বৈশাখ উপলক্ষে নড়াইলের কুমারেরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন। কাকডাকা ভোর থেকে গভীর রাত অবধি ঘুরছে কুমারের চাকা। তারা এখন ব্যস্ততায় দিন কাটাচ্ছেন হরেক রকম মাটির জিনিস তৈরির কাজে। এসব কাজে পুরুষের পাশাপাশি হাত লাগাচ্ছেন পরিবারের নারী, শিশু ও বৃদ্ধরাও। কাকডাকা ভোরে শুরু হয়ে কাজ চলছে গভীর রাত পর্যন্ত। একসময় স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে আশপাশের জেলা গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, বাগেরহাট ও খুলনার হাটবাজারেও বিক্রি হতো এখানকার তৈরি মাটির জিনিসপত্র। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চাহিদা কমায় এখন এ কাজে তেমন লাভ পান না কুমারেরা। তবু পেটের দায়ে এবং বাপঠাকুরদার দীর্ঘদিনের পেশাকে টিকিয়ে রাখতে এখনো এ কাজকে আঁকড়ে ধরে আছেন অনেকে।

কুমারেরা জানান, নড়াইলের কুমারদের সুনিপুণ হাতে তৈরি মাটির জিনিসপত্রের সারা বছর ব্যাপক চাহিদা ছিল। বর্তমানে সারা বছর খুব বেশি চাহিদা না থাকলেও চৈত্র-বৈশাখ মাস এলেই মাটির তৈরি এসব জিনিসের চাহিদা বেড়ে যায়। লোহাগড়া উপজেলার মধুমতী পাড়ের কুমারডাঙ্গা গ্রামের সুভাষ পাল জানান, সারা বছর তাদের তেমন কাজ থাকে না। বৈশাখ এলেই তাদের কাজের চাপ অনেক বেড়ে যায়। কারণ চাহিদা বাড়ে। প্রতি বছর এ মৌসুমে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তাদের ব্যস্ত থাকতে হয়। গৌতম পাল জানান, চৈত্র-বৈশাখ মাসের আগেই বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা এসে মাটির তৈরি জিনিসপত্রের অর্ডার দিয়ে যান। বৈশাখের শুরুতেই নতুন তৈরি করা মাটির খেলনা পুতুল, হাঁড়ি, কড়াই, পাতিল, ব্যাংক, তৈরি হাতি, ঘোড়াসহ বিভিন্ন ধরনের পশু-পাখিসহ অন্তত ২০ ধরনের খেলনা ও গৃহস্থালি কাজে ব্যবহূত জিনিসপত্র নগদ টাকা দিয়ে কিনে নিয়ে যান। আরেক কুমার আনন্দ পাল জানান, প্রতি বছর চৈত্র-বৈশাখ মাসে নড়াইলের আশপাশের পাঁচ-ছয়টি জেলার ব্যবসায়ীরা নড়াইলের পালদের তৈরি জিনিসপত্র কিনে নিজ নিজ জেলায় নিয়ে বিভিন্ন হাটেবাজারে ও মেলায় বিক্রি করেন।

খুলনা থেকে আসা ব্যবসায়ী জানান, প্রতি বছর তিনি নড়াইল থেকে মাটির তৈরি খেলনাসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র নিয়ে খুলনার বিভিন্ন বৈশাখী মেলায় বিক্রি করেন। নড়াইলের স্থানীয় খেলনা ব্যাবসায়ী জানান, প্রতি বছর এ মৌসুমে বিভিন্ন গ্রামে ঘোড়দৌড়সহ বৈশাখী মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এ জেলায় চৈত্র-বৈশাখ মাসে প্রতিদিনই বিভিন্ন গ্রামে মেলা লেগে থাকে। প্রতিটি মেলায় তিনি মাটির তৈরি জিনিসপত্র বিক্রয় করেন। লাভও ভালো হয়।

জানা গেছে, একসময়ের রান্নাঘরের হাঁড়ি, কড়াই, বদনা, ঢাকনি, ফুলের টব, কলস, ঠিলা, পিঠার ছাঁচ, মুড়ি ভাজার সামগ্রী তৈরি করে গৃহস্থালি চাহিদা মেটানো কুমারদের অধিকাংশেরই চাকা (মাটির সামগ্রী তৈরি করার যন্ত্র) বন্ধ  হয়ে গেছে। তবু নড়াইলের বিভিন্ন গ্রামে এখনো দুই শতাধিক পরিবারে চাকা সচল রয়েছে। এর মধ্যে লোহাগড়া উপজেলার মধুমতী পাড়ের কুমারডাঙ্গা গ্রামেই রয়েছে ৩২টি পরিবার। এসব পরিবারের সদস্যরা এখনো মাটির তৈরি জিনিসপত্র নিজ হাতে বানিয়ে বাজারে বিক্রয় করে সংসার চালান।

পাল পরিবারের সদস্য বিপ্লব জানান, প্লাস্টিকের তৈরি আধুনিক জিনিসপত্রের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কদর কমেছে মাটির তৈরি জিনিসপত্রের। তাই দিন দিন বেকার হয়ে পড়েছে মাটির কারিগররা। এরই মধ্যে জেলার বিভিন্ন অঞ্চলের কুমারদের অনেকেই পেশা পরিবর্তন করে ফেলেছে। এখন তাদের কেউ ভ্যান রিকশা চালান। কেউ দিন মজুরের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।

সরেজমিনে কুমারডাঙ্গা গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, বাড়ি বাড়ি অবিরাম ঘুরছে কুমারের চাকা। কেউ মাটিতে পানি মিশিয়ে কাদা নরম করছেন, কেউ মাটির তৈরি জিনিস রোদে শুকানোর কাজ করছেন। কেউ ব্যস্ত এসব পোড়ানোর কাজে। আবার অনেকের মনোযোগ পোড়ানো জিনিসপত্রে রং-তুলির কাজে।

কুমারডাঙ্গা গ্রামের সুভাশীষ পপি বলেন, এখন মৌসুম চলছে। বলতে গেলে সারা বছরের কাজ এ সময়ে করতে হয়। তিনি জানান, চাপ বেশি থাকায় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত স্বামীর কাজে সহযোগিতা করেন। পঞ্চানন পাল অভিযোগ করে বলেন, এ পেশায় এখন আর লাভ নেই। তবু  বাপদাদার পেশাকে কোনো রকমের আঁকড়ে ধরে আছি মাত্র। বিনয় পাল জানান, নতুন কেউ এ কাজ শিখছে না, তাই আগামীতে কুমোরের চাকা ঘোরানোর মতো কেউ থাকবে না। জেলায় কুমার পরিবার ও তাদের সংখ্যার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে  লিপিবদ্ধ নেই। সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে কোনো পৃষ্ঠপোষকতাও নেই এ শিল্পে। এমনটি চলতে থাকলে অচিরেই সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে মৃৎ শিল্পের। এজন্য এখনই পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন জেলার সচেতন মহল।