চলতি আমন মৌসুমে কয়েক দফা বন্যায় দেশের প্রায় ৩৫টি জেলায় বিভিন্ন মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমন ধান। এতে গত বছরের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বা সাড়ে ১৫ লাখ টন কমতে পারে আমন চালের উৎপাদন। তবে উৎপাদন ও চাহিদা বিবেচনায় দেশে খাদ্য ঘাটতির কোনো আশঙ্কা আপাতত নেই। আগামী জুন পর্যন্ত চাহিদা পূরণ করেও উদ্বৃত্ত থাকবে কমপক্ষে ২৮ লাখ টন চাল। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।

দেশে গত বছর আমন মৌসুমে ১ কোটি ৫৫ লাখ টনের কিছু বেশি চাল উৎপাদন হয়েছিল। তবে চলতি বছর অতি বৃষ্টিতে পাঁচ-ছয় দফা বন্যায় ৩৫টি জেলার আমন ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে আমন চালের উৎপাদন প্রায় ১০ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ কমে ১ কোটি ৩৯ লাখ ৮০ হাজার টনে নামতে পারে বলে ব্রির ওই গবেষণায় দেখানো হয়েছে।

গবেষণাটি যৌথভাবে পরিচালনা করেছে ব্রির কৃষি অর্থনীতি বিভাগ ও কৃষি পরিসংখ্যান বিভাগ। এজন্য এক মাস ধরে দেশের ১৪টি কৃষি অঞ্চলে জরিপ করে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করেছে। গবেষণার জন্য ১৪টি কৃৃষি অঞ্চলের মোট ১ হাজার ৮০০ জন কৃষকের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পাশাপাশি ৫৬ জন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও ১১২ জন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকেও ধানের আবাদ ও বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কিত তথ্য নেয়া হয়। এ কাজে প্রথমবারের মতো উৎপাদন তথ্য নির্ণয়ের জন্য স্যাটেলাইট চিত্র ব্যবহার করে আমন ধানের আবাদকৃত এলাকার তথ্য বের করা হয়েছে। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়, বন্যাক্রান্ত হয়নি এমন এলাকায় ২১ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর, অল্প বন্যা আক্রান্ত এলাকায় ১৬ লাখ, মধ্যম মানের বন্যা আক্রান্ত এলাকায় ১৪ লাখ ৩০ হাজার এবং অতি বন্যা আক্রান্ত এলাকার ছয় লাখ হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ হয়েছিল।

ব্রির গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৪টি কৃষি অঞ্চলের মধ্যে চারটিতে এবার গত বছরের তুলনায় আমন ধানের ফলন বেড়েছে। এর মধ্যে দিনাজপুরে ১১ দশমিক ১ শতাংশ, খুলনায় ৭ দশমিক ১, চট্টগ্রামে ১ দশমিক ৩ ও যশোরে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ ফলন বেড়েছে। বাকি ১০টি কৃষি অঞ্চলে আমন ধানের ফলন বিভিন্ন হারে কমেছে। এ বছর প্রতিটি কৃষি অঞ্চলে আমন আবাদ এলাকা গত বছরের তুলনায় কম ছিল।

চলতি আমন মৌসুমে বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে মোট ১ লাখ ৫ হাজার হেক্টর জমি। যেসব এলাকা বন্যা আক্রান্ত হয়নি, সেখানে ধানের ফলন প্রায় ৪ দশমিক ৪ শতাংশ হারে বেড়েছে। অন্যদিকে কম বন্যাপ্রবণ এলাকায় দশমিক ৬, মাঝারি বন্যাপ্রবণ এলাকায় ১৩ দশমিক ৪ এবং অতি বন্যাপ্রবণ এলাকায় ২৪ দশমিক ১ শতাংশ ধানের ফলন কম হয়েছে।

ব্রি তাদের গবেষণায় বেশ কয়েকটি সুপারিশও করেছে। এর মধ্যে রয়েছে আগামী বোরো আবাদ নির্বিঘ্ন করতে বন্যা আক্রান্ত এলাকাগুলোয় প্রয়োজনীয় বীজ, চারা ও সারসহ সব উপকরণ যথাসময়ে সরবরাহ করা, চালের বাজার স্থিতিশীল রাখতে কৃষকদের জন্য ধান ও চালের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা, চাল আমদানির সিদ্ধান্ত গ্রহণে যৌক্তিকতা বিবেচনা করা এবং ধান কর্তনের পরবর্তী দুই মাস কোনো ধরনের চাল আমদানির সিদ্ধান্ত না নেয়া।

এ বিষয়ে ব্রির মহাপরিচালক ড. মো. শাহজাহান কবীর বণিক বার্তাকে বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে চলতি মৌসুমে আমন চালের উৎপাদন কিছুটা কমলেও জুন পর্যন্ত ২৮ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে চালের চাহিদা বিবেচনায় মানুষের দৈনিক চাল ভোগ ও জনসংখ্যার পরিমাণ যেমন বেশি ধরা হয়েছে, তেমনি পোস্ট-হারভেস্ট লসও সঠিকভাবে গণনায় নেয়া হয়েছে। এসব বিবেচনায় চাল উদ্বৃত্ত থাকবে। এ অবস্থায় মৌসুমের শুরুতেই ঢালাওভাবে চাল আমদানি করলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। তাই কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি আমন ধান ক্রয় বাড়াতে হবে। ধান ও চাল সংগ্রহ কার্যক্রমকে আরো গতিশীল ও কৃষকবান্ধব করতে হবে।

চাল উদ্বৃত্ত থাকলে ভোক্তাদের কেন বেশি দামে চাল কিনতে হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চালের উৎপাদন ও বাজার দামের বেশ ফারাক রয়েছে, এটি অস্বীকার করছি না। সেটি মূলত দাম নিয়ন্ত্রণে মিলার ও ব্যবসায়ীদের একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণে হচ্ছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত গবেষণা চলমান রয়েছে।

শুধু ব্রি নয়, সম্প্রতি ইউনাইটেড স্টেটস ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রিকালচারও (ইউএসডিএ) আমন চালের উৎপাদন কমার প্রক্ষেপণ করেছে। গ্লোবাল এগ্রিকালচারাল ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক (গেইন) প্রতিবেদনে তারা বলেছে, আমন ধান উৎপাদনে বড় বিপর্যয়ের কারণে চলতি বছরে চাল উৎপাদনে ভাটা পড়বে। ইউএসডিএর প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে চাল উৎপাদন (মিলড রাইস) কমে দাঁড়াবে ৩ কোটি ৫৩ লাখ টনে, যা গত বছর ছিল ৩ কোটি ৫৮ লাখ ৫০ হাজার টন। গত অর্থবছর ১ কোটি ৪০ লাখ টন আমন চাল (মিলড রাইস) উৎপাদন হলেও চলতি অর্থবছর তা কমে ১ কোটি ৩৩ লাখ টনে নামতে পারে। ফলে এক অর্থবছরের ব্যবধানে আমন চালের উৎপাদন কমতে পারে সাত লাখ টন।

দেশে চাল উৎপাদন কম হলেও খাদ্য ঘাটতি হবে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট গবেষণাপ্রধান ও ব্রির কৃষি অর্থনীতি বিভাগের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আবদুর রউফ সরকার। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, চলতি অর্থবছরে মোট চাল উৎপাদন হবে ৩ কোটি ৭৪ লাখ ২০ হাজার টন। ফলে চাল উদ্বৃত্ত থাকবে বাংলাদেশ। তবে চালের বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিলে কৃষক ও ভোক্তা আরো সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে।