এক সময় দেশে গ্যাসকে বিবেচনা করা হতো সবচেয়ে সম্ভাবনাময় প্রাথমিক জ্বালানি হিসেবে। যদিও এর চাহিদা পূরণে বাংলাদেশ এখন আমদানিনির্ভর। দেশের গ্যাস খাত নিয়ে তিন পর্বের ধারাবাহিক পর্ব-২
সুনামগঞ্জের ছাতকে টেংরাটিলা গ্যাস ক্ষেত্রে ২০০৫ সালে বিস্ফোরণ ঘটে। পর পর দুই দফা বিস্ফোরণে গ্যাস ক্ষেত্রটির ব্যাপক ক্ষতি হয়। কানাডীয় কোম্পানি নাইকো রিসোর্সেস লিমিটেডের বিরুদ্ধে দেশে ও বিদেশে মামলাও হয়। জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ওই দুর্ঘটনায় দেশে গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশী তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোর কাজের সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ে; নানা জটিলতা তৈরি হয় গ্যাস অনুসন্ধান ও বিনিয়োগে। ফলে গ্যাসের ব্যবহার বাড়লেও অনুসন্ধান ও বিনিয়োগে বড় কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায়নি। ২০০১ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দেশে গ্যাস ক্ষেত্র পাওয়া যায় মাত্র একটি।
জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তহীনতায় ২০০১ থেকে ২০১০ সময়কালে বিদেশী কোম্পানিগুলোর মধ্যে দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস অনুসন্ধানবিমুখতা তৈরি হয়। একই সঙ্গে সেই সময় জ্বালানি খাতের উন্নয়নে রোডম্যাপ ও সুপারিশ থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এছাড়া বিভিন্ন সময় ক্ষমতার পালাবদলও এ খাতের সিদ্ধান্ত গ্রহণে পদে পদে বাধা তৈরি করে।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাত নিয়ে ২০০৯ সালে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত দেশের গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির বড় পরিবর্তন দেখা যায়। ২০০১ সালে গ্যাসের বার্ষিক সরবরাহ ছিল প্রায় ৩০০ বিলিয়ন কিউবিক ফুট (বিসিএফ)। পর্যায়ক্রমে তা বেড়ে ২০০৮ সালে উন্নীত হয় ৫৯৬ বিসিএফে। ২০০১ সালে গ্যাস খাতে জাতীয় গ্রিডে পেট্রোবাংলার একক সরবরাহ ছিল ২৯৩ বিসিএফ এবং ২০০৮ সালে তা ৩২৫ বিসিএফে উন্নীত হয়। এ সময় বিদেশী তেল-গ্যাস কোম্পানির জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ ৭৭ বিসিএফ থেকে ২৭১ বিসিএফে উঠে যায়। গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর (আইওসি) কাছে কর পরিশোধের পরিমাণও সেই সময় বেড়ে যায় বলে এডিবির ওই মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উঠে আসে।
দেশের গ্যাস খাতের উন্নয়নে ‘গ্যাস সেক্টর রিফর্ম রোডম্যাপ’ (জিএসআরআর) তৈরি করা হয়। ওই রোডম্যাপে ২০০৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত একটি পরিকল্পনা ছিল। সেখানে দেশের গ্যাস খাতের অবকাঠামো, বিশেষত গ্যাস অনুসন্ধান, বিদেশী বিনিয়োগ, গ্যাস খাতে বেসরকারি অর্থায়ন, পাইপলাইন নির্মাণ ও কোম্পানি গঠনের নানা উদ্যোগ ছিল। কিন্তু এসব পরিকল্পনার বেশির ভাগই ওই সময় বাস্তবায়ন করা যায়নি।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ছিলেন একেএম মোশাররফ হোসেন ও আনোয়ারুল কবির তালুকদার। দুজনই ২০২০ সালে কভিডে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ওই সময় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্যাসের অনুসন্ধান ও সরবরাহ বৃদ্ধির জন্য সেই সময় (২০০১-২০০৬) জ্বালানি খাতের রোডম্যাপ করা হয়েছিল। গ্যাস অনুসন্ধানে সরকারের নীতি ছিল স্থানীয় কোম্পানি বাপেক্সকে দিয়ে কাজ করানো। রিগ কেনার উদ্যোগ সেই সময় নেয়া হয়েছিল। স্থানীয় জ্বালানি খাতের উন্নয়নের অংশ হিসেবে কয়লা উত্তোলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল ভারতীয় টাটা গ্রুপকে। যদিও পরে সেই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয়নি।’
দেশে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে টেংরাটিলা দুর্ঘটনাও প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করেছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেটি তো ছিলই। এ ঘটনার কারণে ওই সময় বিদেশী কোম্পানিগুলোর দেশে কাজ করার নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়।’
দেশে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য পিএসসির (প্রডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট) আওতায় ২০০৮ সালে অফশোরের দুটি ব্লকে দরপত্র আহ্বান করে পেট্রোবাংলা। বঙ্গোপসাগরের ১০ ও ১১ নম্বর ব্লকে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বহুজাতিক সংস্থা কনোকো-ফিলিপসের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের চুক্তি হয়। নতুন এ চুক্তি অনুসারে ওই দুটি ব্লক থেকে আহরিত তেল ও গ্যাসের ৮০ শতাংশ মালিকানা পাবে কনোকো-ফিলিপস। চুক্তিতে আরো বলা হয়, সরকারি সংস্থা পেট্রোবাংলা বা বাংলাদেশের কোনো বেসরকারি সংস্থা তা কিনতে রাজি না হলে কনোকো-ফিলিপস সেটা বিদেশে রফতানি করতে পারবে। যদিও এতে বড় কোনো গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার হয়নি।
দেশের গ্যাস রফতানি হবে—এমন বিষয় সামনে এলে দেশজুড়ে প্রতিবাদ শুরু হয়। নামমাত্র মূল্যে গ্যাস কিনে বিদেশী কোম্পানিগুলো বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়ে যাবে—এমন আশঙ্কা অনেকের মধ্যে ছিল। এমনকি এসব কাজের পেছনে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সহযোগিতা ছিল বলে সেই সময় অভিযোগ তোলে তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি।
অর্থনীতিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশের তেল-গ্যাস বিদেশী কোম্পানি দিয়ে তুলতে হবে—এ ধারণা ও প্রবণতা ছিল সবচেয়ে বেশি। স্থানীয় গ্যাস উত্তোলনে পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ কখনই দেখা যায়নি।’ তিনি অভিযোগ করেন, ‘সেই সময় জ্বালানি মন্ত্রণালয় (বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়) বিদেশীদের এজেন্সি হিসেবে কাজ করেছে। তাদের সুযোগ-সুবিধা কীভাবে দেয়া যায়, সেই বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছিল সবচেয়ে বেশি। বিদেশী কোম্পানিগুলো এ দেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও আবিষ্কারের নামে মুনাফা করার চেষ্টা করেছে বেশি। মুনাফা বাড়ানোর জন্য তারা খরচ কমিয়ে তৃতীয় পক্ষ দিয়ে কাজ করিয়েছে। ২০০৫ সালে টেংরাটিলার মতো গ্যাস ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটেছে। গ্যাস ক্ষেত্রে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ নিয়ে জোরালো তৎপরতা দেখা যায়নি। যে কারণে এত বড় দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ আজও আমরা পাইনি।’
২০০১ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে গ্যাসের অনুসন্ধানে তেমন কোনো চেষ্টা হয়নি। গত এক দশকের মধ্যে ২০০৪ সালে বাঙ্গুরা গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার হয়। স্থানীয় কোম্পানি বাপেক্স এ গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার করলেও বর্তমানে উন্নয়ন করে এটি পরিচালনা করছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক কোম্পানি তাল্লো। এ গ্যাস ক্ষেত্রে প্রায় এক ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুদ পাওয়া যায়। বর্তমানে সেটি উৎপাদনে রয়েছে। তবে গ্যাসের সরবরাহে বড় অগ্রগতির পেছনে মূলত কাজ করেছে শেভরন পরিচালিত বিবিয়ানা গ্যাস ক্ষেত্র। এ গ্যাস ক্ষেত্র উৎপাদনে এলে গ্যাসের সরবরাহ বেড়ে যায়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জ্বালানিবিষয়ক বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ম. তামিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিবিয়ানা উৎপাদনে আসার আগে পেট্রোবাংলার গ্যাস সরবরাহ ছিল অ্যাভারেজ। ২০০৭ সালের মার্চে বিবিয়ানা উৎপাদনে আসে। গ্যাসের সরবরাহ বেড়ে যায়। ওই সময় বিবিয়ানা থেকে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ শুরু হলেও কয়েক বছরের মধ্যে তা ৭০০ মিলিয়নে উন্নীত হয়। এর মধ্যে দেশের স্থলভাগে ও সমুদ্রে বিদেশী কোম্পানি দ্বারা গ্যাস অনুসন্ধানে নিষেধাজ্ঞা দেন হাইকোর্ট। ২০০৮ সালে নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সময়স্বল্পতার কারণে সেটি আর করা যায়নি। গ্যাস অনুসন্ধানে বিএনপি সরকারের তৎপরতা ছিল ন্যূনতম। তারা রিজার্ভ প্রাক্কলন এবং গ্যাস ব্যবহারের জন্য দুটি জাতীয় কমিটি গঠন করেছিল সেই সময়। সেই কমিটির সুপারিশ কখনই বাস্তবায়ন হয়নি।’
প্রসঙ্গত, ২০০৩ সালে নাইকো-বাপেক্স যৌথ উদ্যোগে একটি চুক্তির মাধ্যমে ছাতকের টেংরাটিলা গ্যাস ক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলনের দায়িত্ব পায়। কূপ খনন শুরু হলে গ্যাস ক্ষেত্রটিতে মারাত্মক বিস্ফোরণ হয়। এতে গ্যাস ক্ষেত্র ও আশপাশের এলাকায় পরিবেশ ও জনজীবনের ব্যাপক ক্ষতি করে। প্রথম বিস্ফোরণ ঘটে ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি। দ্বিতীয় বিস্ফোরণ ঘটে ওই বছরের ২৪ জুন। এ ঘটনায় নাইকোকে দায়ী করে ক্ষতিপূরণ দাবি করে সরকার। বিস্ফোরণের ঘটনায় দায়ী নয় উল্লেখ করে ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউটে’ (ইকসিড) সালিশি মোকদ্দমা করে নাইকো। ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের দিয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে একটি সমীক্ষা চালায় বাপেক্স। এর পরিপ্রেক্ষিতে নাইকোর কাছে বাপেক্স ১১ কোটি ৮০ লাখ ডলার এবং বাংলাদেশ সরকার ৮৯ কোটি ৬০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ চেয়ে ইকসিডে নালিশ জানায়। আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালটি নাইকোকে অভিযুক্ত করে ২০২০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি এ মামলার রায় দেন। এতে বাংলাদেশ ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৮ হাজার কোটি টাকা পাওয়ার কথা ছিল। যদিও এ ক্ষতিপূরণ এখনো পাওয়া যায়নি।










