দেশীয় টেক্সটাইল ও স্পিনিং শিল্পের সুরক্ষা, স্থানীয় মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি এবং এলডিসি-পরবর্তী সময়ে রফতানি সক্ষমতা ধরে রাখতে কাঁচামাল আমদানিতে ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্ত পুনর্বহালসহ ছয় দফা দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)। একই সঙ্গে দেশীয় সুতা ব্যবহারে নগদ সহায়তা বৃদ্ধি, করহার পুনর্নির্ধারণ, কাঁচামালে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার, নগদ সহায়তার ওপর উৎসে কর প্রত্যাহার এবং ইন্টার-কম্পানি ঋণসংক্রান্ত কর বিধান থেকে রফতানিমুখী শিল্পকে অব্যাহতি দেয়ার প্রস্তাবও দিয়েছে সংগঠনটি।

বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এসব দাবি তুলে ধরেন বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল। এতে বলা হয়, দেশের প্রাথমিক টেক্সটাইল খাতের প্রায় ৩৭০টি কারখানায় ৪৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্পিনিং, উইভিং, ডেনিম, ডাইং, প্রিন্টিং ও ফিনিশিংসহ বিভিন্ন বস্ত্র উৎপাদনকারী শিল্প রয়েছে। দেশের স্বাধীনতার পর থেকে প্রাথমিক টেক্সটাইল খাত তৈরি পোশাক শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বর্তমানে দেশের স্থানীয় সুতা ও বস্ত্রের চাহিদার বড় অংশ পূরণের পাশাপাশি এ খাত জিডিপিতে প্রায় ১৩ শতাংশ অবদান রাখছে।

চিঠিতে আরো বলা হয়, টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক, প্যাকেজিং, হোম টেক্সটাইল, টেরি টাওয়েল এবং ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ২০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। পরোক্ষভাবে প্রায় ৪ কোটি মানুষের জীবিকা এ খাতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এ শিল্পের স্থিতিশীলতা শুধু রফতানি আয়ের জন্য নয়, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, ব্যাংকিং খাত এবং সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিটিএমএর ভাষ্য, দেশে তুলা উৎপাদন সীমিত হওয়ায় বিদেশ থেকে তুলা আমদানি করে সুতা উৎপাদন করতে হয়। তা সত্ত্বেও দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো নিট পোশাক খাতের প্রায় শতভাগ এবং ওভেন পোশাক খাতের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সুতার চাহিদা পূরণ করছে। একই সঙ্গে স্থানীয় মিলগুলো দেশের প্রায় ১৭ কোটি মানুষের অভ্যন্তরীণ সুতা ও বস্ত্রের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বছরে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করছে।

চিঠিতে দাবি করা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে আমদানিকৃত সুতার ওপর নির্ভরতা দ্রুত বেড়েছে। অ্যাসাইকুডা ডাটাবেসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে সুতা আমদানির পরিমাণ ছিল ১৪ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২১ হাজার ১৯২ কোটি টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আরো বেড়ে ২৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এতে দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে এবং ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের টেকসই সক্ষমতা ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।

বিটিএমএ আরো বলেছে, বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াসহ প্রধান রফতানি বাজারে শুল্ক সুবিধা ধরে রাখতে কঠোর রুলস অব অরিজিন, প্রোডাক্ট স্পেসিফিক রুলস এবং ডাবল স্টেজ ট্রান্সফরমেশন সংক্রান্ত শর্ত পূরণ করতে হবে। এ জন্য শক্তিশালী দেশীয় সুতা ও বস্ত্রশিল্প গড়ে তোলা জরুরি। অন্যথায় তৈরি পোশাক খাতের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

চিঠিতে উত্থাপিত ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্ত পুনর্বহাল, দেশীয় সুতা ব্যবহারে তৈরি পোশাক রফতানিকারকদের জন্য বিদ্যমান ১ দশমিক ৫ শতাংশ নগদ সহায়তা বাড়িয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ, প্রাথমিক টেক্সটাইল খাতের করপোরেট আয়কর হার ১২ শতাংশ নির্ধারণ, পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবার (পিএসএফ), পিভিসি রেজিন ও পিইটি রেজিনের ওপর আরোপিত ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার, নগদ সহায়তার ওপর উৎসে কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার অথবা তা চূড়ান্ত কর হিসেবে গণ্য করা এবং আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ৪৬(৩)(ট)-এর কার্যক্রম থেকে রফতানিমুখী শিল্পের ইন্টার-কম্পানি ঋণকে অব্যাহতি দেয়া।

চিঠির শেষাংশে বিটিএমএ বলেছে, দেশীয় স্পিনিং ও প্রাথমিক টেক্সটাইল শিল্প দুর্বল হয়ে পড়লে তৈরি পোশাক খাত আমদানিকৃত সুতা ও কাঁচামালের ওপর আরো বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় বাড়বে, স্থানীয় মূল্য সংযোজন কমবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিপুল বিনিয়োগও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

এ পরিস্থিতিতে জাতীয় অর্থনীতি, রফতানি আয়, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং এলডিসি-উত্তর প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখতে উত্থাপিত প্রস্তাবগুলো জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়নের জন্য অর্থমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বিটিএমএ।