জাল আর্থিক প্রতিবেদনের মাধ্যমে আর্থিক অবস্থা ভালো দেখিয়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেয়ার সংস্কৃতি চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরেই। ঋণের ক্ষেত্রে নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাইয়ের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেটি পরিপালন করছিল না ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে এ ধরনের প্রবণতা রোধ করতে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি)। এরই মধ্যে সংস্থাটির পক্ষ থেকে ঋণ অনুমোদন ও নবায়নের ক্ষেত্রে নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন জমা নেয়া সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা যথাযথভাবে পরিপালন করা হচ্ছে কিনা সেটি খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে দেশের সব ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের পাশাপাশি নিরীক্ষকদের চিঠি পাঠিয়েছে এফআরসি।

ঋণ অনুমোদন বা নবায়নের সময় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে বাধ্যতামূলকভাবে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসের মাধ্যমে নিরীক্ষিত এবং স্টেকহোল্ডারদের জন্য প্রণীত হালনাগাদ আর্থিক প্রতিবেদন গ্রহণ এবং তা যথাযথভাবে ঋণ ফাইলে সংরক্ষণ করে সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগের পক্ষ থেকে এ বছরের ৪ জানুয়ারি একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। পরবর্তী সময়ে গত ৬ জুলাই জারি করা আরেকটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ঋণ অনুমোদন বা নবায়নের সময় ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের জমা দেয়া আর্থিক প্রতিবেদন ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন সিস্টেম (ডিবিএস) ডাটাবেজের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশ দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এসব নির্দেশনা যথাযথভাবে পরিপালন করা হচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করার জন্য এফআরসির পক্ষ থেকে এরই মধ্যে ৬০টি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে চিঠি দেয়া হয়েছে। চিঠিতে ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রণয়নের সময় অন্য বিধি-বিধানের সঙ্গে ঋণ অনুমোদন বা নবায়নের ক্ষেত্রে নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন জমা নেয়া, সংরক্ষণ ও ডিবিএসের ডাটাবেজের সঙ্গে যাচাই করা সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা কতটুকু পরিপালন করা হয়েছে সে বিষয়ে একটি নোট সংযোজন করতে বলা হয়েছে। এ বছরের ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত হিসাব বছর এবং তার পরবর্তী হিসাব বছর শেষে ব্যাংকগুলোর আর্থিক বিবরণী প্রণয়নের সময় কত শতাংশ ঋণ ফাইলে—কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা পরিপালন করা হয়েছে তা সুনির্দিষ্টভাবে আর্থিক বিবরণী নোটস টু দ্য অ্যাকাউন্টসে ডিসক্লোজার হিসেবে সংযোজন করতে হবে। ব্যাংকের পাশাপাশি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও এফআরসির পক্ষ থেকে অনুরূপ নির্দেশনা পাঠানোর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, নিঃসন্দেহে এটি একটি ভালো উদ্যোগ। বর্তমানে আমরা মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পর্যায়ে রয়েছি, তাই আমাদের ডিসক্লোজারের মান উন্নত হওয়া প্রয়োজন। এটি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে কিছুটা সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে, সেগুলো সতর্কতার সঙ্গে সমাধান করতে হবে। তবে স্বচ্ছতা নিশ্চিতে এর প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন তিনি।

ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও নিরীক্ষকদের কাছেও চিঠি পাঠিয়েছে এফআরসি। ৪৭টি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১৫০ জন নিরীক্ষকের কাছে পাঠানো এফআরসির চিঠিতে বলা হয়েছে, ঋণ অনুমোদন বা নবায়নের ক্ষেত্রে নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন জমা নেয়া, সংরক্ষণ ও ডিবিএসের ডাটাবেজের সঙ্গে যাচাই করা সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা যথাযথভাবে পরিপালিত হচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখার দায়িত্ব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বহির্নিরীক্ষকের ওপরও বর্তায়। বহির্নিরীক্ষকরা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করছে কিনা তা এফআরসি পুনরীক্ষণ করে থাকে। নিরীক্ষকের নিরীক্ষা ফাইল পুনরীক্ষণ কাজের অংশ হিসেবে এফআরসির পক্ষ থেকে এ বছরের আগস্টে আইসিএবি প্রেসিডেন্টকে চিঠির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আলোচ্য প্রজ্ঞাপনের বিষয়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বহির্নিরীক্ষককে জানাতে বলা হয়েছে। এ বছরের ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত হিসাব বছর এবং তার পরবর্তী অন্য যেকোনো হিসাব বছরের জন্য কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বহির্নিরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলে সেক্ষেত্রে নিরীক্ষা শেষে নিরীক্ষা প্রতিবেদন স্বাক্ষরের তারিখ থেকে এক মাসের মধ্যে এ-সংক্রান্ত তথ্য নির্ধারিত ছকে এফআরসির কাছে পাঠানোর জন্য নিরীক্ষকদের নির্দেশ দিয়েছে এফআরসি। দেশের বেশ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা এফআরসির এ নির্দেশনা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এফআরসির নির্বাহী পরিচালক মো. সাঈদ আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ঋণ নেয়ার সময় জাল আর্থিক প্রতিবেদন জমা দিয়ে কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থা ভালো দেখানো হচ্ছে। এতে খেলাপি ঋণ বাড়ার পাশাপাশি অর্থ পাচার ও সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এফআরসির অনুরোধে এরই মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণ অনুমোদন ও নবায়নের ক্ষেত্রে নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি ডিবিএসের মাধ্যমে প্রকৃত আর্থিক প্রতিবেদন যাচাইয়ের নির্দেশনা দিয়েছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এ নির্দেশনা পরিপালন করছে কিনা তা নিশ্চিত করতে আর্থিক প্রতিবেদনে এ-সংক্রান্ত একটি নোট সংযোজনের জন্য বলা হয়েছে। পাশাপাশি নিরীক্ষকদেরও বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও এফআরসির যৌথ প্রয়াসের জাল আর্থিক প্রতিবেদন দেখিয়ে ঋণ নেয়ার প্রবণতা রোধ করা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।

প্রসঙ্গত, এফআরসির নিরীক্ষা চর্চা পুনরীক্ষণ বিভাগের পর্যবেক্ষণে জনস্বার্থ সংস্থা কর্তৃক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণ বা নবায়নের সময় শেয়ারহোল্ডারদের জন্য প্রণীত ও চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট কর্তৃক নিরীক্ষিত হালনাগাদ আর্থিক বিবরণী জমা না দিয়ে ম্যানেজমেন্ট অডিট রিপোর্ট, রিভিউ রিপোর্ট নামে ভিন্ন আর্থিক প্রতিবেদন জমা দেয়ার বিষয়টি উঠে আসে। এর মাধ্যমে ভিন্ন উদ্দেশ্যে ভিন্ন নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। এ ধরনের প্রবণতা রোধ করে আর্থিক খাতে আরো স্বচ্ছতা আনার জন্য গত বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দেয় এফআরসি। চিঠিতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক কোনো জনস্বার্থ সংস্থাকে ঋণ অনুমোদন বা নবায়নের সময় বাধ্যতামূলকভাবে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস কর্তৃক নিরীক্ষিত এবং শেয়ারহোল্ডারদের জন্য প্রণীত হালনাগাদ বিধিবদ্ধ নিরীক্ষা প্রতিবেদন এবং নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন গ্রহণ করে তা ঋণ ফাইলে সংরক্ষণ করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে সার্কুলার জারির অনুরোধ জানিয়েছিল এফআরসি। এছাড়া এফআরসি কর্তৃক কোনো জনস্বার্থ সংস্থার আর্থিক বিবরণীর স্বচ্ছতা নিরূপণের জন্য কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে জনস্বার্থ সংস্থার আর্থিক প্রতিবেদন সম্পর্কিত কোনো তথ্য চাইলে সেই ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান যাতে এফআরসিকে সেই তথ্য প্রদানের মাধ্যমে সহযোগিতা করে এ বিষয়েও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা চেয়েছিল এফআরসি। এ পরিপ্রেক্ষিতে এ বছরের জানুয়ারি ও জুলাইয়ে এ-সংক্রান্ত দুটি প্রজ্ঞাপন জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।