গত ২৯ জুলাই পাঠানো ওই চিঠির কোনো উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে নীলফামারীর সৈয়দপুরে প্রস্তাবিত এক হাজার শয্যার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পের পরবর্তী ধাপের কাজ এগোচ্ছে না। চীনের অর্থায়নও এখনো নিশ্চিত হয়নি।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উপসচিব ফাতেমা-তুজ-জোহরা ঠাকুর স্বাক্ষরিত চিঠিতে চীনা দূতাবাসের কাছ থেকে কারিগরি দলের সফরের সময়সূচি জেনে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগকে জানানোর জন্য ইআরডিকে অনুরোধ করা হয়। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য পায়নি স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ।

ফাতেমা-তুজ-জোহরা ঠাকুর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত ২৯ জুলাই চীনা দূতাবাসের কাছ থেকে সফরের সময়সূচি জানতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগকে (ইআরডি) অনুরোধ করি আমরা। কিন্তু এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ইআরডি আমাদের কিছু জানায়নি। এছাড়া আমাদের কাছে আর কোনো তথ্য নেই।’

চলতি বছরের জানুয়ারিতে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে এ প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এ হাসপাতাল নির্মাণে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ২৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে চীন সরকার ২ হাজার ২১৯ কোটি টাকা দেবে অনুদান হিসেবে। বাকি ৭৩ কোটি টাকা আসবে সরকারের জিওবি ফান্ড থেকে। হাসপাতালটি নির্মাণকাজ চলতি বছরের জানুয়ারিতে শুরু হয়ে ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু অনুমোদনের পর সাত মাস পেরিয়ে গেলেও অর্থায়নের সংস্থান না হওয়ায় এগোয়নি হাসপাতালটির নির্মাণ।

জানা যায়, চীন সরকার দুই বছর আগে বাংলাদেশে একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল করার আগ্রহ দেখায়। তখন বিভিন্ন জেলা থেকে হাসপাতাল নির্মাণের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন আসে। ‘বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী জেনারেল হাসপাতাল’ নিজেদের জেলায় করতে ঠাকুরগাঁও, রংপুর ও পঞ্চগড়ের মানুষ মিছিল-মানববন্ধন করেন। এছাড়া দেশের আরো কিছু জেলার মানুষও নিজেদের জেলায় এ হাসপাতাল স্থাপনের দাবি তোলেন। এ হাসপাতাল কোন জেলায় নির্মাণ করা হবে তা নিয়ে চলে দীর্ঘ আলোচনা। শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নীলফামারীকে প্রস্তাবিত জেলা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে।

ইআরডি কর্মকর্তারা বলছেন, চীনের প্রাথমিক সাড়ায় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার শেষ একনেকে হাসপাতালটি অনুমোদন দিলেও অর্থায়ন কীভাবে আসবে সে বিষয়টি পরিষ্কার করা হয়নি। তাই এখন জটিলতা তৈরি হয়েছে। ইআরডির মাধ্যমে চীন সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তেমন সাড়া মিলছে না। চীনের একটি প্রতিনিধি দল এরই মধ্যে ঘুরে গেছে। তারা স্থান নির্ধারণ, অর্থায়ন প্রক্রিয়া ও সুবিধাভোগী কারা হবেন এসব বিষয়ে জানতে চান। সব মিলিয়ে কিছু জটিলতা তৈরি হয়েছে। এখন দুই দেশের সরকারের উচ্চ পর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে একটা সমাধান হতে পারে।

চায়না ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এজেন্সির (সিডকা) একটি কারিগরি দল গত ৫ থেকে ১৪ মে বাংলাদেশ সফর করে। সফরকালে ৮ মে রংপুর এবং ৯ মে নীলফামারীতে প্রস্তাবিত হাসপাতাল নির্মাণের স্থান পরিদর্শন করে দলটি।

এরপর ১৪ মে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় চীনা প্রতিনিধি দলের প্রধান জানান, প্রস্তাবিত স্থানটি হাসপাতাল নির্মাণের জন্য উপযুক্ত। সেখানে বিদ্যুৎ, পানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো বিদ্যমান থাকায় স্থানটি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সুবিধাজনক বলে মত দেয় প্রতিনিধি দল।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য চীনের আরেকটি কারিগরি দলের বাংলাদেশ সফরের কথা রয়েছে। ওই সমীক্ষার ভিত্তিতে ইনভেস্টমেন্ট প্রজেক্ট ডকুমেন্ট (আইপিডি) প্রস্তুত করা হবে। আইপিডিতে প্রকল্পের পরিধি ও ব্যয় নির্ধারণের পরই পরবর্তী প্রক্রিয়া এগোনোর সুযোগ তৈরি হবে।

এখন পর্যন্ত চীনা দূতাবাস কিংবা ইআরডির কাছ থেকে কারিগরি দলের সফরের সময়সূচি সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে প্রকল্পের পরবর্তী ধাপের কাজও এগোচ্ছে না। দ্রুত সফরের সময়সূচি জানতে চীনা দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ইআরডিকে অনুরোধ করেছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ।

সৈয়দপুর-নীলফামারী সড়কের পাশে চড়াইখোলা ইউনিয়নে দারোয়ানী টেক্সটাইল মিলস সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ২৫ একর জমির ওপর হাসপাতালটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। নীলফামারী গণপূর্ত বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের জন্য এরই মধ্যে প্রায় ২৫ থেকে ২৮ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, হাসপাতালটি চালু হলে উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য একাধিক বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য হবে। এর মধ্যে থাকবে অনকোলজি, নিউরোলজি, কার্ডিওলজি ও নেফ্রোলজি বিভাগ। শিশু ও নবজাতকদের জন্য নিবিড় পরিচর্যা সুবিধার পাশাপাশি প্রায় ২০০ মেশিন নিয়ে একটি ডায়ালাইসিস কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে। থাকবে উন্নত রোগ নির্ণয়ের বিভিন্ন সুবিধা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাসপাতালটি চালু হলে উত্তরাঞ্চলের রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় যাওয়ার প্রয়োজন কমবে। এতে রোগী ও স্বজনদের চিকিৎসা ব্যয় কমার পাশাপাশি ঢাকার হাসপাতালগুলোর ওপরও চাপ কমানো সম্ভব হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পটির অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং বিস্তারিত কারিগরি সমীক্ষা শেষ করা জরুরি। চীনা কারিগরি দলের সফরের সময়সূচি জানতে পাঠানো চিঠির উত্তর না আসায় আপাতত অনিশ্চিত হয়ে আছে প্রকল্পটির পরবর্তী কার্যক্রম।

ইআরডির এশিয়া, জেইসি এবং এফঅ্যান্ড‌এফ অনুবিভাগের প্রধান ও অতিরিক্ত সচিব মাছুমা আকতার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নীলফামারীতে চীনের অর্থায়নে চীন-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল হওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্পটি জানুয়ারিতে অনুমোদন হয়েছে। অর্থায়নের বিষয়ে চীনের একটি টিম এরই মধ্যে এসেছে এবং আরো একটি টিম শিগগিরই আসবে। তারা প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটিতে সম্মতি জানিয়েছে। পরবর্তী দলটি এসে প্রকল্পটি আরো বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা এবং মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করবে।’

মাছুমা আকতার জানিয়েছেন, হাসপাতাল নির্মাণের জন্য যে জমি নির্বাচন করা হয়েছে, সেটি চীনা টিম প্রাথমিকভাবে গ্রহণ করেছে। অর্থায়নের জন্য চীনের ফিজিবিলিটি টিম আরো কয়েক দফায় আসবে এবং প্রকল্পের বিভিন্ন বিষয় যাচাই-বাছাই করবে।

তিনি বলেন, ‘ফিজিবিলিটি স্টাডির কাজ শেষ হওয়ার পর মূল প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিতে চীনের বিশেষজ্ঞরা আসবেন। এরপর প্রকল্পটি কীভাবে বাস্তবায়ন হবে এবং কী কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে, সে বিষয়ে পরবর্তী কার্যক্রম শুরু হবে।’