অনাবৃষ্টির কারণে মৌসুমের শুরুতেই বাধাগ্রস্ত হয় আমনের আবাদ। এরপর এ নিয়ে বড় ধরনের আশঙ্কা তৈরি করে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং। তবে সে শঙ্কা কাটিয়ে সম্ভাবনা দেখাচ্ছে এবারের আমন মৌসুমের ফলন। এরই মধ্যে দেশের প্রায় সাড়ে ৬৩ শতাংশ জমির আমন ধান কাটা হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) জানিয়েছে, অনুকূল আবহাওয়া ও আলো বেশি থাকায় এবার হেক্টরপ্রতি চালের গড় ফলন পাওয়া গিয়েছে ৩ দশমিক ১০ টন, যা প্রত্যাশার চেয়েও বেশি।

ডিএই সূত্রে জানা যায়, এবার আমন মৌসুমে ধানের আবাদ হয়েছে ৫৬ লাখ ৫৭ হাজার ৪৪৭ হেক্টর জমিতে। এখান থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ কোটি ৫৯ লাখ ৮৬ হাজার টন। এর মধ্যে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ে মোট ৩১ জেলার ৮০ হাজার ৭৭৭ হেক্টর আমন মৌসুমের ধান আবাদি জমি আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৫ হাজার ৬০০ হেক্টর জমির ধান পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। অনাবৃষ্টির কারণে সব জায়গায় একই সময়ে আবাদ শুরু করা যায়নি। সব মিলিয়ে এবার উৎপাদন কমার বড় শঙ্কা তৈরি হলেও রৌদ্রোজ্জ্বল ও অনুকূল আবহাওয়ার কারণে ফলনে আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা করছেন কৃষি খাতসংশ্লিষ্টরা।

চাল উৎপাদনের তথ্য নিয়ে যৌথ পরিসংখ্যান করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ডিএই। সে তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে আমন মৌসুমে হেক্টরপ্রতি ফলনের হার ছিল প্রায় ২ দশমিক ৬২ টন। এর আগে ২০১৮-১৯ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত ফলন মোটামুটি আড়াই টনের ঘরেই ছিল।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাইদুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শুরুতে অনাবৃষ্টির কারণে আমন নিয়ে এক ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। এরপর ডিজেল ও সারের মূল্যবৃদ্ধি কৃষকদের মাঝে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তবে শেষের দিকে আবহাওয়া ভালো থাকায় প্রত্যাশিত ফলন হয়েছে। এখন ফলনের হার বেশি থাকলেও সাধারণত সুগন্ধিযুক্ত চাল বা চিকন চাল মৌসুমের শেষের দিকে কাটা হয়। এগুলোর ফলন কম হয়। এ কারণে গড় ফলনের হার সামনে আরো কমতে পারে।’

ডিএইর ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত হালনাগাদকৃত তথ্য অনুযায়ী, চলতি রোপা আমন মৌসুমে এ পর্যন্ত ৩৫ লাখ ৮৮ হাজার ৫৮ হেক্টর জমির ফসল কাটা হয়েছে, যা মোট জমির প্রায় ৬৩ দশমিক ৪২ শতাংশ। এসব জমিতে চাল উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ১১ লাখ ৩১ হাজার ৯৮০ টন। হেক্টরপ্রতি ফলনের হার ৩ দশমিক ১০ টন। এছাড়া ধানের হেক্টরপ্রতি ফলন পাওয়া গিয়েছে ৪ দশমিক ৬৫ টন। আর রোপা ও বোনা আমন মিলে হেক্টরপ্রতি চালের গড় ফলন দাঁড়ায় তিন টনের কিছু বেশি।

এবার রাজশাহী, দিনাজপুর ও যশোর অঞ্চলের জেলাগুলোয় সবচেয়ে ভালো ফলন পাওয়া গিয়েছে। রাজশাহী অঞ্চলের রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ— চার জেলায় ৪ লাখ ৪ হাজার ৮৫ হেক্টর জমিতে আবাদ করা হয়েছে। অঞ্চলটিতে এখন পর্যন্ত ৩ লাখ ১০ হাজার ৫৯৭ হেক্টর বা ৭৬ দশমিক ৮৬ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়েছে। এসব জমিতে চাল উৎপাদন হয়েছে ১০ লাখ ৭৮ হাজার ৩৩৩ টন। ফলনের হার হেক্টরপ্রতি ৩ দশমিক ৮৭ টন।

ফলনের হারের দিক থেকে ৬০ শতাংশের বেশি জমি কাটা হয়েছে—এমন জেলাগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে রাজশাহী অঞ্চলের চাঁপাইনবাবগঞ্জ। জেলাটিতে গত বছর ফলনের হার ছিল হেক্টরপ্রতি ২ দশমিক ৯৮ টন। এবার তা পাওয়া গিয়েছে হেক্টরপ্রতি ৩ দশমিক ৫৮ টন। আবাদকৃত ৫৩ হাজার ৫২০ হেক্টরে মধ্যে ৪৭ হাজার ২৮২ হেক্টর বা ৮৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ জমির ফলন এরই মধ্যে কাটা হয়েছে। এসব জমিতে মোট ১ লাখ ৬৯ হাজার ৩২২ টন চাল উৎপাদন হয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. পলাশ সরকার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্বাধীনতার পর এত ভালো ফলন আর কখনা পাওয়া যায়নি। মূলত উচ্চফলনশীল জাতের আবাদ বেশি হওয়া, অনুকূল আবহাওয়া ও আলোকোজ্জ্বল পরিবেশ পাওয়া, রোগ-বালাই কম হওয়া এবং সারের সুষম প্রয়োগের কারণেই এবার ভালো ফলন হয়েছে। আমাদের জেলায় ব্রি ৫১, ব্রি ৪৮, ব্রি ৭৫, ব্রি ৯০, বিনা ১৬, বিনা ১৭ ও বিনা ২২ জাতের ধান বেশি চাষাবাদ হয়েছে। এবার অতিবৃষ্টি হয়নি। এটাও ফলন বাড়াতে সহযোগিতা করেছে। গত বছরের চেয়ে হেক্টরপ্রতি দশমিক ৫ টন বেশি ফলন হয়েছে। অর্থাৎ এ জেলায় প্রায় ৩০ হাজার টন বেশি চাল উৎপাদন হয়েছে।’

রাজশাহী জেলার অবস্থান চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার পরই। জেলাটিতে এ বছর ৮০ হাজার ৮৩২ হেক্টরের মধ্যে ৬৯ হাজার ৬২১ হেক্টর বা ৮৬ দশমিক ১৩ শতাংশ জমির ফলন কাটা হয়েছ। ফলন হয়েছে ২ লাখ ৪৬ হাজার ৯১৮ টন। হেক্টরপ্রতি ফলনের হার ৩ দশমিক ৫৫ টন।

নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার ভীমপুর ইউনিয়নের চকরাজা গ্রামের কৃষক নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘এক বিঘা জমিতে স্বর্ণা-৫ ও দুই বিঘায় ব্রিধান-৪৯ জাতের ধানের আবাদ করেছিলাম। বিগত বছরগুলোয় প্রতি বিঘায় আমন আবাদে ৭-৮ হাজার টাকা খরচ হলেও এবার ডিজেল ও সারের মূল্যবৃদ্ধিতে বিঘাপ্রতি প্রায় ১১ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। পোকার আক্রমণ থাকলেও কাটা মাড়াই শেষে ৫৩ মণ ফলন পেয়েছি। এক সপ্তাহ আগে প্রতি মণ ধান বাজারে ১ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি করেছি। যেখানে সব খরচ বাদে প্রায় ২৭ হাজার টাকা লাভ হয়েছে।’

মান্দা উপজেলার মৈনম ইউনিয়নের ভদ্রসেনা গ্রামের কৃষক তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘পাঁচ বিঘা জমিতে স্বর্ণা-৫ জাতের ধানের আবাদ করেছিলাম। দুদিন আগে ধান কাটা-মাড়াই শেষ হয়েছে। ৭৮ মণ ফলন পেয়েছি। ভালো দাম না পাওয়ায় এখনো বিক্রি করিনি। এক সপ্তাহ আগে বাজারে এই ধান প্রতি মণ ১ হাজার ২৭০ টাকা দরে কেনাবেচা হলেও এখন ১ হাজার ২৪০ টাকা মণ দরে ধান কেনাবেচা হচ্ছে।’

রাজশাহী অঞ্চলভুক্ত নাটোর জেলায় এবার ৭৩ হাজার ৪৩৩ হেক্টর জমির মধ্যে ৪৮ হাজার ৪৩২ বা ৬৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ জমি কর্তন করা হয়েছে। হেক্টরপ্রতি গড় ফলন হয়েছে ৩ দশমিক ৪৬ টন। নওগাঁ জেলায় ১ লাখ ৯৬ হাজার ৩০০ হেক্টর জমির মধ্যে ১ লাখ ৪৫ হাজার ২৬২ হেক্টর বা ৭৪ শতাংশ জমি কর্তন করা হয়েছে। জেলাটিতে ফলনের হার হেক্টরপ্রতি ৩ দশমিক ৪০ টন।

রাজশাহী অঞ্চলের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. শামছুল ওয়াদুদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ বছর দিনের বেলায় সূর্যের আলো বেশি ছিল। আর সুষম সার প্রয়োগের ফলে পোকামাকড়ের আক্রমণ কম হয়েছে। এ কারণে ফলন অনেক ভালো হয়েছে।’

দিনাজপুর অঞ্চলের দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়—এ তিন জেলায় ৪ লাখ ৯৮ হাজার ২২৫ হেক্টর জমির মধ্যে ৪ লাখ ২৭ হাজার ৭৬৯ হেক্টর বা ৮৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ জমির ফলন কাটা হয়েছে। গড় ফলন হয়েছে হেক্টরপ্রতি ৩ দশমিক ৩৫ টন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীর পর ফলনের হার বেশি দিনাজপুর অঞ্চলের ঠাকুরগাঁও জেলায়। জেলাটিতে কয়েক বছর আগেও বিলের জমির বাইরে ধান চাষ কম হতো। কিন্তু কয়েক বছর ধরে আলু, ভুট্টা ও সবজির পাশাপাশি এসব জমিতে আমন মৌসুমে ধান চাষ করছেন কৃষক। এ বছর জেলাটিতে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৩৬০ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৩২ হাজার ৪৫৬ হেক্টর বা ৯৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ জমির ফসল কাটা হয়েছে। এসব জমিতে ৪ লাখ ৫৯ হাজার ২৪৪ টন চাল উৎপাদন হয়েছে। ফলনের হার হেক্টরপ্রতি ৩ দশমিক ৪৭ টন।

জেলাটির রানিশংকৈল উপজেলার ধর্মগড় গ্রামের কৃষক মো. মানিক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ বছর আমি ব্রি-৮২ জাতের ধানের আবাদ করেছি। দুই বিঘা জমিতে এবার প্রায় ৫০ মণ ফলন পেয়েছি। গত বছরের চেয়ে এবার তুলনামূলক বেশি ফলন পেয়েছি। গত বছর এক বিঘা জমিতে বিনা ১৭ জাতের ধানের আবাদ করি। প্রতি বিঘায় ২০ মণের মতো পেয়েছিলাম। মূলত এবার আবহাওয়া ভালো থাকায় ও সঠিক মাত্রায় সার প্রয়োগের ফলে ফলন ভালো হয়েছে। এ বছর বিনা ১৭ জাতেও কৃষকরা ২৫ মণ ধান পেয়েছেন।’

যশোর অঞ্চলের ছয় জেলায় এবার ৪ লাখ ৫৭ হাজার ৯০ হেক্টর জমিতে আবাদ করা হয়। এর মধ্যে ৪ লাখ ২ হাজার ৭৩৮ হেক্টর বা ৮৮ দশমিক ১১ শতাংশ জমির ফলন কাটা হয়েছে। গড় ফলন হয়েছে হেক্টরপ্রতি ৩ দশমিক ২৯ টন। এছাড়া অন্য অঞ্চলগুলোর মধ্যে ঢাকায় ২ দশমিক ৯৭ টন, ময়মনসিংহে ৩ দশমিক শূন্য ৪, কুমিল্লায় ৩ দশমিক শূন্য ৮, সিলেটে ২ দশমিক ৬৫, চট্টগ্রামে ২ দশমিক ৭৫, রাঙ্গামাটিতে ২ দশমিক ৮৩, বগুড়ায় ৩ দশমিক ২৩, রংপুরে ২ দশমিক ৯৯, খুলনায় ২ দশমিক  ৯৫, বরিশালে ৩ দশমিক ২৩ ও ফরিদপুরে হেক্টরপতি ৩ দশমিক ১০ টন চাল পাওয়া যাচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. বেনজীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমনের ফলন এবার খুবই ভালো হয়েছে। এর আগে কোনো বছর এ বছরের মতো ভালো ফলন পাওয়া যায়নি। লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও এবার ভালো ফলন হবে।’

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. নাসিরুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এতদিনে যে পরিমাণ ফসল কাটা হয়েছে তা মূলত উত্তরবঙ্গকেন্দ্রিক। এসব অঞ্চলে উচ্চফলনশীল জাতের আবাদ করা হয়। এসব এলাকায় ফলনের হার বরাবরই ভালো থাকে। শুরুতে অনাবৃষ্টি থাকলেও কৃষক সাধারণত আমন ধান মিস করেন না। তবে এবার কৃষকরা দেরিতে আমন রোপণ করেছেন। ফলে শেষের দিকে ফলনের হার অনেকটা কমে যাবে। গড় ফলন এ কারণে আরো কমে যাবে। প্রতি বছর উত্তরবঙ্গে বন্যায় অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এবার হয়নি। ফলে এবার আমনের সার্বিক ফলন ভালো হবে।’

 

প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন নওগাঁ ও ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি