চীনের অর্থায়নে পটুয়াখালীর পায়রায় ২ হাজার ৬৪০ মেগাওয়াট সক্ষমতার দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (বিসিপিসিএল)। এরই মধ্যে যৌথ কোম্পানিটির আওতায় ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে এসেছে ২০২০ সালের জুনে। পায়রা প্রকল্পের দ্বিতীয় ফেজের বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নির্মাণ অগ্রগতিও ২২ শতাংশ শেষ হয়েছে। তবে চীন নতুন করে কয়লাভিত্তিক কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রে অর্থায়ন না করার ঘোষণা দিলে পায়রায় নির্মিতব্য দ্বিতীয় পর্যায়ের কেন্দ্রটির বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়। যদিও দেশটি পায়রায় দ্বিতীয় পর্যায়ের বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়নে অর্থায়ন বন্ধ করবে না বলে বিসিপিসিএলের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।

বিসিপিসিএল সূত্রে জানা গিয়েছে, কেন্দ্রটির প্রকৌশল ও পরিকল্পনায় যুক্ত পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটিকে বিভিন্ন পর্যায়ের কাজের জন্য ২১টি লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেয়া হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কার্যক্রম এরই মধ্যে সম্পন্ন করেছে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে প্রকল্পের যতটুকু অগ্রগতি হয়েছে তার পুরো অর্থায়নই করেছে তারা।

পায়রায় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় মূলত চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং কয়লাভিত্তিক নতুন প্রকল্পে অর্থায়ন না করার ঘোষণা দেয়ায়। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ২০২১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর চীনা প্রেসিডেন্ট জানান, তার দেশ নতুন করে কোনো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে অর্থায়ন করবে না। বরং এর পরিবর্তে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গ্রিন এনার্জি এবং কার্বন উৎপাদন কম হয় এমন বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিনিয়োগ সহায়তা দেবে। এবং আগামী ২০৩০ সাল পর্যন্ত চীন কার্বন কমানোর সবচেয়ে উত্কৃষ্ট সময় হিসেবে বেছে নেয়। ফলে দেশে চলমান এ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নিয়ে একধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজে অর্থায়নের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল শি জিনপিংয়ের ঘোষণার আগে। এ কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা নেই বলে জানিয়েছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা। বিসিপিসিএলের পরিচালক ও এনডব্লিউপিজিসিএলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) প্রকৌশলী এএম খোরশেদুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, নতুন করে চীন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগ করবে না এটা সত্য। তবে এ সিদ্ধান্তের আগে আমাদের প্রকল্প নেয়া হয়েছে বলে পায়রা দ্বিতীয় ফেজ প্রকল্পে চীনের অর্থায়ন নিয়ে কোনো জটিলতা নেই। আমরা সেকেন্ড ফেজের জন্য চীন থেকে যে ঋণ নিতে চাচ্ছি সেটি আগামী বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে চূড়ান্ত স্বাক্ষর হবে।

পায়রায় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ২০১৪ সালে চুক্তি করে রাষ্ট্রায়ত্ত নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড (এনডব্লিউপিজিসিএল) ও চায়না মেশিনারিজ কোম্পানি (সিএমসি)। চুক্তি অনুযায়ী এই দুই কোম্পানি যৌথভাবে বিসিপিসিএল গঠন করে। এ কোম্পানির আওতায় মূলত পায়রায় ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। পায়রায় প্রথম ধাপের ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ২৪৭ কোটি ডলার। প্রথম বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মতো দ্বিতীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রে এক্সিম ব্যাংকের অর্থায়নের কথা রয়েছে।

এনডব্লিউপিজিসিএল সূত্রে জানা গিয়েছে, পায়রা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় পর্যায়ের ভৌত অগ্রগতি ২২ শতাংশ শেষ হয়েছে। এ প্রকল্পের প্রথম ইউনিট উৎপাদনে যাওয়ার কথা রয়েছে ২০২৫ সালের জুনে এবং দ্বিতীয় ইউনিট একই বছরের ডিসেম্বরে।

চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পের সবশেষ অগ্রগতি হলো প্রকল্পে ডিটেইল ডিজাইনের কাজ চলমান রয়েছে। বয়লার, স্টিম টারবাইন এবং জেনারেটরসহ প্রধান যন্ত্রাংশ আমদানির ক্রয়াদেশ দেয়া হয়েছে। ওয়াটার ইনটেক ফোরবে এবং ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া কয়লার জন্য একটি কোল ডোম নির্মাণ করা হয়েছে। জেটি সম্প্রসারণের কাজ শেষ হয়েছে। এছাড়া বয়লার-২ এবং বয়লার-৪-এর পাইলিংয়ের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

এদিকে পায়রায় চলমান ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালানো যাচ্ছে না সঞ্চালন লাইন নির্মাণ না হওয়ার কারণে। ২০২০ সালের মে মাসে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে যাওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত কেন্দ্রটি থেকে ৫০০-৭০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারেনি। যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে কেন্দ্রটি সেটি স্থানীয় পর্যায়ে বিতরণ করছে বিদ্যুৎ বিভাগ। পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালাতে না পারায় প্রতি বছর বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা বাবদ বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে।

বিসিপিসিএল ও পিডিবির তথ্য অনুযায়ী দেখা গিয়েছে, ২০২০ সালের জুলাই থেকে শুরু করে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত মোট ২১ মাসে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রটির জন্য বিপিডিবিকে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে হয়েছে ৪ হাজার ৪৫৫ কোটি ২৮ লাখ টাকার বেশি। এর মধ্যে ২০২০-২১ অর্থবছরে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে হয়েছে ২ হাজার ১৭৮ কোটি টাকা এবং ২০২১ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের মার্চ অর্থাৎ নয় মাসে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে হয়েছে ২ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের নয় মাসের অর্থের পরিমাণ অনুযায়ী প্রতি মাসে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রটির জন্য ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে ২৫৩ কোটি টাকার বেশি।

পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম অর্থবছরের হিসাব বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, কেন্দ্রটি থেকে বিদ্যুৎ ক্রয় ও ভাড়া বাবদ ৩ হাজার ৭০১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ক্যাপাসিটি চার্জে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ১৭৮ কোটি টাকা। আর বিদ্যুৎ ক্রয় বাবদ ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৫২৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ বিদ্যুৎ ক্রয়ের চেয়ে কেন্দ্র ভাড়া বাবদ অর্থ ব্যয়ই হয়েছে সবচেয়ে বেশি। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুরো সক্ষমতায় চালাতে না পারায় প্রতি বছর এই ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বাড়ছে। তার প্রমাণও মিলেছে গত অর্থবছরে। ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে গিয়ে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে বিপিডিবিকে। এ অর্থের সংস্থান করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত আর্থিক চাপের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে কোম্পানিটি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বণিক বার্তাকে বলেন, বিদ্যুৎ খাতে সরকারের লোকসান কমাতে হলে এ খাতে ব্যয়সাশ্রয়ী মনোভাব থাকতে হবে। বিশেষ করে বড় যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে সেগুলোর নির্মাণকাজের সঙ্গে সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন নির্মাণকাজ একই সঙ্গে শেষ করা যায় সেই উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সময়োপযোগী আইন প্রণয়ন দরকার। যেখানে আর্থিক বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে বিদ্যুৎ বিভাগকে।

পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য পায়রা-গোপালগঞ্জ-আমিনবাজার সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করছে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)। মূলত পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ ঢাকায় এনে তা জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করবে বিদ্যুৎ বিভাগ। এরই মধ্যে পায়রা-গোপালগঞ্জ এবং গোপালগঞ্জ সাবস্টেশন নির্মাণের কাজ ৯৮ শতাংশ শেষ করেছে পিজিসিবি। অন্যদিকে আমিনবাজার থেকে মুন্সীগঞ্জ পর্যন্ত লাইন নির্মাণের সিংহভাগ কাজ শেষ। তবে পদ্মা নদী ক্রসিংয়ের কারণে এই লাইন চালু করা যাচ্ছে না। নদীর ওপর সাতটি টাওয়ার নির্মাণে সময় লাগছে পিজিসিবির।