রাজধানীর অদূরে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে চলছে বাংলাদেশের মাটিতে জাপানের প্রথম বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ। জাপান বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে ২০২০ সালের আগস্টে শুরু হওয়া নির্মাণযজ্ঞ চলতি বছরের শেষে সমাপ্ত হওয়ার কথা হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছরের মাঝামাঝি সময় উৎপাদনে আসবে অর্থনৈতিক অঞ্চলটি। এতে বিনিয়োগের বিষয়ে জাপান ছাড়াও অন্যান্য দেশের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে এরই মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
জানা গিয়েছে, জাপানের সুমিতোমো করপোরেশন এক হাজার একর জমির ওপর বাংলাদেশ জাপান বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণ করছে। এক্ষেত্রে সহযোগিতা করছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। ২০১৩ সালে এ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক আলোচনা শুরু হয়। পরের বছর জাপান সফর করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সে সফরে বিষয়টি চূড়ান্ত হয়। ২০১৯ সালে বেজা ও জাপানের সুমিতোমো করপোরেশনের মধ্যে অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের চুক্তি স্বাক্ষর হয়। ভূমি উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করছে সুমিতোমো করপোরেশন। বেজার তত্ত্বাবধানে জমি বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার ও জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) যৌথভাবে প্রকল্পে অর্থায়ন করছে।
সরেজমিন দেখা যায়, বিশাল এলাকাজুড়ে অবকাঠামো উন্নয়নের কর্মযজ্ঞ চলছে। মূলত প্রকল্প এলাকায় রাস্তাঘাট নির্মাণই এখন প্রধান কাজ। পাশাপাশি বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ অন্যান্য পরিষেবার উন্নয়ন ডেভেলপ করা হবে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কোম্পানি এসে প্লট কিনে অফিস নির্মাণ করে উৎপাদনে যাবে। ঢাকার অদূরে হওয়ায় কর্মচারীদের জন্য কোনো আবাসিক প্রকল্প করা হবে না বলেও জানিয়েছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা।
এখানে অটোমোবাইল অ্যাসেম্বলি, মোটরসাইকেল, সেলফোন হ্যান্ডসেটসহ বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিক পণ্য ও যন্ত্রপাতি, এগ্রো ফুড, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, গার্মেন্টস, ফার্মাসিউটিক্যালস ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হবে। জানা গিয়েছে, এখানে বিনিয়োগ করতে জাপানের টয়োটা, মিতসুবিশি, সুমিতোমো, তাওয়াকি, সুজিত লিমিটেডের মতো অন্তত ৪০টি ও অন্যান্য দেশের ১০টি কোম্পানি এরই মধ্যে আগ্রহ দেখিয়েছে। সিঙ্গার একটি প্লট কিনেছে বলেও জানা গিয়েছে।
জাপানিজ অর্থনৈতিক অঞ্চলের সর্বশেষ অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে জাপান-বাংলাদেশ এসইজেড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তারো কাওয়াচি বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা দুটো ফেজে কাজ করছি। প্রথম ফেজে এখন পর্যন্ত ২০০ একর জমিতে আমরা যাবতীয় অবকাঠামো নির্মাণ করব। এরপর ক্রমান্বয়ে বাকি ভূমিও ব্যবহার উপযোগী করে তোলা হবে।
তিনি বলেন, আমাদের প্রথম টার্গেট হলো বাংলাদেশেই জাপানসহ অন্যান্য দেশের বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কারখানা গড়ে তোলা। এশিয়াসহ বিশ্বের অনেক দেশেই সুমিতোমো করপোরেশনের নিজস্ব অফিস আছে। সে ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও আমরা অফিস করার পরিকল্পনা নিই। আশা করছি, চলতি বছরের শেষ দিকে আমাদের যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হবে।
জাপানি পণ্যের বড় গ্রাহক রয়েছে বাংলাদেশে। মূলত এ কারণেই বাংলাদেশকে বাছাই করা হয়েছে উল্লেখ করে এমডি বলেন, আমাদের টার্গেট হলো বাংলাদেশের কাস্টমারদের আরো সহজে পণ্য দেয়া। জাপানের মান নিশ্চিত করেই এখানে পণ্য উৎপাদন হবে। ফলে পণ্য আমদানির খরচ কমে যাবে। এতে কাস্টমাররা আরো কম খরচে আমাদের পণ্য কিনতে পারবে। এছাড়া বাংলাদেশে সহজে শ্রমিক পাওয়া যায়। এটাও একটা বড় কারণ।
জাপান-বাংলাদেশ এসইজেড থেকে মোটরসাইকেল উৎপাদন বিষয়টি মোটামুটি নিশ্চিত হলেও গাড়ি উৎপাদনের বিষয়টি এখনো নিশ্চিত করেনি কর্তৃপক্ষ। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে বিনিয়োগ পাওয়া এখন চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে। তবে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, সংকট কেটে গেলে এখানে বিনিয়োগকারীরা আসবেন।
জাপান-বাংলাদেশ স্পেশাল ইকোনমিক জোনের লোগোতে রাখা হয়েছে দুই দেশের সম্পর্কের বিষয়টি। লাল বৃত্তের চারপাশে সাদা এবং তার পাশে সবুজ গোলাকার। এটা দিয়ে বোঝানো হচ্ছে বাংলাদেশের ভেতরই এক টুকরো জাপান। অর্থাৎ জাপানের কোয়ালিটি বাংলাদেশেই নিশ্চিত হচ্ছে। জাপান-বাংলাদেশ এসইজেডের এমডি বলেন, বাংলাদেশে অনেকগুলো ইকোনমিক জোন রয়েছে। তবে সব ইকোনমিক জোন ওই দেশের নামে হয়। একমাত্র আমাদের এটিই দুই দেশের নামে নামকরণ করা হয়েছে। এটা মূলত বাংলাদেশের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরকে স্মরণীয় করে রাখার একটি উদ্যোগ।
বেজার ব্যবস্থাপক (এমআইএস ও গবেষণা) ড. শেখ জোবায়েদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদের সঙ্গে চুক্তি হয়, জাপানিজ ইকোনমিক জোন ছাড়া আর কোথাও আমরা বাংলাদেশ নামটি রাখব না। আমরা মূলত ভূমি অধিগ্রহণের কাজ করছি। বাকি কাজ ও রক্ষণাবেক্ষণ করবে সুমিতোমো করপোরেশন। আশা করছি, শিগগির বাংলাদেশ জাপান বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল উৎপাদনে আসতে পারবে।










