দেশের ব্যাংক খাতকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনতে ১৯৯১ সালে প্রণয়ন করা হয় ব্যাংক কোম্পানি আইন। এর পরের কয়েক দশকে এর বেশ প্রসার ও পরিধি বেড়েছে। তবে সুশাসনের অভাব, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, নানা অব্যবস্থাপনায় বিপর্যস্ত গুরুত্বপূর্ণ এ খাতটি। নানা অনিয়মের মধ্য দিয়ে বিতরণকৃত ঋণ আদায় কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে বেড়েই চলেছে খেলাপি ঋণ। আবার আইনটিতে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির সুস্পষ্ট কোনো সংজ্ঞা না থাকায় অনেকেই ফায়দা লুটছে। তাই খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি রোধে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের। ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতার সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দেয়া হবে বলেও বাংলাদেশ ব্যাংক তার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে। জাতীয় সংসদের অনুমিত হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির গত বুধবারের বৈঠকে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করে ১ নং সাব কমিটি। তাদের কাছে সেটি জমা দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।

পাঁচটি ব্যাংক ও অব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের দেয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিদ্যমান খেলাপি ঋণ আদায়ে অর্থঋণ আদালত আইন-২০০৩, এনআই অ্যাক্ট-১৮৮৯, দেউলিয়া আইন-১৯৯৭ প্রভৃতি প্রচলিত আইনের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো আইনি ব্যবস্থা নেয়। এর মধ্যে অর্থঋণ আদালতের মাধ্যমে ২০২১ সালে নিষ্পত্তীকৃত মামলায় দাবীকৃত অর্থের ২৮ দশমিক ১৩ শতাংশ আদায় করা হয়। তবে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে নিষ্পত্তীকৃত মামলায় আদায় হার মোটেই সন্তোষজনক নয়, ১ দশমিক ৫৫ শতাংশ। সে তুলনায় বিদেশী ব্যাংকের আদায় হার যথেষ্ট ভালো, যা ৩৪ দশমিক ২৫ শতাংশ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) আইন, ২০২১-এ প্রস্তাবিত খসড়া বিলে কয়েকটি নতুন ধারা সংযোজনের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত এ আইন ঋণখেলাপির বিষয়ে তদারকি বাড়ানো এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে আলাদাভাবে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হবে। জামানত মূল্যায়নকারী সংক্রান্ত ধারার সন্নিবেশও প্রস্তাব করা হয়েছে খসড়ায়। অব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রচলিত আইন, যা আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন-১৯৯৩ সেটিরও সংশোধনীর কার্যক্রম চলমান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত এ আইনের সংশোধনীগুলো খেলাপি পরিস্থিতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে বণিক বার্তাকে বলেন, আইন সংশোধনের আগে বিদ্যমান আইনে কী ধরনের জটিলতা রয়েছে, সেগুলো বিবেচনায় নিতে হবে। ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অর্থঋণ আদালত আছে। সেটিকে আরো কার্যকর করতে হবে। তাছাড়া নতুন আইন করার ক্ষেত্রে দেখতে হবে—কীভাবে পুরনো আইনের ঘাটতিগুলো পূরণ হয়। কোন জায়গায় সমস্যা আছে সেগুলোও জানা জরুরি। সেগুলোর ব্যাপারে সংশোধনী আনা উচিত। তারপর যদি প্রয়োজন হয়, সম্পূরক কিছু যোগ করা যেতে পারে। আইন করে দিলাম..., আইনের প্রয়োগই তো হয় না বাংলাদেশে।

দেশে কার্যক্রম চালানো ব্যাংকগুলোর ঋণ আদায়জনিত মামলা-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, অর্থঋণ আদালতে ২০২১ সাল পর্যন্ত মোট দায়েরকৃত মামলা ২ লাখ ৭ হাজার ৮৯৬টি। এর মধ্যে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৬২৫টি অর্থাৎ ৬৭ দশমিক ১৬ শতাংশ মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। অবশিষ্ট ৬৮ হাজার ২৭১টি বিচারাধীন। এ সময়ের মধ্যে অর্থঋণ আদালতে নিষ্পত্তীকৃত মামলায় প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে প্রকৃত আদায়ের পরিমাণ ছিল ১৯ হাজার ৭০৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ দাবীকৃত অর্থের মধ্যে মাত্র ২৮ দশমিক ১৩ শতাংশ আদায় করা সম্ভব হয়েছে অর্থঋণ আদালতের মাধ্যমে। আবার এ আদালতে বিচারাধীন মামলাগুলোর দাবীকৃত অর্থের পরিমাণ ১ লাখ ৪৩ হাজার ৬৯৪ কোটি টাকা, যার বিপরীতে আদায় হয়েছে কেবল ৪ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। দাবীকৃত অর্থের যা মাত্র ৩ দশমিক ২৯ শতাংশ। খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে আদালতের বাইরে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ায় ২০২১ সাল পর্যন্ত মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে ১২ হাজার ৬৭২টি। এর বিপরীতে দাবীকৃত অর্থের পরিমাণ ৪ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ৮১৯ কোটি ৪৮ লাখ টাকা বা ১৮ দশমিক ২৬ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অনেক সময় বিশেষ পরিস্থিতিতে বিতরণকৃত ঋণের আদায় অনিশ্চিত হতে পারে। যেমন বিজনেস সাইকেল, অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা, অসম প্রতিযোগিতা, নতুন বিকল্প উদ্ভাবন ইত্যাদি। ফলে কোনো কোনো ঋণ খেলাপি হয়ে যায়। তবে এ ধরনের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ শতাংশের নিচে হলে সহজে এর ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব। যদিও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, অস্বাভাবিক খেলাপি ঋণের অন্যতম কারণ ঋণ ব্যবস্থাপনাকালে গ্রাহক নির্বাচনে ভুল করা, তথ্য গোপন বা ভিত্তিহীন তথ্য ব্যবহার, ঋণ নীতিমালা অনুসরণ না করা ইত্যাদি।

এ বিষয়ে সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ঋণ যেন খেলাপি না হয়, সে ব্যবস্থা নিতে হবে। খেলাপি কেন হচ্ছে, ব্যাংকার ঠিকমতো ‘ডিউ ডিলিংস’ করে না কেন, একজনের কাছে টাকা দেয় কেন, বার বার ‘এক্সটেন্ড’ করে কেন, ঋণ রিশিডিউলের পর ডাউনপেমেন্ট কম করে কেন, সহজে কেন অবলোপন করে—সবার আগে এগুলো রোধ করতে হবে। সেটা না করা হলে চুরি করতে আইন-কানুনগুলো আরো উৎসাহী করে তুলবে।

সংসদীয় কমিটিকে দেয়া বাংলাদেশ ব্যাংক তার প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করে, দেশে পরিচালিত ব্যাংকগুলোতে ২০১৯, ২০২০ ও ২০২১ সালে যথাক্রমে ৫২ হাজার ৭৬৯ কোটি, ১৩ হাজার ৪৬৯ কোটি ও ১২ হাজার ৩৭৯ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। তবে অনেক সময় কিছু ঋণ পুনঃতফসিল করা সত্ত্বেও পরবর্তী সময়ে ঋণ আদায় না হওয়ায় পুনরায় খেলাপি হয়ে যেতে পারে। দীর্ঘসময় ধরে অন্যদায়ী থাকা এসব ঋণ স্থিতিপত্রে প্রদর্শন করা হলে ব্যাংকের স্থিতিপত্রের আকার অনাবশ্যকভাবে বৃদ্ধি পায়। এ পরিপ্রেক্ষিতে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার বা নির্দেশনা অনুযায়ী অবলোপন করা হয়, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। ব্যাংকগুলোর অবলোপন-সংক্রান্ত প্রেরিত তথ্য উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯, ২০২০ ও ২০২১ সালে যথাক্রমে ১ হাজার ৭৭১ কোটি, ১ হাজার ৫৭৮ কোটি ও ১ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকার ঋণ ব্যাংকের স্থিতিপত্র থেকে অবলোপন করা হয়েছে।

জানতে চাইলে অনুমিত হিসাব সংসদীয় কমিটির সদস্য ও সাব-কমিটির সভাপতি ওয়াসিকা আয়শা খান বণিক বার্তাকে জানান, সংসদীয় কমিটির বৈঠকে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হলেও এটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়নি। গ্রাহক নির্বাচন থেকে শুরু করে ঋণ বিতরণ, ঋণ আদায় অগ্রগতি পর্যালোচনা করে ঋণখেলাপি হওয়ার পেছনে বেশকিছু কারণ উদ্ঘাটন করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এসব কারণ প্রতিকারে প্রতিবেদনে বেশকিছু সুপারিশও তুলে ধরা হয়েছে। পরবর্তী সংসদীয় কমিটির বৈঠকে এটি নিয়ে আলোচনা হবে। সেই আলোচনার ভিত্তিতে সাব-কমিটির সুপারিশ চূড়ান্ত করে তা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো হবে।