দেশের খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে বগুড়া। ধান, আলু, মরিচ ও সবজি উৎপাদনে বেশ গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপ্রধান এ জেলা। এসব পণ্যের পাশাপাশি অঞ্চলটিতে সোনালি আঁশ খ্যাত পাটও চাষ হয়। তবে প্রত্যাশিত দাম না পাওয়া, বীজ সংকট, শ্রমিকের বাড়তি মজুরি পাট চাষে খরচ বাড়িয়েছে। এ কারণে আগ্রহ হারাচ্ছেন কৃষক। প্রণোদনা দিয়েও আবাদ বাড়ানো যাচ্ছে না। চলতি মৌসুমে ৮ হাজার ৯৬০ হেক্টর জমিতে চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে কৃষি বিভাগ। তবে চাষ হয়েছে ৭ হাজার ৭২০ হেক্টরে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার ১৬ শতাংশ আবাদ কমেছে। গত বছরও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আবাদ কম হয়েছিল।

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি মৌসুমে পাট আবাদের জন্য ১ হাজার ২০০ কৃষককে প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। মার্চের মধ্যে ৫ লাখ ৩১ হাজার টাকার সার ও বীজ বিতরণ করা হয়েছে। একেকজন কৃষককে এক কে‌জি বীজ ও ১০ কেজি করে সার দেয়া হয়েছে। তবে চলতি বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় পাটের ফলন ভালো হয়েছে। শেষ পর্যন্ত আবহাওয়া ঠিক থাকলে প্রায় সোয়া ১ লাখ বেল পাট উৎপাদন হবে। বাজারে পাটের দামও বেশ ভালো।

চাষীরা বলছেন, জেলার ১২টি উপজেলার মধ্যে সারিয়াকান্দি, ধুনট, শিবগঞ্জ, শেরপুর, শাজাহানপুর ও সোনাতলায় বেশি পাট চাষ হয়। এছাড়া আদমদিঘী, দুপচাঁচিয়া, গাবতলী, নন্দীগ্রাম ও শাজহানপুরেও পাট হয়। তবে কম। উপজেলা পর্যায়ে কিছু চাষী আগাম জাতের পাটও চাষ করেন। বর্ষাকাল শুরু হওয়ায় জেলার বিভিন্ন উপজেলার চাষীরা পাট কেটে জাগ দিতে শুরু করেছেন। কোথাও কোথাও আবার নতুন পাট বিক্রিও করা হচ্ছে। প্রতি বছর জুলাই থেকে আগস্টে বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার যমুনা নদীর পানি বাড়ে। এতে নদী এলাকার ফসলের বেশ ক্ষতি হয়। এজন্য বন্যার আগেই স্থানীয় চাষীরা পাট কেটে জাগ দিতে শুরু করেছেন।

সারিয়াকান্দি উপজেলার পাটচাষী আল-আমিন জানান, পাটগাছগুলো ১০ ফুট থেকে শুরু করে কোথাও ১৩ ফুট লম্বা হয়েছে। পাট পরিপক্ব হওয়ায় কাটা শুরু হয়েছে। সারিয়াকান্দি উপজেলায় কিছুটা আগে পাট কাটা হয়। এখানে বৈশাখের আগেই পাট চাষ করা হয়। কারণ হলো বন্যায় পাট যেন নষ্ট না হয়। মূলত আষাঢ়ের শেষে ও শ্রাবণ মাসে পাট বাজারে বিক্রি হয়। কিন্তু এবার কিছুটা আগে থেকেই নতুন পাট বিক্রি শুরু হয়েছে। চলতি মৌসুমে শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে। একজন শ্রমিককে প্রতিদিন ৬০০-৮০০ টাকা দিতে হয়। আগে পাটের আঁশ ছাড়াতে প্রতি কৃষি শ্রমিককে দেয়া হতো ৫০০ টাকা। পরিবহন খরচ ছিল ২৫০ টাকা। এখন তা বেড়ে ৩০০-৩৫০ টাকা হয়েছে। সময়মতো বর্ষার পানিতে জাগ দিতে না পারলে অন্যের পুকুরে জাগ দিতে হয়। এজন্য পুকুর মালিককেও কিছু ভাড়া দিতে হয়। এসব কারণে পাট চাষে খরচ বেড়েছে।

পাট ব্যবসায়ী আব্দুল করিম জানান, বগুড়ার বিভিন্ন জুট মিলে পাট সরবরাহ করেন তিনি। কয়েকদিন আগে অল্প কিছু পাট কিনেছেন। এখনো সেভাবে বাজারে পাট ওঠেনি। আরো কয়েকদিন পর হাটে পাট ওঠা শুরু হবে। গত বছর প্রতি মণ পাট ৩ হাজার ৪০০ টাকা বিক্রি হয়েছে। এ বছর ৩ হাজার ৫০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে বগুড়ায় পাট চাষ হয় ৭ হাজার ৬০৯ হেক্টর জমিতে। লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় আঁট হাজার। চলতি বছর ৮ হাজার ৯৬০ হেক্টর জমিতে চাষের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও আবাদ হয়েছে ৭ হাজার ৭২০ হেক্টরে। মূলত সারিয়াকান্দি উপজেলায় পাট চাষ বেশি হয়। তবে সেখানেও আবাদের পরিমাণ কমছে। চলতি মৌসুমে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমিতে। তবে আবাদ হয়েছে ৩ হাজার ১২০ হেক্টরে। গত বছর উপজেলায় ৩ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছিল। প্রতি হেক্টরে উৎপাদন হয় ২ দশমিক ৮ টন। গত মৌসুমে কৃষক ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার ৪০০ টাকা মণ দরে পাট বিক্রি করেন। এ বছর নতুন পাট ৩ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

সার্বিক বিষয়ে বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ফরিদুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চলতি বছর পাট আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ হাজার ৯৬০ হেক্টর জমি। সেখানে অর্জিত হয়েছে ৭ হাজার ৭২০ হেক্টর জমিতে। আবাদ কম হলেও ফলন ধরা হয়েছে প্রায় সোয়া লাখ বেল পাট।’