চাঁদপুর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের করিডোর-বারান্দায় চাদর ও পাটি বিছিয়ে বসে এবং শুয়ে আছে অর্ধশতাধিক রোগী। গাদাগাদি করে রোগী ও স্বজনেরা বসে আছে। রোগীদের বিছানার পাশ দিয়ে মানুষজন হেঁটে যাচ্ছে। এতে রোগ-জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে। হাসপাতালের আউটডোর ও ইনডোরেও চিকিৎসা নিচ্ছে রেকর্ডসংখ্যক রোগী। এ অবস্থায় রোগীদের সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা।
গত শনিবার সরজমিনে ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া যায়। ওইদিন সব মিলিয়ে ৪৬০ রোগী হাসপাতালে ভর্তি ছিল। অথচ পুরো হাসপাতালে ২৫০টি শয্যা রয়েছে। বাকি ২১০ রোগী ওয়ার্ডের মেঝে ও বারান্দায় বিছানা করে সেবা নিচ্ছে। সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি ছিল হাসপাতালের পুরুষ, শিশু ও নারী ওয়ার্ডে। শিশু ওয়ার্ডে ৪২ বেডের বিপরীতে রোগী ভর্তি আছে ১৫০ জন। আউটডোরে টিকিট কাউন্টারের সামনে নারী-পুরুষের ভিড় দেখা গেছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শনিবার বহির্বিভাগে প্রায় ২৩০ রোগী সেবা নিয়েছে। এদের মধ্যে অনেকে ভর্তি হয়েছে আবার অনেকে চিকিৎসা সেবা নিয়ে বাড়ি চলে গেছে।
ফরিদগঞ্জ উপজেলার বালিথুবা ইউনিয়নের স্মৃতি বেগম (২৭) বুকে ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। কোথাও জায়গা পাননি। তিনি বারান্দায় কাছের একটি ছোট্ট স্থানে পাটি বিছিয়ে স্বজনকে নিয়ে রয়েছেন। তিনি বলেন, ‘হাইরে গরম, ওপরে ফ্যান নাই, পচা, দুর্গন্ধ আর বিড়ালের উপদ্রবে অবস্থা খারাপ। কোথাও সিট খালি নাই। চলাচলের রাস্তার দুই পাশে রোগীরা বিছানা বিছিয়ে শুয়ে বসে আছেন। পা ফেলার জায়গা নেই। ওয়ার্ডের ভেতরটা নোংরা। কোনো টয়লেটের ভেতরে চিটকারিও নেই। এমন একটা পরিস্থিতি আমরা চিকিৎসা নিতে এসে যেন বিপাকে পড়ে গেছি।’
সদর উপজেলার মাফিয়া আক্তার (৩০) জানান, সম্প্রতি তার সিজারে বাচ্চা হয়েছে। প্রথমে কোনো সিট না পেলেও পরে অনেক কষ্টে একটা সিট পেয়েছেন। সিট পেলেও ওয়ার্ডে সবসময় মানুষের ভিড়। বিছানাঘেঁষে মানুষজন চলাফেরা করছে। আবার যে বেডগুলো দেয়া হয়, তা খুবই অপরিষ্কার। এছাড়া টয়লেটের অবস্থা খুবই খারাপ। এটি কোনোভাবেই ব্যবহার উপযোগী নয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণেই এমন পরিস্থিতি। এসব কাজ করার জন্য গণপূর্ত বিভাগ থেকে ঠিকাদারকে দায়িত্ব দেয়া থাকে। কিন্তু ঠিকাদার এসব কাজ না করায় বিপাকে পড়তে হয় চিকিৎসা নিতে আসা রোগীকে। শিশু ওয়ার্ডে ঘুরে একাধিক শিশুর অভিভাবকের সঙ্গে কথা হয়। তারা বলেন, জ্বর, পাতলা পায়খানা ও বমি হওয়ার কারণে হাসপাতালে এসে শিশুদের চিকিৎসা নিচ্ছেন। রোগী বেশি হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া প্রয়োজনীয় অনেক ওষুধ বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়।
রোগীদের অভিযোগ, সদর হাসপাতালে রোগী ভর্তি করানো হলে যেসব পরীক্ষা দেয়া হয়, তা নিয়ে দালালরা টানাটানি করে। কিছুসংখ্যক দালাল রোগী ভর্তি হওয়ার পর ডাক্তারের রুমের সামনেই দাঁড়িয়ে থাকে। তারা প্রেসক্রিপশন রোগীর হাত থেকে নিয়ে বাইরে অন্য ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা করানোর জন্য টানাটানি করে।
হাসপাতালের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আসমা বেগম বলেন, ‘প্রচণ্ড গরমের কারণে শিশু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। ফলে হাসপাতালের নির্ধারিত বেড ছাড়া মেঝেতে এবং করিডোরে শিশুদের চিকিৎসাসেবা নিতে হচ্ছে। অতিরিক্ত শিশু ভর্তি হওয়ার কারণে আমাদেরও চিকিৎসা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।’
এসব বিষয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. একেএম মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘২৫০ জনের স্থলে ৪৫০ রোগী আছে। এছাড়া একজন রোগীর সঙ্গে তিন-চারজন লোক থাকে। এর মধ্যে আমাদের চিকিৎসক ও নার্সরা সেবা দিতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। যদি টয়লেটের কোনো সমস্যা থাকে সেটি আমরা দেখে ব্যবস্থা নেব।’










