল ঠিকমতো বাজারজাত করতে পারছেন না কৃষকরা।

জেলা এলজিইডি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এলজিইডির অধীনে নড়াইলে মোট ২ হাজার ৯২২ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৯২৭ কিলোমিটার সড়কই কাঁচা। জেলার অভ্যন্তরে বিভিন্ন সময়ে ৯৯৪ কিলোমিটার সড়ক পাকা করা হয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, পাকা সড়কের মধ্যে কয়েকটি বাদে অধিকাংশই বর্তমানে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। পাকা সড়কের মধ্যে অধিকাংশ সড়কেই দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার করা হয় না। ফলে ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলতে গিয়ে প্রায়ই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা।

সরেজমিনে নড়াইল সদর উপজেলার তুলারামপুর-শেখহাটি, দত্তপাড়া-চালিতাতলা, লোহাগড়া উপজেলার নলদী-লাহুড়িয়া, মল্লিকপুর-ইতনা এবং কালিয়া উপজেলার কয়েকটি সড়কে ঘুরে দেখা গেছে, এসব রাস্তার অধিকাংশ স্থানে পিচ ও খোয়া উঠে ছোটবড় গর্ত তৈরি হয়েছে। যানবাহন চলছে ঝুঁকি নিয়ে। সামান্য বৃষ্টি হলেই কাদাপানিতে এ অংশ একাকার হয়ে যায় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

স্থানীয় বাসিন্দা আজম শেখ, ইলিয়াস খান, সাহিন সরদারসহ আরো কয়েকজনে জানান, বৃষ্টির মৌসমে বেশির ভাগ সড়কে হাঁটু সমান কাদা হয়ে যায়। বছরে ছয় মাসেরও বেশি সময় এসব রাস্তা দিয়ে কোনো যানবাহন চলাচল করতে পারে না। এমনকি হেঁটেও চলাচল করা যায় না। এ সময় কৃষকরা উৎপাদিত ফসল ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করতে পারেন না। যানবাহন চলতে না পারায় ফসল হাটবাজারে নিতে পারেন না। এতে কৃষকরা ফসলের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সড়কগুলোর উন্নয়ন হলে কৃষকরা যেমন সুফল পাবেন তেমনি এলাকার জীবনযাত্রার মানেও আসবে ব্যাপক পরিবর্তন।

কলিগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী কাদু মিয়া জানান, বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা এসে জেলার উৎপাদিত ফসল বিভিন্ন বাজার থেকে কিনে গ্রামীণ সড়ক দিয়ে পরিবহন করেন। লোহাগড়া উপজেলার শেষ প্রান্ত লাহুড়িয়া বাজার। এ বাজার থেকে মাগুরায় সরাসরি পণ্যবাহীসহ অসংখ্য যানবাহন চলাচল করে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী মসলেম ঠাকুর, রহমতসহ আরো কয়েকজন জানান, গ্রামীণ এসব সড়কের পাশে গড়ে উঠেছে লাহুড়িয়া, মাকড়াইল, বাতাসি, মণ্ডলবাগ, শিয়েরবর, মানিকগঞ্জ, আড়িয়ালা, মহাজন, বড়দিয়াসহ বিভিন্ন বাজার। এসব বাজারের পণ্য পরিবহনে প্রতিনিয়ত ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান চলাচল করে। সড়কের দুরবস্থা থাকায় তাদের পণ্য পরিবহনে অনেক বেশি ভাড়া দিতে হয়, সময়ও অনেক বেশি লাগে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেশ কয়েকটি রাস্তায় অন্তত ১৫ বছর ধরে কোনো সংস্কার হয়নি। দিন দিন সড়কগুলোতে খানাখন্দ বেড়েই চলেছে। এ সড়কে চলতে গিয়ে যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

নড়াইল সদর উপজেলার জয়পুর ইউপি চেয়ারম্যান আকতার হোসেন জানান, তার ইউনিয়নের বেশির ভাগ রাস্তাই বেহাল। দ্রুত এসব রাস্তা চলাচলের উপযোগী করার দাবি জানান তিনি।

চালকরা জানান, সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে যানবাহন চালাতে খুবই সমস্যা হচ্ছে। জীবনের ঝুঁকি  নিয়ে তাদের গাড়ি চালাতে  হয়। জেলার বেশির ভাগ রাস্তায় ভারী যানবাহন চালানো যায় না। একটু বৃষ্টি হলেই পানি জমে কাদা হয়ে যায়। তিন-চারদিন সড়কে চলাচল করা যায় না। দিনে যেখানে তিন-চারটি ট্রিপ দেয়ার কথা, সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে এখন একটির বেশি ট্রিপ দেয়া যাচ্ছে না।

কালিয়া উপজেলার বড়দিয়া বাজারের ব্যবসায়ী আশরাফ মামুন জানান, তিনি বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষিপণ্য কিনে পাইকারি বিক্রয় করেন। কিন্তু সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে সময়মতো পণ্য আনতে পারেন না। এতে তার ব্যবসায় ক্ষতি হচ্ছে। বর্তমানে জেলার উন্নয়নের মূল প্রতিবন্ধকতাই হলো এলজিইডির বিভিন্ন বিধ্বস্ত পাকা সড়ক।

নড়াইল জেলা উন্নয়ন কমিটির নেতা কাজী হাফিজুর রহমান জানান, জেলার অধিকাংশ রাস্তাই চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।

নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজের অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক শাহানারা বেগম জানান, যোগাযোগ ব্যবস্থার  উন্নয়ন হলে এলাকার দ্রুত উন্নয়ন করা সম্ভব।

নড়াইল জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সুয়াজেত হোসেন জানান, জেলায় যে বরাদ্দ পাওয়া যায়, তা দিয়ে সড়কগুলোর গুরুত্ব অনুযায়ী কাজ করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ সড়কের মধ্যে বেশির ভাগ সড়কই পাকা। নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য মাশরাফি বিন মর্ত্তুজার আন্তরিক চেষ্টায় নড়াইল উন্নয়ন প্রকল্প নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে নড়াইলবাসীর চাহিদা অনুযায়ী সড়কগুলো পাকা করা হবে।