যশোরের সীমান্তবর্তী উপজেলা শার্শা। ৩৩৬ দশমিক ৩৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ উপজেলায় জনসংখ্যা ৩ লাখ ৪১ হাজার ৩২৮। বিপুলসংখ্যক এ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার একমাত্র ভরসাস্থল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ৩১ শয্যা নিয়ে হাসপাতালটি যাত্রা শুরু করলেও এক দশক আগে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। তবে সে অনুপাতে বাড়েনি জনবল। ফলে ৩১ শয্যার জনবল দিয়ে চলছে ৫০ শয্যার এ হাসপাতাল। প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি অপারেশন থিয়েটার স্থাপন করা হলেও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনা বলছেন, হাসপাতালে প্রতিদিন ২০০-৩০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসে। ভর্তি থাকে ৩৫-৪০ জন। হাসপাতালের অবকাঠামো উন্নয়ন হলেও সেবার মান বাড়েনি। চিকিৎসা দিতে না পারায় বেশির ভাগ রোগীকে উন্নত চিকিৎসার কথা বলে জেলা সদর হাসপাতালে রেফার করা হয়।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবায় ১৯৬০ সালে উপজেলার দক্ষিণ বুরুজবাগানে (নাভারণ) স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি নির্মিত হয়। উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন, একটি পৌরসভা ও বেনাপোল স্থলবন্দর এবং আশপাশের উপজেলার অন্তত চার লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার একমাত্র ভরসা এ হাসপাতাল। মেডিকেল অফিসারের ১৬টি পদ থাকলেও কর্মরত রয়েছেন মাত্র চারজন। কনসালট্যান্টের পদ রয়েছে ১০টি। তবে কর্মরত রয়েছেন চারজন। এছাড়া ৩৪ নার্স থাকার কথা থাকলেও রয়েছেন ২৮ জন। স্যাকমো পদে ১৪ জন থাকার কথা থাকলে আছেন সাতজন। তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীর পদ রয়েছে ৯৪টি। সেখানে কর্মরত আছেন ৪৩ জন। চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী থাকার কথা ২২ জন। তবে রয়েছেন নয়জন। পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও ওয়ার্ড বয় আটজন থাকার কথা থাকলেও রয়েছেন তিনজন।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, ৩১ শয্যা হাসপাতালের জনবল দিয়ে ৫০ শয্যা হাসপাতালের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে স্বাস্থ্যকর্মী ও নার্সদের। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৯৯টি পদে জনবল কাঠামো থাকার কথা থাকলেও ১০০ জন দিয়ে চলছে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম। জনবল ঘাটতি রয়েছে ৯৯ জন। জনবল সংকট ছাড়াও সার্জারি যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতা, অপরিচ্ছন্নতা, ওয়ার্ডে পানি ও বিদ্যুতের সমস্যা।

অসুস্থ শাশুড়িকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন ফারিবা আক্তার। তিনি বলেন, ‘সকাল ৮টায় এসেছি। বেলা সাড়ে ১১টা বাজলেও ডাক্তারের দেখা পাইনি। লাইনে দাঁড়িয়ে আছি, আরো ৩০ জনের পর সিরিয়াল পাব।’

রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, মানসম্মত খাবার ও পর্যাপ্ত ওষুধ নেই। সব কিছুই সিন্ডিকেটের দখলে। সব ধরনের সেবার ব্যবস্থা থাকলেও ডাক্তার ও ল্যাব টেকনিশিয়ানরা প্রাইভেট ক্লিনিকে পাঠিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পরামর্শ দেন। দুই-একটি ছাড়া সব ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। হাসপাতালের পরিবেশ একেবারেই অস্বাস্থ্যকর। অধিকাংশ বেড ভাঙা ও জোড়াতালি দেয়া। রাতে ফ্যান ও লাইট না থাকায় হাসপাতালে ভুতুড়ে পরিবেশ বিরাজ করে। হাসপাতালের চারটি কেবিন সবসময় সিন্ডিকেটের দখলে থাকে। ম্যানেজ করতে পারলেই কেবল কেবিন পাওয়া যায়। ভর্তি রোগীদের জন্য প্রতিদিন সরকারি খরচে খাবার সরবরাহ করা হলেও তা মানসম্মত নয়। তালিকাভুক্ত খাবার দেয়া হয় না, যা দেয়া হয় সেটা মুখে নেয়ার মতো নয়। গজ, ব্যান্ডেজ, তুলা—এমন মৌলিক জিনিসও রোগীদের বাইরে থেকে কিনতে হয়। এতে ভোগান্তিতে পড়ছেন দূর-দূরান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ রোগীরা। ভোগান্তি ও নিম্নমানের সেবার কারণে হাসপাতালটির প্রতি মানুষের আস্থা কমছে।

রোগীদের নিম্নমানের খাদ্য সরবরাহের বিষয়টি স্বীকার করেছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌফিক পারভেজ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হাসপাতালে একই ঠিকাদার দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য সরবরাহ করছেন। তাকে বারবার নিম্নমানের খাদ্য না দিয়ে ভালো খাদ্য দেয়ার তাগিদ দেয়া হলেও গুরুত্ব দিচ্ছেন না। ঠিকাদারের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে।’

তবে হাসপাতালে পরীক্ষা না করিয়ে রোগীদের বাইরে থেকে পরীক্ষা করতে পাঠানোর বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন। ডা. তৌফিক পারভেজ বলেন, ‘শার্শা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জনবল সংকট রয়েছে। ৩১ শয্যার জনবল দিয়ে চলছে ৫০ শয্যা হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা। এ জনবল দিয়ে স্বাস্থ্যসেবা দিতে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। কোনো ডাক্তার সেবা নিতে আসা রোগীদের অন্যত্র পাঠিয়ে দিচ্ছেন—এমন অভিযোগ আমার কাছে কেউ দেয়নি। তবে এ ধরনের অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

সার্বিক বিষয়ে যশোরের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. নাজমুস সাদিক রাসেল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জেলার সব স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোয় জনবল সংকট রয়েছে। আমরা এটি পূরণের জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছি।’