প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে কুড়িগ্রামের ৫০৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ ও পদোন্নতি না দেয়ায় এবং অবসরের কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে জানায় শিক্ষা বিভাগ। এতে ব্যাহত হচ্ছে বিদ্যালয়গুলোর নিয়মিত পাঠদানসহ প্রশাসনিক কার্যক্রম।
শিক্ষার্থীদের পাঠদানের সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে ও দায়িত্বহীনতা এড়াতে জরুরি ভিত্তিতে এসব বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন অভিভাবকরা।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, কুড়িগ্রামে ১ হাজার ২৪০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৫০৬টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। এসব বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৩৫টিতে সহকারী শিক্ষককে চলতি দায়িত্ব দিয়ে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালিত হলেও বাকিগুলো পরিচালিত হচ্ছে একেবারেই অভিভাবকহীন। এছাড়া শূন্য রয়েছে ২৬২টি সহকারী শিক্ষকের পদ। প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদের বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য উলিপুর উপজেলায় ৮৮টি, সদর উপজেলায় ৪৯টি, চিলমারী উপজেলায় ২৬টি, নাগেশ্বরী উপজেলায় ৯২টি, ফুলবাড়ী উপজেলায় ৭২টি, ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় ৪৯টি, রাজারহাট উপজেলায় ৪৩টি, রৌমারী উপজেলায় ৬০টি ও চর রাজিবপুর উপজেলায় ২৭টি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের চৈতার খামার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আড়াই শতাধিক। এ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকসহ আটজন শিক্ষক থাকলেও সম্প্রতি প্রধান শিক্ষক বদলি হওয়ায় পদটি শূন্য হয়ে যায়। এর পর থেকে প্রধান শিক্ষক বা চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে বিদ্যালয়টি। শুধু তাই নয়, সদর উপজেলার বাসুর ভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে দেড় বছর ধরে। সেখানে একজন সহকারী শিক্ষককে দায়িত্ব দিয়ে চালানো হচ্ছে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম। একই অবস্থা জেলার ৯ উপজেলার ৫০৬টি বিদ্যালয়ের। এতে করে বিঘ্নিত হচ্ছে সহকারী শিক্ষকদের তদারকি, শ্রেণী কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, নিয়মিত পাঠদানসহ প্রশাসনিক কার্যক্রম।
সদর উপজেলার চৈতার খামার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সুবাস চন্দ্র সেন বলেন, ‘এ বিদ্যালয়ে প্রায় এক মাস হতে চলল প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। কোনো সহকারী শিক্ষককে যে চলতি দায়িত্ব দেয়া হবে সেটাও দেয়া হয়নি। এতে পাঠদানে সহকারী শিক্ষকদের যে দেখাশোনার বিষয় সেটি নেই। যে যার মতো ক্লাস নিচ্ছেন। যে যার মতো স্কুলে আসছেন আবার চলেও যাচ্ছেন। এক কথায় অনেকটা বিশৃঙ্খল অবস্থা। আমরা চাই দ্রুত এই স্কুলে একজন প্রধান শিক্ষক দেয়া হোক বা কোনো সহকারী শিক্ষককে চলতি দায়িত্ব দেয়া হোক।’
একই উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার বাসুর ভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক খন্দকার আরজুমা জানায়, প্রায় দেড় বছর ধরে বাসুর ভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদটি শূন্য রয়েছে। এ অবস্থায় একজন সহকারী শিক্ষককে চলতি দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। কিন্তু কোনো পূর্ণাঙ্গ প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়নি। এতে দায়িত্ব পাওয়া প্রধান শিক্ষক বিভিন্ন সময়ে মিটিংয়ে যান। তখন তার ক্লাস নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। এছাড়া প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যার ওপরও প্রভাব পড়ছে। এজন্য প্রতিটি বিদ্যালয়ে পূর্ণাঙ্গ দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক থাকাটা জরুরি।
চৈতার খামার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক মাসুম মিয়া বলেন, ‘বিদ্যালয়টিতে আমার মেয়ে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে। বিদ্যালয়টিতে প্রধান শিক্ষক না থাকায় বর্তমানে অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে। ক্লাসের ওপর এর প্রভাব পড়ছে। আমরা অভিভাবকরা চাই ঐতিহ্যবাহী এ বিদ্যালয়ে দ্রুত প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে শিক্ষার পরিবেশ ঠিক রাখা হোক।’
শিক্ষকরা জানান, সর্বশেষ ২০১৩ সালে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ দেয়া হয়। কিন্তু এর পর থেকে বিদ্যালয়টিতে সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে প্রধান শিক্ষক পদে কাউকে পদোন্নতিও দেয়া হয়নি। ফলে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম জানান, দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ না হওয়া ও পদোন্নতি না দেয়ায় এবং অবসরের কারণে এমন সংকট সৃষ্টি হয়েছে। তবে শিক্ষকদের পদোন্নতি কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রধান শিক্ষকের পদ পূরণ হলে প্রাথমিক শিক্ষা আরো বেগবান হবে বলে তিনি জানান।










