নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনায় সাতক্ষীরা সরকারি মুরগি প্রজনন এবং উন্নয়ন খামারে এক যুগ ধরে উৎপাদন বন্ধ। ব্যবহার না করায় নষ্ট হয়ে গেছে ৬০ লাখ টাকার ডিম ফোটানোর মেশিন এবং কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত মুরগির বাচ্চা পালন শেড। ফলে সরকারি খামারটির সুফল পাচ্ছে না এ জেলাবাসী। আমিষের চাহিদা পূরণে জেলার খামারিরা স্বল্প মূল্যে মুরগির বাচ্চা সংগ্রহ করতে পারছেন না।

অন্যদিকে উৎপাদন না হলেও বছরে অন্তত ২৮-৩০ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ভূমি ও পৌরকর, বিদ্যুত্ ও পানি ব্যবহারে। অলস সময় কাটাতে হয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। এতে করে গত ১০-১২ বছরে ৩ কোটি টাকার ওপরে সরকারের ব্যয় হয়েছে এ মোরগ-মুরগি পালন ও উন্নয়ন কেন্দ্রে।

সাতক্ষীরা জেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরা সদর উপজেলার রসুলপুর এলাকায় তিন একর জমির ওপর ১৯৮৫ সালে সরকারি মুরগি প্রজনন ও উন্নয়ন খামারটি নির্মাণ করা হয়। এরপর যশোর থেকে একদিনের বাচ্চা এনে নার্সিং করে তা বিক্রি করা হতো। পরবর্তী সময়ে সাতক্ষীরায় পোলট্রির বাচ্চার চাহিদা বাড়ায় সরকার ২০০৯-১০ অর্থবছরে প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে  খামারটি সম্প্রসারণ করে। এর মধ্যে ৫৮ লাখ টাকা ব্যয়ে মাসে ৯০ হাজার ডিম ফোটানোর ক্ষমতাসম্পন্ন মেশিন এবং বাচ্চা পালন করার জন্য ১ কোটি টাকা ব্যয়ে তিনটি টিনশেড ঘর নির্মাণ করা হয়। সূত্রটি আরো জানায়, খামারটি সম্প্রসারণ করা হলেও বাড়তি কোনো জনবল দেয়া হয়নি। ডিম ফোটানোর জন্য কোনো টেকনিশিয়ান নিয়োগ দেয়া হয়নি। নেই কোনো নিরাপত্তা প্রহরী বা অফিস সহায়ক। এ তিনটি পদই রয়েছে শূন্য।

ফলে গত ১০-১২ বছরের মধ্যে মেশিনে ডিম ফোটানো বা শেডে কোনো বাচ্চা পালন করা হয়নি। এতে ব্যবহার ছাড়াই অকেজো হয়ে গেছে ৫৮ লাখ টাকার ডিম ফোটানো মেশিন। একই সঙ্গে টিনশেডও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

সাতক্ষীরা জেলা পোলট্রি খামারমালিক সমিতির সাবেক সাধারণ মোহাম্মদ আলী সুজন জানান, যে উদ্দেশ্য নিয়ে সরকার সাতক্ষীরায় সরকারি মুরগি প্রজনন ও উন্নয়ন খামার করেছিল, সে উদ্দেশ্য ভেস্তে গেছে। এ জেলায় প্রচুর মুরগির বাচ্চার চাহিদা রয়েছে। যার শতভাগ আমদানি করতে হয় জেলার বাইরে থেকে। অথচ সাতক্ষীরা সরকারি খামার থেকে যদি খামারিরা বাচ্চা সংগ্রহ করতে পারতেন তাহলে তারা আরো বেশি লাভবান হতেন। কিন্তু নানা অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনার কারণে সাতক্ষীরার সরকারি মুরগি প্রজনন ও উন্নয়ন খামারটিতে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এটি দ্রুত চালু করার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

সাতক্ষীরায় সদ্য যোগদান করা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা এবিএম আব্দুর রউফ জানান, দেশের অন্যান্য জেলার তুলনায় পোলট্রি বা ডিম উৎপাদনে খুবই সম্ভাবনাময় সাতক্ষীরা জেলা। কিন্তু কী কারণে সাতক্ষীরার সরকারি মুরগি প্রজনন ও উন্নয়ন খামারে দীর্ঘদিন যাবত উৎপাদন বন্ধ রয়েছে তা আমার জানা নেই। আমি নিজে পরিদর্শন করে দেখেছি, খুবই বেহাল দশায় পড়ে আছে খামারটি। আমি যেহেতু এখানে নতুন যোগদান করেছি বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে খোঁজখবর নেব। এছাড়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত যাতে উৎপাদনে ফেরানো যায় সেই ব্যবস্থা করা হবে।

এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা সরকারি মুরগি প্রজনন ও উন্নয়ন খামারের পোলট্রি ডেভেলপমেন্ট অফিসার কে এম সাদ্দাম হোসেন জানান, তিনি ১৯তম কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেছেন সাতক্ষীরায়। এর আগে ১৮ জন কর্মকর্তা চলে গেছেন। বর্তমানে তিনিসহ ছয়জন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন এখানে। তিনি বলেন, যোগদান করার পর থেকে নানা সমস্যা দেখছেন এ খামারে। এছাড়া আরো কিছু জনবল সংকট রয়েছে। এর মধ্যে ডিম ফোটানো মেশিনের জন্য টেকনিশিয়ান একজন, নিরাপত্তা প্রহরী একজন এবং অফিস সহায়ক একজন প্রয়োজন।

সাদ্দাম হোসেন আরো জানান, সম্প্রসারিত খামারের জন্য কোনো বরাদ্দ আসে না। মাঝেমধ্যে যশোর থেকে কিছু বাচ্চা এনে কয়েকদিন রেখে তা বিক্রি করা হয়। এছাড়া দিনভর বসে থাকি। মাঝেমধ্যে দু-একজন খামারি আসেন। তাদের পরামর্শ বা ভ্যাকসিন দেয়া ছাড়া আর কোনো কাজ নেই। এছাড়া এখানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, বিদ্যুত্, পানি, ভূমি ও পৌরকর বাবদ সরকারের বছরে অন্তত ২৮-৩০ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে সাতক্ষীরার সরকারি মুরগি প্রজনন ও উন্নয়ন খামারের দায়িত্বপ্রাপ্ত যশোর সরকারি মুরগি প্রজনন ও উন্নয়ন খামারের উপ-পরিচালক ড. শফিকুর রহমান জানান, সাতক্ষীরাসহ দেশের অন্যান্য ৩০টি জেলার জন্য প্রায় ১০০ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এটি পাস হলে সাতক্ষীরা সরকারি মুরগি প্রজনন ও উন্নয়ন খামারে উৎপাদনের ব্যবস্থা করা হবে। তাছাড়া এর আগে যশোর থেকে মুরগির বাচ্চা নিয়ে সাতক্ষীরা খামারে পালন করা হতো। সেখানে ডিম ফোটানো বা বাচ্চা উৎপাদনের জন্য ১০/১২ বছর আগে একটি প্রকল্পের কাজ করা হয়েছিল। ওই প্রকল্পের অধীনে টিনশেড নির্মাণ এবং ডিম ফোটানো মেশিন ক্রয় করা হয়। কিন্তু কী কারণে ডিম ফোটানো মেশিন ব্যবহার হয়নি তা আমি জানি না, এটি অনেক আগের বিষয় তার পরও এ ব্যাপারটি খতিয়ে দেখা হবে।