প্লাস্টিক, মেলামাইন, স্টিল ও সিলভারের তৈরি সামগ্রীর ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে জয়পুরহাটে মৃৎশিল্প এখন বিলুপ্তির পথে। একসময় গ্রামবাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে রান্নাবান্না, খাওয়া-দাওয়া ও অতিথি আপ্যায়ন, আলোর ব্যবস্থাসহ প্রায় সব কাজেই ব্যবহার হতো মাটির তৈরি সৌখিন জিনিসপত্র। দামে সহজলভ্য ও স্বাস্থ্যসম্মত হওয়ায় সব পরিবারেই ব্যবহার হতো মাটির তৈরি ওইসব পাত্র।

জেলার ক্ষেতলাল উপজেলার দক্ষিণ হাটশহর একটি গ্রামেই মৃৎশিল্প পেশায় জড়িত আছে ৬০টি পরিবার। খড়, কাঠি আর মাটির সঙ্গে যুদ্ধ করে কুমাররা তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে ঝড়, বৃষ্টি ও প্রচণ্ড খরা উপেক্ষা করে এ পেশাকে ধরে রেখেছেন। শীতকালে খেজুরের রস সংগ্রহে মাটির হাঁড়ি, বাহারি চিতল, পুলি ও ভাঁপা পিঠাসহ হরেক রকমের পিঠা তৈরিতে খোলা, দধির পাতিল, টালি, ঘট, মুটকি, থালাবাসন ও অন্ধকার দূর করার মাটির বাতিসহ বিভিন্ন রকমের জিনিস তৈরি করতেন কুমাররা। ওইসব মাটির জিনিসপত্র অনেকে ভ্যানযোগে, আবার কেউ কেউ মাথায় নিয়ে বিক্রি করত। আর সে উপার্জনেই চলত কুমারদের পরিবার।

সরেজমিনে উপজেলার পালপাড়ায় গেলে রাধেশ্বর চন্দ্র পাল বলেন, আমার কোনো সম্পদ নেই। বর্তমানে অর্ধাহারে ও অনাহারে পরিবার-পরিজন নিয়ে জীবনযাপন করতে হয়। আবার পুঁজি না থাকায় এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় যাওয়াও সম্ভব হয় না।

সদর উপজেলার তেঘর বিশা গ্রামের এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত কালীপাল, সাধন পাল ও বিশা পালসহ একাধিক কারিগরের সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, একসময় বিনামূল্যে মাটি পাওয়া যেত। এখন তা পাওয়া যায় না। দুই বছর আগেও প্রতি গাড়ি মাটির দাম ছিল মাত্র ৪০০ টাকা। এখন ওই মাটিই ১ হাজার ২০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। তাও আবার অনেক সময় পাওয়া যায় না। তৈরীকৃত জিনিসগুলো পোড়াতে কাঠ ও খড়ের দাম বেড়েছে কয়েকগুণ বেশি। বাজারে সবকিছুর দাম বাড়লেও সে তুলনায় মাটির তৈরি জিনিসপত্রের দাম বাড়েনি। বাপ-দাদার পেশা ধরে আছি মাত্র। এসব জিনিসের মূল্যবৃদ্ধি এবং ব্যবহার বাড়লে এ শিল্প টিকে রাখা যাবে।

৬০ বছর বয়সী বিধবা কানন রানী বলেন, ১২ বছর বয়স থেকে প্রায় দীর্ঘ ৪৮ বছর এ পেশায় জড়িত। স্বামী মারা যাওয়ায় ছেলের সংসারে আছি। ছেলেদের এখনো এ পেশায় সাহায্য করে আসছি। মাটি সংগ্রহ করে কোনো জিনিস বানাতে খুব কষ্ট করতে হয়। একদিনে কোনো কিছুই তৈরি করা যায় না, সময় নিয়ে বানাতে হয় এবং সেগুলো শুকিয়ে পোড়ানো হয়। আগের মতো এখন আর মাটির জিনিসের চাহিদাও নেই তেমন। সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা, সহযোগিতা ও বাজারে মাটির তৈরি জিনিসের চাহিদা থাকলে হাজার বছরের ঐতিহ্য হিসেবে পেশাটি টিকে থাকতে পারবে। না হয় কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাবে ওইসব সৌখিন ও স্বাস্থ্যসম্মত মৃৎশিল্প।

জয়পুরহাট বিসিকের উপব্যবস্থাপক লিটন চন্দ্র ঘোষ বলেন, মৃৎ শিল্পের সঙ্গে জড়িত কেউ প্রশিক্ষণ ও কারো কোনো আর্থিক সহযোগিতা লাগলে বিসিকের পক্ষ থেকে করা হবে।