বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রফতানি বাণিজ্যের পণ্য আনা-নেয়ার জন্য সড়কপথের চেয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে নৌপথ। প্রতি বছরই দুই দেশের মধ্যে নৌপথে বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়ছে। আর এ পণ্য পরিবহনের পুরোটাই এখন বাংলাদেশী জাহাজ ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে। ২০২০-২১ অর্থবছরে দুই দেশের মধ্যে নৌপথে পণ্য আনা-নেয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহার হওয়া জাহাজের ৯২ শতাংশই বাংলাদেশী। বাকি মাত্র ৮ শতাংশ পণ্য পরিবহন হয়েছে ভারতীয় জাহাজের মাধ্যমে। আগে নৌপথে শুধু সিমেন্ট খাতের কাঁচামাল আমদানি হতো। তবে এখন চাল, গম, ভুট্টা, পাথরসহ অন্যান্য পণ্যও আমদানি হচ্ছে। এ কারণে পণ্য পরিবহনের পরিমাণ বেড়েছে। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সাম্প্রতিক এক বৈঠকে অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) দেয়া এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
সংসদীয় কমিটিতে দেয়া প্রতিবেদনে গত পাঁচ বছরে আমদানি-রফতানির তথ্য তুলে ধরা হয়। সেখানে অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দুই দেশের মধ্যে আমদানি-রফতানির পরিমাণ ছিল ২৬ লাখ ২৪ হাজার টনের বেশি। এসব পণ্য আনা-নেয়ায় বাংলাদেশের ৩ হাজার ১১টি জাহাজের বিপরীতে ভারতের মাত্র ২৯টি জাহাজ ব্যবহূত হয়। সেই হিসেবে ওই বছর পণ্য পরিবহনের ৯৯ শতাংশই হয়েছে বাংলাদেশী জাহাজে।
পরের অর্থবছর অর্থাৎ ২০১৭-১৮ সালে আমদানি-রফতানির পরিমাণ ছিল ২৭ লাখ টনের বেশি। এসব পণ্য পরিবহনে বাংলাদেশের জাহাজ ব্যবহার হয়েছে ৩ হাজার ৩০০টি। পাশাপাশি ভারতের ৮৬টি জাহাজ ব্যবহূত হয়েছে। সেই বছরও পণ্য পরিবহন কাজে ব্যবহূত জাহাজের ৯৮ শতাংশই ছিল বাংলাদেশী।
২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২৪ লাখ টনের বেশি পণ্য আমদানি-রফতানিতে বাংলাদেশের জাহাজ ব্যবহার হয়েছে ৯৫ শতাংশ বা ২ হাজার ৬৮৫টি। বিপরীতে ভারতের জাহাজ ব্যবহূত হয়েছে ৫৯টি। এর পরের অর্থবছরে আমদানি-রফতানির পরিমাণ ছিল ২৭ লাখ ৮০ হাজার টনের বেশি। সে বছর ৯৬ শতাংশ অর্থাৎ বাংলাদেশের ৩ হাজার ১৯২টি জাহাজে পণ্য পরিবহন করা হয়। বিপরীতে ভারতের জাহাজ ব্যবহূত হয়েছে ৭০টি।
সবশেষ ২০২০-২১ অর্থবছরে নৌপথে দুই দেশের আমদানি-রফতানির পরিমাণ ছিল ৩৯ লাখ ৫৯ হাজার টনের বেশি, যা আনা-নেয়ার কাজে বাংলাদেশের জাহাজ ব্যবহার হয়েছে ৩ হাজার ৯১৩টি, শতাংশের হিসেবে যা ৯২। বিপরীতে ভারতের জাহাজ ব্যবহূত হয়েছে ২২৬টি।
বিআইডব্লিউটিএর নৌ-নিট্রা বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, আগে সড়কপথে ভারত থেকে পণ্য আমদানি হতো বেশি। কিন্তু এখন ব্যবসায়ীরা নৌপথ ব্যবহারেও আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। সেজন্য এ পথে বাণিজ্যের পরিমাণ বেড়েছে।
সংসদীয় কমিটিতে দেয়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নৌপথে বাণিজ্যের জন্য ১৯৭২ সাল থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রটোকল অন ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রানজিট অ্যান্ড ট্রেড (পিআইডব্লিউটিটি) চলমান রয়েছে। ২০০০ সালের আগ পর্যন্ত শুধু ভারতীয় জাহাজের মাধ্যমে পণ্য আনা-নেয়া করা যেত। ২০০০ সালের পর এ কাজে বাংলাদেশের জাহাজও সম্পৃক্ত হয়। প্রটোকল অনুযায়ী যদিও আমদানি-রফতানিতে দুই দেশের সমানসংখ্যক জাহাজ ব্যবহার হওয়ার কথা। ২০০১-০২ অর্থবছরে নৌবাণিজ্যে ভারতের জাহাজের ৫৫ শতাংশ পরিবহনের বিপরীতে বাংলাদেশের জাহাজ ব্যবহারের হার ছিল ৪৫ শতাংশ। এর পরের কয়েক বছরও ভারতীয় জাহাজ দিয়েই বেশির ভাগ পণ্য পরিবহন করা হতো। তবে ২০০৫ সালের পর থেকে বাংলাদেশের জাহাজের পণ্য পরিবহনের পরিমাণ বাড়তে থাকে।
নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, গত কয়েক বছরে দেশে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। নৌপথের উন্নয়নও হয়েছে। নিয়মিত ড্রেজিংয়ের কারণে নদীর নাব্যতা বেড়েছে। ফলে বেশির ভাগ নদীতেই এখন মাঝারি বা বড় আকারের পণ্যবাহী নৌযান যাতায়াত করতে পারে। এছাড়া বাংলাদেশের জাহাজ শিল্পও অনেক এগিয়েছে। এ শিল্পে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটেছে, বিনিয়োগ বেড়েছে। এসব কারণে নৌপথে পণ্য আমদানি-রফতানি বেড়ে গিয়েছে। তাছাড়া নৌপথে পণ্য পরিবহনে সময় কম লাগছে, খরচও তুলনামূলক কম। ফলে বাণিজ্য বাড়ছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নৌপথে ভারত থেকে এক সময় শুধু সিমেন্টের কাঁচামাল ফ্লাই অ্যাশ আমদানি হতো। এখন তার পাশাপাশি চাল, গম, ভুট্টার মতো শস্য, স্টিলের উপকরণ ইত্যাদিও নৌপথের মাধ্যমে আমদানি হয়। এছাড়া ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে আমদানি-রফতানি বেড়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের ১০টি সুনির্দিষ্ট নৌপথ দিয়ে এসব জাহাজ চলাচল করে। দুই দেশের মধ্যে উপকূলীয় নৌচলাচল শুরু হওয়ায় পণ্য পরিবহনের সময় ৭ থেকে ১০ দিনে নেমে এসেছে। এতে পরিবহন ব্যয় সাশ্রয় হচ্ছে।
বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি ভারতের আগ্রহের কারণে পুরনো বেশকিছু নৌপথ চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এসব নৌপথে ড্রেজিং করে সারা বছর নদীর নাব্যতা ধরে রাখার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। এছাড়া ত্রিপুরা, আসামসহ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অঞ্চলের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়াতে সড়ক, রেলপথের পাশাপাশি নৌপথকেও সমান গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আমদানি-রফতানির জন্য নৌযানে পরিবাহিত পণ্য পরে সড়কপথে পরিবহনের সুবিধার জন্য সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়নও করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
এসব উদ্যেগের মধ্যে আশুগঞ্জ থেকে আখাউড়া স্থলবন্দর পর্যন্ত সড়কটি চার লেনে উন্নীত করা হচ্ছে। আবার আখাউড়া থেকে আগরতলা পর্যন্ত সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপন করতে ১১ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণের কাজ চলছে। এছাড়া চট্টগ্রামের বারইয়ারহাট থেকে রামগড় সীমান্ত পর্যন্ত সড়কটি প্রশস্ত করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে বা বাংলাদেশ থেকে ভারতে পণ্য পরিবহনের জন্য নৌপথটিই ব্যবসায়ীদের কাছে সুবিধাজনক মনে হচ্ছে। ফলে এ পথে প্রতি বছরই বাড়ছে পরিবাহিত পণ্যের পরিমাণ। আবার বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নের কারণে জাহাজ চলাচল খাতটি উন্নত হওয়ায়, পণ্য আমদানিতে এ খাতটির সম্পৃক্ততাও অনেক বেড়েছে। যার কারণে ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের অনেক বেশি জাহাজ এ পথে পণ্য আনা-নেয়ার কাজ করছে।










