বাংলাদেশে সমুদ্রপথে আমদানি হওয়া পণ্যের বড় অংশই আসছে মাত্র পাঁচটি দেশ থেকে। ভোগ্যপণ্য থেকে শিল্পপণ্যে সব ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি একই। ফলে এসব রফতানিকারক দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক যেকোনো ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হলে সরাসরি প্রভাব পড়ে অভ্যন্তরীণ বাজারে। এমন পরিস্থিতিতে সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিয়ে আমদানির বিকল্প উৎসদেশ ঠিক করার তাগিদ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। এটি না করতে পারলে সংকটের সময়ে নিরাপদ অংশীদার খুঁজে পেতে কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে বলে মনে করছেন তারা।

সমুদ্রপথে সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে এর আগেও বাংলাদেশের ওপর বড় চাপ তৈরি হওয়ার নজির রয়েছে। দেশে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের ৯২ শতাংশই চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে সমদ্রপথে পরিচালিত হয়। সমুদ্রপথে আমদানির ক্ষেত্রে দেশভিত্তিক নির্ভরতা বিশ্লেষণ করেছে বণিক বার্তা। এতে দেখা যায়, আমদানির ক্ষেত্রে ১৫০টিরও বেশি দেশ থেকে পণ্য আনা হয়। তবে এর সিংহভাগই আমদানি হচ্ছে পাঁচটি দেশ থেকে। বাণিজ্যিক ও শুল্কমুক্ত সুবিধা উভয় মিলে গত বছর চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি হয়েছে ৫ লাখ ৭৪ হাজার ৮২২ কোটি টাকার পণ্য। এর মধ্যে চীন, সিঙ্গাপুর, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া—এ পাঁচ দেশ থেকেই সম্মিলিতভাবে আমদানি হয়েছে ৩ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা মূল্যের পণ্য, যা চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে মোট আমদানির প্রায় ৫৩ শতাংশ। পরিসংখ্যান বলছে, এসব দেশ থেকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কিংবা অন্য কোনো কারণে সমুদ্রপথে সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলেই বাংলাদেশের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ে।

বাংলাদেশের জন্য বড় রফতানিকারক দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এ পাঁচ দেশের মধ্যে চীন থেকে সমুদ্রপথে জাহাজে পণ্য আসে মূলত দক্ষিণ চীন সাগর, মালাক্কা প্রণালি, আন্দামান সাগর দিয়ে বঙ্গোপসাগর হয়ে। আনুমানিক ৫ হাজার নটিক্যাল মাইল দূরের এ পথ পাড়ি দিতে একটি জাহাজের গড়ে ১২-১৫ দিন সময় লাগে। অন্যদিকে সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রে আমদানি পণ্য নিয়ে আসা জাহাজও সমুদ্রপথে একই রুট ব্যবহার করে। এ তিন দেশের সমুদ্রবন্দর থেকে জাহাজ প্রথমে মালাক্কা প্রণালি ও তারপর আন্দামান সাগর হয়ে বঙ্গোপসাগরে পৌঁছে। এ রুটে আনুমানিক দেড় হাজার নটিক্যাল মাইল পাড়ি দিয়ে দেশের জলসীমায় পৌঁছাতে চার-পাঁচদিন সময় লাগে। এছাড়া ভারতের পূর্বদিকের রাজ্যগুলোর পণ্য সরাসরি বঙ্গোপসাগর হয়ে আসার সুযোগ থাকলেও মুম্বাইয়ের মতো পশ্চিম দিকের রাজ্যের পণ্য সমুদ্রপথে অনেকটা ঘুরে আসতে হয়। ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ নটিক্যাল মাইল দূরত্বের এ রুট আরব সাগরের ভারতের তীর ঘেঁষে নেমে আসে। এরপর শ্রীলংকার দক্ষিণ তীর ঘুরে বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্ব দিক দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছে। সমুদ্রের এ পথ পাড়ি দিতে সময় লাগে প্রায় এক সপ্তাহ।

দ্য নটিক্যাল ইনস্টিটিউট চট্টগ্রামের সভাপতি ক্যাপ্টেন ফয়সাল আজিম বণিক বার্তাকে বলেন, সমুদ্রপথে চীন, সিঙ্গাপুর, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে যে আমদানি কার্যক্রম পরিচালিত হয়, সেটা তিনটি রুটে দেশের জলসীমায় এসে পৌঁছে। ফলে দেশের আমদানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে হলে এসব দেশের সঙ্গে সমুদ্রপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা সবসময় স্থিতিশীল থাকা জরুরি।

সমুদ্রপথে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি পণ্য আমদানি হয় চীন থেকে। গত বছর দেশটি থেকে ১ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকার পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছে। যেখানে ২০১৬ সালে দেশটি থেকে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি হয় ৭৩ হাজার ৬২০ কোটি টাকার। চীন থেকে যেসব পণ্য আমদানি হয় তার বড় অংশ সাধারণ মানুষের ব্যবহারের পণ্য। এছাড়া সরকারের অনেক প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য যন্ত্রপাতিসহ মূলধনি যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রেও দেশটির ওপর প্রতিনিয়ত আমদানিনির্ভরতা বেড়েই চলেছে।

সমুদ্রপথে সিঙ্গাপুর থেকেই বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আমদানি হচ্ছে। জ্বালানির ওপর ভর করেই দেশটি থেকে আমদানির পরিমাণ বাড়ছে। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ২০২১ সালে সিঙ্গাপুর থেকে আমদানি হয়েছে ৬০ হাজার ৬৩১ কোটি টাকার পণ্য, যা ২০১৬ সালে ছিল ৩৮ হাজার ৫৪ কোটি টাকার। মূলত দেশটি থেকে ফার্নেস অয়েল আমদানি হচ্ছে। সম্প্রতি সিঙ্গাপুর থেকে ৬৭ লাখ ২০ হাজার এমএমবিটিইউ (মিলিয়ন ম্যাট্রিক ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট) এলএনজি আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। দেশটি থেকে ৩৩ লাখ ৬০ হাজার এমএমবিটিইউ এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যার আর্থিক মূল্য মোট ১ হাজার ২০৫ কোটি ৭২ লাখ টাকা।

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সমুদ্রপথে তৃতীয় সর্বোচ্চ আমদানি হচ্ছে ভারত থেকে। ২০২১ সালে দেশটি থেকে ৫৩ হাজার ৭৯০ কোটি টাকার পণ্য আমদানি হয়েছে, যা ২০১৬ সালে ছিল ১৯ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকার। খাদ্যশস্য ছাড়াও দেশটি থেকে যানবাহনের যন্ত্রাংশ, মেশিনারি, তুলা, জ্বালানি, কেমিক্যালসের মতো পণ্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আমদানি হয়। সাম্প্রতিক সময়ে দূরের দেশগুলো থেকে সমুদ্রপথে আমদানি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ভারত থেকে আমদানিনির্ভরতা আরো বাড়ছে। এছাড়া সড়কপথে বিশেষত স্থলবন্দরে পণ্যজটের কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি সমুদ্রপথে বাণিজ্য বাড়ানোর ব্যাপারে বরাবরই আগ্রহী ভারত।

ইন্দোনেশিয়া থেকে ২০২১ সালে আমদানি হয়েছে ৩০ হাজার ৭৬৭ কোটি টাকা মূল্যের পণ্য। যেখানে ২০১৬ সালে আমদানি হয় ১৪ হাজার ১৭০ কোটি টাকার। পাম অয়েল আমদানিতে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের প্রথম পছন্দ ইন্দোনেশিয়া। আবার দেশটি বিশ্বের বৃহত্তম কয়লা রফতানিকারক দেশ। যে কারণে এ দুটি পণ্য ছাড়াও পাথর, মার্বেল পাথর, টায়ারের মতো পণ্যও আমদানি হচ্ছে।

বাংলাদেশের সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ার বাণিজ্য ক্রমে বাড়তে থাকলেও ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমানে অভ্যন্তরীণ শিল্প উৎপাদন খাতে মনোযোগ বাড়াচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহৎ অর্থনীতির দেশটি। এরই অংশ হিসেবে ধাতব পণ্যের কাঁচামাল রফতানিতে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিচ্ছে সে দেশের সরকার। গাড়ির ব্যাটারি উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াতে এরই মধ্যে নিকেল আকরিক রফতানি বন্ধের পদক্ষেপ নিয়েছে তারা।

এছাড়া মালয়েশিয়া থেকে ২০২১ সালে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি হয়েছে ২৮ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকার পণ্য। ২০১৬ সালে দেশটি থেকে আমদানি হয় ১৩ হাজার ৩৪ কোটি টাকার পণ্য। ইন্দোনেশিয়ার পর সবচেয়ে বেশি ভোজ্যতেল আসে মালয়েশিয়া থেকে। এর পাশাপাশি দেশটি থেকে উল্লেখযোগ্য ইলেকট্রনিকস সামগ্রীও আমদানি হচ্ছে।

এ কয়েকটি দেশের ওপর অতিমাত্রায় আমদানিনির্ভরতাকে ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে বিকল্প উৎসের তাগিদ দিচ্ছেন ব্যবসায়ী নেতারা। চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, দেশের ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতা করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পণ্য কেনেন। কিন্তু আমদানির ক্ষেত্রে কোনো দেশের প্রতি অতিনির্ভরতা আমদানিকারককে যেকোনো সময়ে খারাপ পরিস্থিতিতে ফেলে দিতে পারে। কারণ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কিংবা অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধি যেকোনো ইস্যু সে দেশ থেকে সরবরাহে বাধার কারণ হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে ব্যবসায়ীদের। আগে থেকে সময় নিয়ে বিকল্প উৎস গড়ে না তুললে পরে সংকটের সময়ে চড়া দামে পণ্য কেনায় বাজার অস্থিতিশীল হয়। আবার তাড়াহুড়ো করে সংকট থেকে দ্রুত বের হয়ে আসাও সম্ভব হয়ে ওঠে না।

যেকোনো দেশের মধ্যে সংঘাতের প্রভাব দ্রুত অন্য দেশগুলোর ওপরে কীভাবে ছড়িয়ে যায় তার চলমান উদাহরণ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতি। যুদ্ধের কারণে সমুদ্রপথে রাশিয়া ও ইউক্রেনের বন্দরে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে রেকর্ড ছুঁয়েছে। যার বড় প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারেও। যদিও রাশিয়া থেকে গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে পণ্য আমদানির পরিমাণ কমেছে।

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি হওয়া তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিশ্বের যেসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য বা আমদানি-রফতানি বেশি হয়, টাকার অংকে সেই তালিকার শীর্ষ ২০টি দেশের মধ্যেও নেই রাশিয়া বা ইউক্রেন। খাদ্যপণ্যের মধ্যে রাশিয়া থেকে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি আমদানি হয় গম। ইউক্রেন থেকেও পণ্যটি আমদানি করা হয়। যুদ্ধের কারণে এরই মধ্যে গম, সূর্যমুখী তেল ও ভুট্টার মতো পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। এর বাইরে তুলা, সরিষা ও মসুর ডালও এ দুই দেশ থেকে আমদানি হয়।

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১ সালে রাশিয়া থেকে ৪ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকার পণ্য আমদানি হয়েছে। ২০১৬ সালে দেশটি থেকে আমদানি হয় ১০ হাজার ৮২৭ কোটি টাকার। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে থাকা ইউক্রেন থেকে ২০২১ সালে আমদানি হয়েছে ২ হাজার ৯৫২ কোটি টাকার পণ্য। যেখানে দেশটি থেকে ২০১৬ আমদানি হয় ২ হাজার ৮৬৫ কোটি টাকার।