দেশে কনজিউমার ডিউরেবলস বা দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহার্য ইলেকট্রনিক পণ্যের বাজার ক্রমেই বড় হচ্ছে। গত পাঁচ বছরে এসব পণ্যের বিক্রি বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। এর মধ্যে টিভি, ফ্রিজ ও এসির প্রবৃদ্ধি ছিল ঈর্ষণীয়। ব্যক্তিগত যানবাহন হিসেবে এ সময় মোটরসাইকেলের সংখ্যাও বেড়েছে। তবে কমে গেছে ব্যক্তিগত গাড়ির বিক্রয় প্রবৃদ্ধি। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কভিড-১৯-এর অভিঘাতে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে কনজিউমার ডিউরেবলসের প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তাই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের সঙ্গে সংগতি রেখে দ্রুতই এ বাজার ঘুরে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন তারা।

বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, দেশের কনজিউমার ইলেকট্রনিকসের বাজারে গত এক দশকে গড়ে ১৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৫ সালে এর আকার ৬ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াবে। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উত্থান, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি ও শহুরে মানুষের ক্রমবর্ধমান সংখ্যার সঙ্গে কনজিউমার ইলেকট্রনিকস বাজারের প্রবৃদ্ধি নির্ভরশীল।

টেলিভিশনের বাজারের আকার বর্তমানে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ২৭ শতাংশ অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে এ বাজারের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ওয়ালটন। ২০১৯ সালে কোম্পানিটি ২ লাখ ৭৩ হাজার ২৭৭টি টেলিভিশন উৎপাদন করেছিল। এর পরের বছর এটি বেড়ে দাঁড়ায় ৬ লাখ ৭৫ হাজারে। এ সময় কোম্পানিটির টেলিভিশন উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯৮ শতাংশ। একই সময়ে এলজি-বাটারফ্লাইয়ের টেলিভিশন বিক্রি বেড়েছে ১০ শতাংশ। অন্যদিকে বহুজাতিক কোম্পানি সিঙ্গার বাংলাদেশের টেলিভিশন উৎপাদনের পরিমাণ ২০২০ শেষে দশমিক ৭৪ শতাংশ কমেছে।

স্থানীয় ব্র্যান্ড হিসেবে দেশের বাজারে র্যাংগস, মাইওয়ানের পাশাপাশি বিদেশী ব্র্যান্ড হিসেবে সনি, স্যামসাং, প্যানাসনিক, তোশিবা, ফিলিপস ও স্যানিয়ো টেলিভিশন বিক্রি করে থাকে। এলজির বাংলাদেশের স্থানীয় অংশীদার বাটারফ্লাইয়ের মাধ্যমে দেশেই স্যামসাংয়ের স্মার্ট টেলিভিশন তৈরির কারখানা স্থাপন করছে। এ কারখানায় ফেয়ার ইলেকট্রনিকসও স্যামসাংয়ের টিভি উৎপাদন করবে।

এক সময়ে রেফ্রিজারেটরের বাজারে বিদেশী ব্র্যান্ডগুলোর আধিপত্য থাকলেও বর্তমানে দেশী ব্র্যান্ডগুলোর দখলে রয়েছে এ বাজারের ৭৭ শতাংশ। বর্তমানে দেশে রেফ্রিজারেটর বাজারের আকার দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার কোটি টাকায়। এর মধ্যে শীর্ষে থাকা ওয়ালটনের দখলে রয়েছে এ বাজারের ৭১ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২০ সালে এর আগের বছরের তুলনায় কোম্পানিটির রেফ্রিজারেটর বিক্রিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৪ শতাংশ। এর আগের বছর ২০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। অবশ্য ২০২১ সাল শেষে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ২৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০২০ সালে রেফ্রিজারেটর বিক্রিতে এসকোয়্যার ইলেকট্রনিকসের ২৫ শতাংশ এবং এলজি-বাটারফ্লাইয়ের ৩৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অবশ্য এ সময়ে বহুজাতিক কোম্পানি সিঙ্গার বাংলাদেশের রেফ্রিজারেটর উৎপাদন সামান্য বেড়েছে।

যমুনা, মাইওয়ানের মতো স্থানীয় ব্র্যান্ডের পাশাপাশি স্যামসাং, হিটাচি, ওয়ার্লপুলের রেফ্রিজারেটরের বাজার রয়েছে দেশে। এলজি বাটারফ্লাই বাংলাদেশে রেফ্রিজারেটর কারখানা স্থাপনের জন্য বিনিয়োগ করেছে। ফেয়ার ইলেকট্রনিকস স্যামসাংয়ের সঙ্গে মিলে দেশে রেফ্রিজারেটর উৎপাদন কারখানা করেছে।

ওয়ালটনের রেফ্রিজারেটর উইংয়ের চিফ বিজনেস অফিসার আনিসুর রহমান মল্লিক বণিক বার্তাকে বলেন, বাজার অংশীদারিত্বের হিসাবে ২০১৯ ও ২০২০ সালে আমাদের অবস্থান প্রায় অপরিবর্তিত ছিল। তবে কভিডের কারণে ২০২০ সালে আমাদের রেফ্রিজারেটরের বিক্রি কমেছিল। ২০২১ সালে এসে বিক্রির পরিমাণ আবারো বেড়েছে। এ সময়ে আমাদের বাজার অংশীদারিত্বের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৪ দশমিক ৫ শতাংশে।

দেশে এয়ারকন্ডিশনারের বর্তমান বাজারের আকার ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। গত ছয় বছর ধরে এ খাতে ২০ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। স্থানীয় কোম্পানিগুলোর দখলে রয়েছে মোট বাজারের ৭০ শতাংশ। এসি বিক্রির সংখ্যার দিক দিয়ে ওয়ালটন ও জেনারেল শীর্ষে রয়েছে। এর মধ্যে ২০২০ সালে এসি উৎপাদনের পরিমাণ বেড়েছে ৭৭ শতাংশ। এ সময় এসকোয়্যার ইলেকট্রনিকসের ১০ শতাংশ এবং এলজি-বাটারফ্লাইয়ের ১৪৪ শতাংশ বিক্রি বেড়েছে। স্থানীয় ব্র্যান্ডের বাইরে দেশের বাজারে গ্রি, দাইকিন ও ওয়ার্লপুল ব্র্যান্ডের এসিও বিক্রি হয়ে থাকে। স্যামসাং তার স্থানীয় অংশীদারের সঙ্গে যৌথভাবে বাংলাদেশে এসি উৎপাদনের কারখানা স্থাপন করেছে।

শার্প ব্র্যান্ডের ইলেকট্রনিকস পণ্য বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান এসকোয়্যার ইলেকট্রনিকসের সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. মনজুরুল করিম বলেন, কভিড-১৯ অতিমারীর শুরু থেকেই আমাদের লো এন্ডের গ্রাহক কমে গেছে। এর বিপরীতে হাই এন্ডের গ্রাহক বেড়েছে। খাদ্য সংরক্ষণের প্রবণতা বাড়ার কারণে ডিপ ফ্রিজের চাহিদা বেড়েছে। মানুষ ঘরে বেশি থাকার কারণে এসির বিক্রি বেড়েছে। সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকেও আমরা ভালো পরিমাণে এসির কার্যাদেশ পেয়েছি। কভিডের অভিঘাত সামলে ইলেকট্রনিকসের বাজার পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থানে যেতে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে জানান তিনি।

কভিডে কারণে ওয়াশিং মেশিনের চাহিদাও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যহারে। এর মধ্যে ২০২০ সালে ওয়াশিং মেশিন বিক্রিতে এসকোয়্যার ইলেকট্রনিকসের ৪০০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২১ সালে প্রবৃদ্ধির পরিমাণ বেড়েছে ২০ শতাংশ। ২০২০ সালে এলজি বাটারফ্লাইয়ের ওয়াশিং মেশিন বিক্রি বেড়েছে ৫৩ শতাংশ। এ সময়ে অন্যান্য ব্র্যান্ডের বিক্রিও বেড়েছে।

রাইডশেয়ারিংয়ের সুবাদে দেশের মোটরসাইকেলের বাজার বেড়েছে। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ২০১৯ সালে বিআরটিএতে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যার ক্ষেত্রেও। এ বছর সংস্থাটিতে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ১ হাজার ৪৫২টি। ২০২০ সালে এটি কমে ৩ লাখ ১১ হাজার ১৬টিতে দাঁড়িয়েছে। ২০২১ সালে কিছুটা বেড়ে মোটরসাইকেলের নিবন্ধনের সংখ্যা ৩ লাখ ৭৫ হাজার ২৫২টি হয়েছে। মূলত কভিডের কারণেই মোটরসাইকেল বাজারের প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমে গেছে। দেশের বাজারে বাজাজ, হোন্ডা, হিরো, ইয়ামাহা, টিভিএস, সুজুকি ও রানার ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল বেশি বিক্রি হয়ে থাকে।

উত্তরা মোটরস, টিভিএস, হিরো, হোন্ডা, ইয়ামাহা, সুজুকি, এটলাস, গ্রামীণ মোটরস ও রানার মোটরস দেশে মোটরসাইকেল উৎপাদন ও সংযোজন কারখানা স্থাপন করেছে। এর মধ্যে রানার, হোন্ডা ও হিরো দেশেই মোটরসাইকেল উৎপাদন করছে।

রানার অটোমোবাইলসের কর্মকর্তারা জানান, ২০১৯ সালে মোটরসাইকেল নিবন্ধনের পরিমাণ বাড়লেও কভিডের প্রভাবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমার কারণে ২০২০ সালে এটি কমে যায়। ২০২১ সালে মোটরসাইকেলের বিক্রি বাড়লেও সেটি ২০১৯ সালকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। তবে কভিড পরিস্থিতির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে মোটরসাইকেলের বাজারও ঘুরে দাঁড়াবে বলে আমরা আশাবাদী।

দেশে ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক গাড়ির বাজার প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর। এতদিন শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ দেশে গাড়ি সংযোজন করে আসছিল। যার সিংহভাগ ক্রেতা সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। তবে গাড়ি আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে বর্তমানে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা দেশে গাড়ি সংযোজনে ঝুঁকছেন। এরই মধ্যে পিএইচপি গ্রুপ ব্যক্তিগত গাড়ি ও ইফাদ অটোস বাণিজ্যিক গাড়ি সংযোজন কারখানা স্থাপন করেছে। এছাড়া জাপানি গাড়ি নির্মাতা হুন্দাই ও মিত্সুবিশি দেশে গাড়ি তৈরির কারখানা স্থাপনে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ফলে সামনের দিনগুলোতে দেশে ব্যক্তিগত গাড়ির বাজার আরো বড় হবে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণীই মূলত ব্যক্তিগত গাড়ির মূল ভোক্তা। বিআরটিএর পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৯ সালে ১৬ হাজার ৭৭৯টি ব্যক্তিগত গাড়ি নিবন্ধিত হয়েছে। এর পরের বছর ২০২০ সালে নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা ছিল ১২ হাজার ৪০৩টি। অবশ্য ২০২১ সালে এটি বেড়ে ১৬ হাজার ৪৯টিতে দাঁড়িয়েছে। দেশে টয়োটা, মিত্সুবিশি, হোন্ডা, হুন্দাই ব্র্যান্ডের গাড়ি বেশি বিক্রি হয়ে থাকে।

বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের (বিসিজি) পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০১৫ সালে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ২০ লাখ, যা ২০২৫ সালে গিয়ে ৩ কোটি ৪০ লাখে দাঁড়াবে। প্রতি বছর এ শ্রেণীতে গড়ে ১০ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ যোগ হচ্ছে, যা ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের চেয়ে বেশি। মূলত এ সম্ভাবনার বিষয়টি বিবেচনা করেই স্থানীয় বড় ব্যবসায়িক গ্রুপগুলো ইলেকট্রনিকস খাতে বড় অংকের বিনিয়োগ করেছে। পাশাপাশি বাজার ধরে রাখতে বেশকিছু বিদেশী ব্র্যান্ডও বাংলাদেশে তাদের কারখানা স্থাপন করেছে। কভিডের অভিঘাতে কনজিউমার ডিউরেবলসের প্রবৃদ্ধি কিছুটা থমকে গেলেও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে গতি ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে এ খাতেও প্রবৃদ্ধি বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।