রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনে উৎপন্ন প্রতিদিনের বর্জ্য রিসাইকেলের জন্য আছে দুটি ল্যান্ডফিল। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নির্ধারিত ল্যান্ডফিলটি মাতুয়াইলে অবস্থিত। সাভারের আমিন বাজারে অবস্থিত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ল্যান্ডফিল। দুটি ল্যান্ডফিলের ধারণক্ষমতা দ্রুত শেষ হচ্ছে।
তবে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এখনো অনেক পিছিয়ে দুই সিটি করপোরেশন। বর্জ্য রিসাইকেলিং বিষয়ে দুই ধরনের পরিকল্পনা সামনে নিয়ে এগোচ্ছে তারা। উত্তর সিটিতে চীনের বিনিয়োগে বর্জ্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ চূড়ান্ত। দক্ষিণ সিটিতে প্রাথমিক পর্যায়ে বায়োগ্যাস করার পরিকল্পনা চলছে। এতে বিনিয়োগ করবে জাপান। দুটি পরিকল্পনা নিয়েই বিশেষজ্ঞরা আপত্তি তুলেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার বর্জ্য রিসাইকেলিংয়ে এখনো টেকসই সমাধান দিতে পারছে না কেউ। এজন্য সিটি করপোরেশনকেই কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এরই মধ্যে বাসাবাড়িতে ব্যবহূত বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প গ্রহণ করেছে ডিএনসিসি। বিদ্যুৎ বিভাগের তত্ত্বাবধানে ডিএনসিসির আমিনবাজার ল্যান্ডফিল এলাকায় এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এ প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। প্রকল্প অনুযায়ী, ডিএনসিসি স্পন্সর কোম্পানিকে ৩০ একর জমি ও দিনে তিন হাজার টন বর্জ্য সরবরাহ করবে। প্রকল্পের অন্যান্য কাজ শেষ পর্যায়ে থাকলেও এখন পর্যন্ত জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। এ অবস্থায় জমি অধিগ্রহণ হলেই প্রকল্পের কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছে উত্তর সিটি।
ডিএনসিসি সূত্র জানিয়েছে, স্পন্সর কোম্পানি নিজ ঝুঁকিতেই প্লান্ট স্থাপন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বহন করবে। বিদ্যুৎ বিভাগের কাছে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিক্রির মাধ্যমে ব্যয় নির্বাহ করবে তারা। সিটি করপোরেশন প্লান্ট স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জমির সংস্থান এবং নিয়মিত বর্জ্য সরবরাহ করবে। প্লান্টটি চালু হলে সেখানে প্রতি সপ্তাহে ২১ হাজার টন বর্জ্য সরবরাহ করতে হবে। এ পরিমাণ বর্জ্য সরবরাহ করতে না পারলে উত্তর সিটি করপোরেশনকে প্রতি টন ঘাটতি বর্জ্যের জন্য ৩ হাজার টাকা হারে স্পন্সর কোম্পানিকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। অন্যদিকে সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও ডিএনসিসির সরবরাহ করা বর্জ্য গ্রহণ না করা হলে প্রতি টন ঘাটতি বর্জ্যের জন্য একইভাবে ডিএনসিসিকেও স্পন্সর কোম্পানি ক্ষতিপূরণ দেবে। এ কারণে বর্জ্য সংগ্রহে বাড়তি তাগিদ থাকবে ডিএনসিসির।
এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করেছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)। জাইকার সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ঢাকার বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস অথবা অর্গানিক সার উৎপাদনের সম্ভাবনা বেশি। মাতুয়াইলে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে জাইকার সমীক্ষায়।
এ প্রসঙ্গে মাতুয়াইল স্যানিটারি ল্যান্ডফিল সম্প্রসারণসহ ভূমি উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক ড. মোহাম্মদ সফিউল্লাহ সিদ্দিক ভুঁইয়া বণিক বার্তাকে বলেন, জাইকার সমীক্ষায় সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কথা বলা হয়েছে। সেখানে বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস, অর্গানিক সার ও বিদ্যুৎ সবকিছুই উৎপাদন করা হবে ধীরে ধীরে। প্রাথমিকভাবে আমরা বায়োগ্যাসের কথা ভাবছি। আবার জৈবসারের বিষয়েও আলাপ-আলোচনা চলছে।
তিনি আরো বলেন, জাইকার সমীক্ষা ও আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, রাজধানীর বর্জ্যগুলোর জ্বালানিযোগ্যতা কম। এর কারণ সংগৃহীত বেশির ভাগ বর্জ্যই মিশ্র বর্জ্য। ভেজা ও শুকনা বর্জ্য একত্রে সংগৃহীত হওয়ার কারণে এগুলো জ্বলানি হিসেবে ব্যবহার করা অনেক ব্যয়সাপেক্ষ। এর চেয়ে বায়োগ্যাস করা অনেক সহজ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখন পর্যন্ত টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ফাহমিদা পারভীন বণিক বার্তাকে বলেন, বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কোনোভাবেই আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে টেকসই সমাধান নয়। এটা অনেক ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। আমাদের বুঝতে হবে বাংলাদেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আর অন্যান্য দেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এক নয়। আমাদের দেশে উৎস থেকে বর্জ্যকে এখনো আলাদা করা যায়নি। আবার বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাসের কথা যদি বলা হয়, সেটা সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি। কিন্তু এত বড় প্লান্ট বানানোর সক্ষমতা বিদ্যমান ল্যান্ডফিলগুলোর আছে কিনা সেটাও বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা ল্যান্ডফিল নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, বর্জ্য রিসাইকেলের ক্ষেত্রে সরকার এখনো টেকসই কোনো সমাধানের পথ বের করতে পারেনি।
একই কথা বলেছেন গ্রিন বার্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাঈদ তাসনিম মাহমুদ। তিনি বলেন, আমরা ওয়েস্ট টু এনার্জি নিয়ে কাজ করছি। আমরা প্লাস্টিক পুড়িয়ে পেট্রল উৎপাদন করছি। বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস বা বিদ্যুৎ যেটাই করা হোক না কেন সেটা কিন্তু এনার্জি। আমাদের সরকার কোন পদ্ধতির এনার্জি উৎপাদনে যাচ্ছে সেটা আমাদের কাছে পরিষ্কার না। তবে আমি এ বিষয়ে একমত, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কোনোভাবেই টেকসই সমাধান নয়। উৎস থেকে বর্জ্য যদি আলাদা করা না যায়, তাহলে বর্জ্য নিয়ে যে পরিকল্পনাই নেয়া হোক না কেন সেটা ব্যর্থ হবেই।
তবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম জানিয়েছেন ঢাকার দুই ল্যান্ডফিলেই বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকেই আমরা যাচ্ছি। উত্তর সিটিতে সব চূড়ান্ত। আমাদের সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের চুক্তি হয়েছে জমি ও বর্জ্য দেয়ার। বিনিময়ে তারা আমাদের বিদ্যুৎ দেবে।
তিনি আরো বলেন, দক্ষিণ সিটিতেও আমরা বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাব। আমরা বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা নিয়ে দেখেছি এটাই সবচেয়ে নিরাপদ সমাধান। এর বাইরে যারাই কথা বলেন তাদের এ সম্পর্কে জানাশোনার অভাব রয়েছে।










