যশোরের সাত নদ-নদীতে অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করা হচ্ছে নয়টি সেতু। নিচু করে নির্মাণ করায় বর্ষায় এসব সেতুর নিচ দিয়ে নৌযান চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। গত শনিবার নির্মাণাধীন সেতুগুলো পরিদর্শন করে এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন বিআইডব্লিউটিএ খুলনার নৌ-সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগের যুগ্ম পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ আশ্রাফ উদ্দীন।
তিনি জানিয়েছেন, বিআইডব্লিউটিএর ছাড়পত্র না নিয়ে সরকারের দুটি প্রতিষ্ঠান সেতুগুলো নির্মাণ করছে। এসব কম উচ্চতার সেতু নির্মাণ করেছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।
এর আগে অপরিকল্পিত এসব সেতু নির্মাণ বন্ধ করে নদী বাঁচানোর দাবি জানিয়েছিল যশোরের পাঁচটি পরিবেশবাদী সংগঠন। তারা প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে স্মারকলিপিও দিয়েছিল। তবে এলজিইডি যশোর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিআইডব্লিউটিএর ছাড়পত্র নিয়ে সেতু করা হয়নি এটা ঠিক। তবে সেতুর উচ্চতা মেনেই নির্মাণ করা হচ্ছে।’
সওজ ও এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, যশোরের মণিরামপুর উপজেলার টেকারঘাট এলাকায় টেকা নদীর ওপর পুরনো সেতু ভেঙে নতুন সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। পানি থেকে এ সেতুর উচ্চতা অনেক কম। একই উপজেলার হরিদাসকাটি ইউনিয়নে মুক্তেশ্বরী নদীর দেড় কিলোমিটারের মধ্যে কম উচ্চতার দুটি নতুন সেতু নির্মাণকাজ চলছে। এর মধ্যে সুবলকাঠি সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। এখন চলছে সংযোগ সেতু নির্মাণকাজ। হাজরাইল সেতুর নির্মাণও চলমান। দুটি সেতু নির্মাণ করতে মুক্তেশ্বরী নদীতে আড়াআড়ি মাটির বাঁধ দেয়া হয়েছে। একই উপজেলার নেহালপুর এলাকায় শ্রী নদীর ওপর সেতু নির্মাণকাজ সম্প্রতি শেষ হয়েছে। মণিরামপুর ও চিনাটোলা এলাকায় হরিহর নদের ওপর পুরনো সেতু ভেঙে কম উচ্চতার দুটি সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে।
যশোর সদর উপজেলার দাইতলা এবং বাঘারপাড়া উপজেলার ছাতিয়ানতলায় ভৈরব নদের ওপর নির্মিত পুরনো দুটি সেতু ভেঙে সেখানে কম উচ্চতার দুটি সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। বাঘারপাড়া উপজেলার খাজুরা ও সীমাখালীতে চিত্রা নদীর ওপর কম উচ্চতার দুটি সেতুর নির্মাণকাজ চলছে। এছাড়া শার্শা উপজেলার বেতনা নদীর এক কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে কাজীরবেড়-ইসলামপুর মোড়ে, শিয়ালকোনা গাতিপাড়া ও নিশ্চিন্তপুর গ্রামের সংযোগস্থলে কম উচ্চতার দুটি সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে।
বিআইডব্লিউটিএর ছাড়পত্র না নিয়ে এভাবে সেতু নির্মাণ ‘নদী হত্যা’র শামিল বলে মন্তব্য করেন ভৈরব নদ সংস্কার আন্দোলনের উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নদী প্রবহমান করতে সংস্কার করা হচ্ছে। কিন্তু অপরিকল্পিত এসব সেতু নদী প্রবহমান করার ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা। আমরা অপরিকল্পিত এসব সেতু নির্মাণের বিরোধিতা করছি এবং এর বিরুদ্ধে দ্রুত আন্দোলন শুরু করব। জেলা সমন্বয় কমিটির সর্বশেষ বৈঠকে নদ-নদীর ওপর সেতু নির্মাণের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে এলজিইডি, সওজ অধিদপ্তর এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডকে প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী মানদণ্ড মেনে সেতু নির্মাণে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।’
বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, এখন যে সাতটি নদ-নদীর ওপর সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে, নিয়মানুযায়ী সেগুলোর কোনোটির ক্ষেত্রে সেতুর উচ্চতা হওয়ার কথা পানির স্তর থেকে গার্ডারের নিচ পর্যন্ত ১৬ ফুট, কোনোটির ২৫ ফুট, কিন্তু যে সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে তার সবক’টির উচ্চতা ৪ দশমিক ৫৯ ফুট থেকে ১১ দশমিক ৫০ ফুট পর্যন্ত। ওয়েস্টার্ন বাংলাদেশ ব্রিজ ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্টের (ডব্লিউবিবিআইপি) আওতায় সেতুগুলো নির্মাণ করছে এলজিইডি এবং সওজ। অভ্যন্তরীণ জলপথ ও তীর ভূমিতে স্থাপনা নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা অনুযায়ী, নৌপথে খুঁটিসহ বৈদ্যুতিক লাইন ও সেতু নির্মাণ করতে হলে বিআইডব্লিউটিএ থেকে ছাড়পত্র নেয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু এসব সেতু নির্মাণে বিআইডব্লিউটিএর ছাড়পত্র নেয়নি এলজিইডি ও সওজ। বাংলাদেশ নদী কমিশন এবং বিআইডব্লিউটিএর পক্ষ থেকে এসব সেতুর উচ্চতা নিয়ে আপত্তি জানানোর পরও তা আমলে নেয়া হয়নি।
গত শনিবার ভৈরব নদের ওপর নির্মাণাধীন রাজারহাট, ফতেপুর দায়তলা, ছাতিয়ানতলা ব্রিজগুলো পরিদর্শন করেন বিআইডব্লিউটিএ খুলনার পশ্চিম ব-দ্বীপ শাখার নৌ-সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগের যুগ্ম পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ আশ্রাফ উদ্দীন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নদীর ওপর সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে নেভিগেশন ক্লিয়ারেন্স নেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু যশোরে নদ-নদীর ওপর নয়টি সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে নেভিগেশন ক্লিয়ারেন্স নেয়া হয়নি। সেতুর উচ্চতা কম হওয়ায় নদীতে ছোট ও মাঝারি আকারের নৌযান চলাচল বাধাগ্রস্ত হবে। আমরা বিষয়টি পরিদর্শনে এলাম। আমি এলজিইডিকে অনুরোধ করব; আমাদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে নির্মাণ বা নকশা প্রণয়নে। এর আগে এলজিইডিকে দুটি চিঠি দিয়েছিলাম। আবারো তাদের চিঠি দেব অনুমতি নেয়ার জন্য। এছাড়া বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাব।’










