অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে খুলনা নগরীর ২০টি বাণিজ্যিক কেন্দ্র। এসব ভবনের বেশির ভাগই পরিকল্পিতভাবে তৈরি হয়নি। বড় ভবনগুলোয় দুটি সিঁড়ি নেই। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও নেই। অনেক স্থাপনা জরাজীর্ণ, প্রবেশের রাস্তা সরু; জরুরি প্রয়োজনে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশের সুযোগও নেই। সিটি করপোরেশনের রাস্তাগুলোও ব্যবসায়ীদের দখলে। সম্প্রতি ফায়ার সার্ভিসের জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

ঝুঁকিতে থাকা বাণিজ্যিক ভবন ঘুরে দেখা গেছে, কয়েকটি ভবনের বিভিন্ন জায়গায় ফাটল ধরেছে। বাইরের অংশের দেয়ালে ধরেছে নোনা। অনেক জায়গায় কংক্রিটের ঢালাই ভেঙে ভেতরের রড দেখা যাচ্ছে। ছাদের অংশে পলেস্তরা খসে বেরিয়ে এসেছে রড। ফাটলে রঙ করা হলেও ‘ভবন ঝুঁকিপূর্ণ’ লেখা কোনো সাইনবোর্ড নেই।

এসব বাণিজ্যিক কেন্দ্রের ব্যবসায়ীরা জানান, ভবনের পাশাপাশি অগ্নিঝুঁকি নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। ঝুঁকি নিয়েই তারা এখানে ব্যবসা করছেন। কোনো বিপদ ঘটলে সব শেষ হয়ে যাবে। রাস্তা সরু হওয়ায় এখানে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢোকার সুযোগ নেই। ঘর মালিক বা বাজার কমিটিকে এ ব্যাপারে বলেও কোনো লাভ হয় না।

খুলনা ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে খাজা খানজাহান আলী হকার্স মার্কেট, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মার্কেট, জব্বার মার্কেট, মশিউর রহমান মার্কেট, হেরাজ মার্কেট ও বড় বাজার মসলাপট্টি। তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে থাকা বাণিজ্যিক কেন্দ্রের মধ্যে রয়েছে বড় বাজারের ঠাকুরবাড়ী গলির কাপড়পট্টি, খুলনা শপিং কমপ্লেক্স, হার্ট মেটাল গ্যালারি, ডাকবাংলো সুপার মার্কেট, ফ্রেন্ডস আর্কেড মার্কেট, রেলওয়ে এলাকার বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন মার্কেট, কাজী নজরুল ইসলাম মার্কেট, চাঁদনী চক মার্কেট, মশিউর রহমান মার্কেট, বিপণিবিতান ও ভৈরব রোডের লোহা-কাঁসাপট্টি। কম ঝুঁকিতে থাকা বিপণিবিতানের মধ্যে রয়েছে ক্লে রোডের হ্যানিম্যান মার্কেট, রেলওয়ের মানিক মিয়া মার্কেট ও ডাকবাংলো মোড়ের রব মার্কেট।

এ ব্যাপারে খুলনা ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক ফারুক হোসেন শিকদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত বুধবার অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে খুলনার সালাম জুট মিল। সেখানে প্রয়োজনীয় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না। এ কারণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে পাটকলটিতে। এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষকে বারবার নোটিস করা হলেও তারা গুরুত্ব দেয়নি। শুধু সালাম জুট মিল নয়, খুলনার অনেক প্রতিষ্ঠানেই অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই; অনেকের থাকলেও তা অপ্রতুল। তাছাড়া নগরে অর্ধশত বহুতল ভবন থাকলেও মালিকরা অকুপেন্সি সার্টিফিকেট নেন না। তাদের এসব ব্যাপারে তাগিদ দেয়া হলেও জীবন ও সম্পদের ঝুঁকিকে পাত্তা দেন না প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্টরা। কেবল কোনো দুর্ঘটনার পরই টনক নড়ে কর্তৃপক্ষের। তখন ব্যাপক তোড়জোড় চলে কয়েকদিন। এরপর আলোচনা থামলে, থেমে যায় সব তৎপরতা।’

ফারুক হোসেন বলেন, ‘অগ্নিদুর্ঘটনায় সম্পদ ও প্রাণহানি রোধে বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোয় অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা জোরদার করতে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন ও ওয়াসার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।’

এদিকে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ) বলছে, নগরের ১১টি আবাসিক এলাকায় প্রায় চার হাজার প্লট রয়েছে। এর মধ্যে ৬৬টি ভবনের নকশায় ত্রুটি রয়েছে। এছাড়া আবাসিকের অনুমোদন নিয়ে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনাকারী ভবন রয়েছে। বড় ভবনগুলোয় দুটি সিঁড়ি থাকার কথাও থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। একই সঙ্গে ভবনগুলোয় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা না রেখেই হোটেল, রেস্টুরেন্ট, হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, কম্পিউটার ও ওষুধের ব্যবসা চলছে।

এ ব্যাপারে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সদস্য (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) শবনম সাবা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নগরের ৬৬টি ভবনের নকশায় ত্রুটি রয়েছে। আমরা তাদের নোটিস করেছি। এছাড়া যারা অনুমোদনহীনভাবে আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক কার্যক্রম করছেন তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।’