উচ্চ ঘনবসতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উচ্চ তাপমাত্রা, বন্যা ও অভিযোজনক্ষমতার অভাবে বিশ্বের সবচেয়ে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল দক্ষিণ এশিয়া। আর এ অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। ২০৩০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার ১৮০ কোটি মানুষ উচ্চ তাপপ্রবাহ ও ৪৬ কোটি মানুষ বন্যার শিকার হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাংক। ‘ঝুঁকি থেকে স্থিতিস্থাপকতা: দক্ষিণ এশিয়ায় মানুষ ও প্রতিষ্ঠানের অভিযোজনে সহায়তা’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে গতকাল এ কথা জানানো হয়। প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ সিদ্ধার্থ শর্মা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী দশকে দক্ষিণ এশিয়া ক্রমাগত জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এ অঞ্চলের ১৮০ কোটি বা ৮৯ শতাংশ মানুষ চরম তাপপ্রবাহ এবং ৪৬ কোটি মানুষ প্রবল বন্যার মুখোমুখি হতে পারে। যা মোট জনসংখ্যার ২২ শতাংশ। ঝুঁকিতে থাকা জনসংখ্যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে দরিদ্র ও কৃষিনির্ভর পরিবারগুলো। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট দুর্যোগে মানবসম্পদ এবং অন্যান্য সম্পদের ক্ষতির পাশাপাশি প্রভাব পড়বে মানুষের আয়ের ওপরও।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, বিশ্বের উদীয়মান বাজার এবং উন্নয়নশীল অর্থনীতির মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া সবচেয়ে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে এ অঞ্চলের দেশগুলোর সরকার ঝুঁকি মোকাবেলায় ব্যবস্থা নিতে পারে না। ফলে জলবায়ু অভিযোজনের ভার মূলত সাধারণ মানুষ ও সহযোগী সংস্থাগুলোর ওপর পড়ে। এসব এলাকায় বেশির ভাগ মানুষ ও সংস্থা আগামী ১০ বছরে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে ৬৩ শতাংশ সংস্থা এবং ৮০ শতাংশ পরিবার দুর্যোগ মোকাবেলায় পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে এর বেশির ভাগই উন্নত প্রযুক্তি ও অবকাঠামো ব্যবহারের পরিবর্তে মৌলিক, কম ব্যয়বহুল প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল।
বিশ্বব্যাংকের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ সিদ্ধার্থ শর্মা বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মতো উচ্চ জনসংখ্যার দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে রয়েছে। এখানে প্রায় ১৮০ কোটি মানুষ তীব্র তাপপ্রবাহ এবং ৪৬ কোটি মানুষ প্রবল বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে। এ দুর্যোগ মোকাবেলায় অভিযোজনকে গুরুত্ব দিতে হবে, যা বাজেট ঘাটতির কারণে সরকারের পক্ষে করা কঠিন। তবে বেসরকারি খাতকে যুক্ত করলে কার্যকর সমাধান হতে পারে।’
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় ২০২৯ সাল নাগাদ অর্থনৈতিক ও অন্যান্য ক্ষতির পরিমাণ তিন গুণ বেড়ে যেতে পারে। উচ্চ তাপমাত্রা ও বৃষ্টিনির্ভর কৃষির ওপর নির্ভরতা ২০৫০ সালের মধ্যে উৎপাদন ও মাথাপিছু আয়ের ক্ষতি অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক বাড়িয়ে দিতে পারে। এ সময়ের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার কৃষি উৎপাদন ৭ দশমিক ৫ শতাংশ কমার ঝুঁকি রয়েছে। তবে বেসরকারি খাত যদি নমনীয়ভাবে সম্পদের স্থানান্তর করতে পারে, তাহলে সম্ভাব্য ক্ষতির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমানো সম্ভব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জিল্লুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় প্রথম সারিতে রয়েছে। আমাদের পরিকল্পনা ছিল এ শতাব্দীতে যেন তাপমাত্রা ২ মাত্রার বেশি বৃদ্ধি না পায় সেটা নিশ্চিত করা। কিন্তু সেটা করা সম্ভব হচ্ছে না। উন্নয়নশীল দেশগুলো গ্রিনহাউজ গ্যাস বাড়াচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ কমিয়ে আনার চেষ্টা করছে। এখন আমাদের দরকার কীভাবে অভিযোজন করা যায় সেটা দেখা। গ্রিনহাউজ গ্যাস কমানো, জলাশয় বাড়ানো, ভবনে তাপমাত্রা সহনশীল রঙ করার মতো পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে।’
বিশ্বব্যাংক প্রতিবেদন তৈরিতে বাংলাদেশের ২৫০টি পরিবারের ওপর জরিপ চালায়। যেখানে দুর্যোগ মোকাবেলায় অভিযোজনের বিষয়টি লক্ষ করে তারা। বাংলাদেশের পরিবারগুলোর ওপর পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য সবচেয়ে জরুরি জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো। দীর্ঘমেয়াদে ৫৭ শতাংশ পরিবার পর্যাপ্ত দুর্যোগ সুরক্ষা অবকাঠামোর অভাবকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ৫৬ শতাংশ পরিবার বলেছে, আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে তারা প্রয়োজনীয় অভিযোজন করতে পারছে না।
বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের কেস স্টাডিতে দেখা গেছে, দুর্যোগের ধাক্কা মোকাবেলা ও দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণদের সহায়তা প্রদানের জন্য হালনাগাদ তথ্যের সঙ্গে সুনির্দিষ্ট সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি দ্রুত বৃদ্ধি করা যেতে পারে। তবে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে সরকারের কাজ করার সীমিত সুযোগ থাকায় একটি বিস্তৃত নীতি প্যাকেজের মাধ্যমে বেসরকারি খাতের অভিযোজন সহজতর করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ও ভুটানের জন্য বিশ্বব্যাংকের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেম বলেন, ‘পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের স্থিতিস্থাপকতা ক্রমাগত পরীক্ষা করা হচ্ছে। অভিযোজন ব্যাপক হলেও ক্রমবর্ধমান জলবায়ু ঝুঁকির সঙ্গে অন্যান্য উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। দেশের স্থিতিস্থাপকতা নির্ভর করবে প্রাথমিক সতর্কতা ব্যবস্থা, সামাজিক সুরক্ষা, জলবায়ু-স্মার্ট কৃষি এবং অভিযোজন অর্থায়ন ও উদ্ভাবনী ঝুঁকি অর্থায়ন বৃদ্ধির ওপর।’
প্রতিবেদনে জলবায়ু অভিযোজনের জন্য একটি ব্যাপক, বহুমুখী পদ্ধতির সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঝুঁকি মোকাবেলায় প্রাথমিক সতর্কতা ব্যবস্থার উন্নতি ও আনুষ্ঠানিক ঋণ এবং বীমা সুবিধা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ মোকাবেলায় বেসরকারি খাত যদি তাদের সম্পদ ও বিনিয়োগ এমন জায়গায় স্থানান্তর করতে সক্ষম হয়, যেখানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তাহলে জলবায়ু সম্পর্কিত প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ক্ষতি এড়ানো যেতে পারে। এছাড়া সামাজিক সুরক্ষা প্রোগ্রাম শক্তিশালী ও দ্রুত কার্যকরযোগ্য করা, নগর পরিকল্পনায় জলবায়ু ঝুঁকি সংযুক্ত করা, স্থিতিস্থাপক অবকাঠামো নির্মাণও জরুরি বলে জানায় সংস্থাটি।
প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে বুয়েটের ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক মাশফিকুস সালেহীন বলেন, ‘রেজিলিয়েন্স কোনো সরলরৈখিক প্রক্রিয়া নয়। একটি কমিউনিটির দুর্যোগকবলিত হয়ে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা তার সামাজিক, প্রাকৃতিক, মানবিক, আর্থিক ও মানবসম্পদের ওপর নির্ভর করে। তাই শুধু দুর্যোগ-পরবর্তী প্রতিক্রিয়া নয় বরং কমিউনিটির সামগ্রিক সক্ষমতা বাড়ানোই স্থিতিস্থাপকতা নিশ্চিত করে। বাংলাদেশের প্রসঙ্গে বলতে গেলে, ঝুঁকি অঞ্চলভেদে ব্যাপকভাবে ভিন্ন। উত্তরাঞ্চলের বন্যা, উপকূলে লবণাক্ততা, নদী ভাঙনপ্রবণ এলাকা—এসবের ভূপ্রকৃতি, সামাজিক অবস্থা, জীবিকা এবং অভিযোজন পদ্ধতি ভিন্ন। তাই সারা দেশের জন্য এক ধরনের সমাধান কার্যকর নয়। এজন্য প্রেক্ষাপটনির্ভর অভিযোজন খুব জরুরি। সামাজিক, প্রাকৃতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে এক সঙ্গে দেখতে হবে। যেমন উপকূলীয় এলাকায় শুধু বাঁধ বানানো যথেষ্ট নয়, পুরো নদী ব্যবস্থার গঠনকে বোঝা না হলে অভিযোজন টেকসই হবে না। টেকসই সমাধানে বেসরকারি খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’
তবে টেকসই অভিযোজনের জন্য সরকারি নীতি প্রণয়ন জরুরি বলে মনে করেন প্রাণ গ্রুপের অর্থনৈতিক পরিচালক উজমা চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যা একক কোনো বিষয় নয়, এখানে অনেকগুলো উপাদান জড়িত। ব্যক্তিগত খাত সাধারণত কিছু নির্দিষ্ট বিষয় বিবেচনা করে—যেমন বন্যা প্রতিরোধের জন্য কী করব? তবে এটি সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। আমাদের মতো অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এসব ব্যবস্থা গ্রহণ করে, কিন্তু এ ধরনের পদক্ষেপ অন্যদের দ্বারা পুনরাবৃত্তি হয় না। এখানে সরকার একটি পরিকল্পনা তৈরি করবে, আর আমরা সেটি অনুসরণ করব। আমরা মনে করি দেশের আইন আমাদের নিয়ন্ত্রণ করবে এবং আমাদের তা মেনে চলতে হবে।’
এক্ষেত্রে সরকারি অর্থায়ন সীমিত হওয়ায় বেসরকারি বিনিয়োগ সুবিধা দিতে পারে বলে মনে করেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. ফারহিনা আহমেদ। তিনি বলেন, ‘এখানে আমাদের অর্থায়ন সীমিত। জলবায়ুতে অর্থায়নের জন্য আমরা প্রায় ৩৫০ কোটি ডলার সংগ্রহ করেছি। তবে এটি যথেষ্ট নয়। যদি আমরা সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত একটি বিনিয়োগ করতে পারি, তাহলে টেকসই সমাধান আসতে পারে। একটি বিনিয়োগ বা প্রকল্প কীভাবে জলবায়ুগত দিক এবং অভিযোজন ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে, সেটিই আমাদের মূল লক্ষ্য।’










