দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সামরিক প্রয়োজনে সমুদ্রসৈকতের পাশে নির্মাণ করা হয় কক্সবাজার বিমানবন্দর। এখন বেসামরিক প্রয়োজনে ব্যবহূত হচ্ছে। আর এটিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত ও সম্প্রসারণের জন্য মাস্টারপ্ল্যান করা হয়েছে। সে অনুযায়ী কাজও চলছে। তবে পর্যটন নগরীর এ বিমানবন্দরটি সমুদ্রের কোল ঘেঁষে হওয়ায় পরবর্তী সময়ে এর রানওয়ে ও অন্যান্য স্থাপনা সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। বিষয়টি জানিয়ে তারা বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়কে চিঠিও দিয়েছে। অনুরোধ জানানো হয়েছে প্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণের জন্য। এর পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নিতে গত জুলাইয়ে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে চিঠি দিয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো সেই চিঠিতে বলা হয়, বিমানবন্দরটিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত ও সম্প্রসারণের জন্য প্রকল্পের আওতায় ৬৮২ একর ভূমি বন্দোবস্ত করেছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন। সেই জমিতে বসবাসরত ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিহীন পরিবারকে পুনর্বাসনের জন্য জেলার সদর উপজেলার বাঁকখালী নদী ও মহেশখালী চ্যানেল ঘেঁষে খুরুস্কুল মৌজায় আশ্রয়ণ-২ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এজন্য বাঁকখালী নদীর ওপর কস্তুরীঘাটে ৫৯৫ মিটার পিসি বক্স গার্ডার ব্রিজসহ ২ দশমিক ৩০ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণ করছে এলজিইডি। মহেশখালী চ্যানেল পাড় ও বাঁকখালী নদীর তীরে স্লোপ প্রটেকশনসহ বাঁধ নির্মাণ, খাল পুনর্খনন, রেগুলেটর নির্মাণ ও মাটি ভরাট বা ভূমি উন্নয়নসহ অন্যান্য কাজ বাস্তবায়নের দায়িত্বে আছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। পাশাপাশি ২০২১ সালের আগস্টে সমুদ্রবক্ষে কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণের প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এজন্য আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের কাজও প্রক্রিয়াধীন। তবে বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপান্তরের প্রয়োজনীয় সেই ভূমি সমুদ্রের কোল ঘেঁষে হওয়ায় তা সমুদ্রগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে কিছু স্থান ভেঙে সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে। আর এটি চলতে থাকলে বিমানবন্দরের বিদ্যমান রানওয়েসহ অন্যান্য স্থাপনাও হুমকির মুখে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের স্বার্থে সেই ভূমি সমুদ্রগর্ভে বিলীন হওয়া রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।

এর আগে বিষয়টি জানিয়ে গত জুনে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেন বেবিচকের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এয়ার কমডোর সাদিকুর রহমান চৌধুরী। সেই চিঠিতে আরো বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী ২০১৭ সালের মে মাসে কক্সবাজার বিমানবন্দরে ই-৭৩৭-৮০০ বিমান উড্ডয়ন-অবতরণ উদ্বোধন করেন। ওই সময় বাংলাদেশকে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সেতুবন্ধ এবং এভিয়েশন সেক্টরে রিজিওনাল হাব হিসেবে গড়ে তোলার জন্য কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীতকরণসহ পূর্ণ লোডে সুপরিসর বিমান চলাচলের উপযোগী করতে নির্দেশ দেন। এরই ধারাবাহিকতায় বেবিচক প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ হাতে নেয়। ২০২১ সালে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কাজের উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা বলতেন, আমাদের ভৌগোলিক অবস্থানটা এমন যে বাংলাদেশ হবে প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড। অর্থাৎ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে একটা সেতুবন্ধ বাংলাদেশ রচনা করতে পারে। সেই সুযোগটা আমাদের রয়েছে। কারণ ইন্টারন্যাশনাল এয়াররুট বাংলাদেশের ওপর দিয়ে অর্থাৎ কক্সবাজারের ওপর দিয়ে যাচ্ছে। কাজেই এ পর্যটন নগরীকে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সেতুবন্ধ হিসেবে গড়ে তুলতে এখানে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রতিষ্ঠা করা তার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল।

জানতে চাইলে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মফিদুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিকে রূপান্তর করতে যে ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে, সেটি সমুদ্রের কোল ঘেঁষে। ফলে ওই ভূমি সমুদ্রগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে কিছু স্থানে ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে মূল অবকাঠামো হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এজন্য কক্সবাজার বিমানবন্দর এলাকার ভাঙনপ্রবণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে তা রক্ষায় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে।

এদিকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির গতকালের বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। জানতে চাইলে কমিটির সভাপতি র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী জানান, কমিটি কক্সবাজার বিমানবন্দর এলাকার ভাঙনপ্রবণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে তা রক্ষায় জেলা প্রশাসন, সিভিল এভিয়েশন অথরিটি ও মন্ত্রণালয়কে সমন্বিত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সুপারিশ করেছে।