কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) জন্য ৫ লাখ কেএন-৯৫ মাস্ক কিনতে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ১০ কোটি টাকা। কেনাকাটায় এক প্রতিষ্ঠাননির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসায় একই পরিমাণ মাস্ক কিনতে সংস্থাটির খরচ হয়েছে ৬ কোটি টাকা। এতে সাশ্রয় হয়েছে ৪০ শতাংশ অর্থ। শুধু মাস্ক নয়, মনোপলি ভেঙে দরকষাকষি চালু করায় এ রকম ১৮ ধরনের পণ্য ক্রয়ে এক মাসে ১৬৩ কোটি টাকা সাশ্রয় করেছে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার।
দেশে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হলে স্বাস্থ্য খাতে সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি একের পর এক অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য বেরিয়ে আসতে থাকে। এর ধারাবাহিকতায় কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের মাস্ক, পিপিই ও অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয়ে অনিয়মের তথ্যও উঠে আসে। নিম্নমানের পিপিই সরবরাহ ও কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগের মুখে গত ২২ মে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান কেন্দ্রীয় ঔষাধাগারের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শহীদউল্লাহ। এরপর স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আবু হেনা মোরশেদ জামানকে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পরিচালকের দায়িত্ব দেয়া হয়। সেই সঙ্গে কেনাকাটায় একক প্রতিষ্ঠাননির্ভরতা কমাতে নেয়া হয় বেশকিছু উদ্যোগ।
পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের ১৭টি আইটেমের পণ্য কেনাকাটায় ৩৭৭ কোটি ৫১ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি এই পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের সুপারিশ করেছিল। মূলত বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুযোগ বুঝে অনেক পণ্য কেনাকাটায় একক কোম্পানি-নির্ভর করে রাখা হয়েছিল। পাশাপাশি বিশেষ প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা প্রদানের জন্য নানা সুপারিশও করা হয়েছিল। ফলে পণ্যগুলো কেনাকাটায় কোনো দরকষাকষি করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু চলতি বছরের জুনে নতুন পরিচালক দায়িত্বভার গ্রহণের পর পরই কেনাকাটার ক্ষেত্রে ধরন ও প্রতিষ্ঠানের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া শুরু করেন। এছাড়া দরকষাকষি কমিটিকেও আরো শক্তিশালী করা হয়। সব পণ্যের ক্ষেত্রে সরবরাহকারীদের তালিকা তৈরি করা হয়। এদের মধ্য থেকে সর্বনিম্ন দরদাতার নাম যাচাই-বাছাই করে পণ্য কেনাকাটা করা হয়েছে। যে কারণে এ ১৭ ধরনের পণ্য কিনে ৯৮ কোটি টাকা সাশ্রয় করতে পেরেছে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার।
কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের এক হাজার হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা ক্রয়ে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ১২০ কোটি টাকা। একক প্রতিষ্ঠাননির্ভরতা থাকায় প্রতিটির দাম ধরা হয়েছিল প্রায় ১২ লাখ টাকা। অথচ বাজার প্রতিযোগিতামূলক করার মাধ্যমে একই পরিমাণ ক্যানোলা কিনতে খরচ হয়েছে ৭৩ কোটি টাকা। ফলে এখানে প্রতিটি ক্যানোলা কিনতে খরচ হয় ৭ লাখ ৩০ হাজার টাকা। মোট সাশ্রয় হয় ৪০ শতাংশ বা প্রায় ৪৭ কোটি টাকা।
একসময় প্রতিটি পিপিআর টেস্ট কিট কেনা হতো ২ হাজার ৭৫০ টাকায়। সেই একই কিট এখন দরকষাকষির মাধ্যমে ১ হাজার ৮২০ টাকায় কেনা হচ্ছে। এ কারণে এরই মধ্যে ৭৫ লাখ টাকা সাশ্রয় হয়েছে। এ পণ্যটি ছাড়াও পিপিই ক্রয়ে ৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা, এন-৯৫/এফএফপি-২ মাস্ক ক্রয়ে ১০ কোটি ২০ লাখ, সার্জিক্যাল মাস্কে ৮০ লাখ টাকা, অক্সিজেন কনসেনট্রেটরে ৫ কোটি ৮৫ লাখ, পোর্টেবল এক্স-রে মেশিন ক্রয়ে ২ কোটি, আইসিইউ বেড ক্রয়ে ৬ কোটি ৬০ লাখ, অক্সিজেন সিলিন্ডার ক্রয়ে ১৩ কোটি, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ক্রয়ে ৬৫ লাখ, সু কাভার ক্রয়ে ৬০ লাখ, ইনফ্রারেড থার্মোমিটার কেনায় ৩০ লাখ, ইনজেকশন ক্রয়ে ২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা সাশ্রয় হয়েছে। তবে সার্জিক্যাল গ্লাভস কেনায় ২০ লাখ টাকা বেশি ব্যয় এবং নমুনা পরীক্ষার গ্লাভস কেনায় সমান সমান ব্যয় হয়েছে।
এই ১৭টি পণ্য ছাড়াও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চাহিদা অনুসারে সম্প্রতি ২০ লাখ সেট ভিটিএম এবং সোয়াব স্টিক কিনেছে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার। আমদানি করতে হলে প্রতিটির মূল্য পড়ত প্রায় ৪০০ টাকা। এখন বিজ্ঞান গবেষণা পরিষদের কাছ থেকে কেনার কারণে প্রতিটির মূল্য পড়েছে ১৬৬ টাকা। এতে আরো প্রায় ৬৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা সাশ্রয় হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ও কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পরিচালক আবু হেনা মোরশেদ জামান এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্য সচিবের নির্দেশেই আমি সরকারি অর্থ সাশ্রয়ের কাজটি করতে অনুপ্রাণিত হয়েছি। মহামারী পরিস্থিতিতে কেনাকাটায় সামগ্রিক পরিকল্পনার অভাব ছিল। আবার অনেক পণ্যের ক্ষেত্রেই কোনো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়নি। আমি দায়িত্ব নেয়ার পর এ বিষয়গুলোতে জোর দিয়েছি। সরকারের খরচ কমানোর পাশাপাশি ভালো মানের পণ্য নিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। এক্ষেত্রে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের একচ্ছত্র আধিপত্য থেকে বেরিয়ে এসে কেনাকাটা প্রতিযোগিতামূলক করেছি। কাজটি করতে সবার সহযোগিতা পেয়েছি। এ ধারা সামনের দিনে অব্যাহত রাখতে চাই।
সরকারি এ প্রতিষ্ঠানের কেনাকাটায় স্বার্থ রক্ষার সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে কেনাকাটার মূল্যায়নে নিয়োজিত দরকষাকষি কমিটি। এ কমিটির সদস্য হিসেবে ছিলেন কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালের কনসালট্যান্ট ডা. মো. আশ্রাফুজ্জামান, মুগদা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. মো. টিটো মিঞা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অব মেডিসিনের ডিন ডা. শাহরিয়ার নবী, গণপূর্ত উপবিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. রফিকুল হাসান, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উপসচিব মো. ছরোয়ার হোসেন ও প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের পরিচালক (প্রশাসন) মো. আহসান কিবরিয়া সিদ্দিকি।










