জনসেবামূলক স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে আয়করে হ্রাস চায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। বর্তমান আয়কর হার ৩০ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ করতে একটি চিঠিও জ্বালানি বিভাগ থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) পাঠানো হয়েছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির গতকালের বৈঠকে বিপিসির উৎসে কর প্রদান পদ্ধতি ও কর উপাত্ত সমন্বয় সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। জ্বালানি বিভাগ কমিটির সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে এ প্রতিবেদন উপস্থাপন করে।

আয়করে হ্রাস চেয়ে চলতি বছরের ১ জুলাই জ্বালানি বিভাগ থেকে এনবিআর চেয়ারম্যান বরাবর ওই চিঠি পাঠানো হয়। সেখানে বলা হয়, আয়কর কর্তৃপক্ষ বিপিসিকে আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪-এর ২(২০) ধারায় কোম্পানি ক্যাটাগরিতে চিহ্নিত করে আয়কর ধার্য করছে। ফলে ২০২০ সালের অর্থ আইন অনুসারে বিপিসির ২০২০-২১ করবর্ষের করহার ৩২ দশমিক ৫০ শতাংশ। বাজেটের অধিবেশনের প্রস্তাব অনুযায়ী ২০২১-২২ করবর্ষের জন্য সংস্থার করহার ৩০ শতাংশ।

জ্বালানি বিভাগ বলছে, ইনকাম ট্যাক্স অর্ডিন্যান্স ১৯৮৪-এর সেকশন ৪৪ ধারা অনুযায়ী পাওয়া ক্ষমতাবলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ ২০১৪ সালের ২৬ জুন একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। সেখানে দেখা যায়, জনসেবা কাজে নিয়োজিত কিছু স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ২৫ শতাংশ হারে আয়কর প্রদানের সুযোগ পাবে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতারসহ মোট ২৯টি প্রতিষ্ঠান এ কর হ্রাসের আওতায় পড়েছে। বিপিসিও এসব প্রতিষ্ঠানের মতো জনসেবাধর্মী বলে চিঠিতে উল্লেখ করেছে জ্বালানি বিভাগ। সংস্থাটি সারা দেশে সরকার নির্ধারিত মূল্যে জনগণের দোরগোড়ায় জ্বালানি তেল পৌঁছে দিচ্ছে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। বিপিসি প্রয়োজনে আমদানি মূল্যের চেয়ে কম মূল্যে জ্বালানি তেল বিক্রি করে। ফলে তারাও কর হ্রাসের সুবিধা ভোগ করতে পারে।

চিঠিতে আরো বলা হয়, ১৯৯৯-২০০০ থেকে ২০১৩-১৪ অর্থবছর পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও দেশে সে অনুযায়ী বাড়ানো হয়নি। ফলে বিপিসিকে ক্রমাগত লোকসান দিতে হয়েছে।

বিপিসি ১৯৭৬ সালের ৮৮ নং অধ্যাদেশবলে প্রতিষ্ঠিত একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। পরে ২০১৬ সালে এটি পরিচালনার জন্য আলাদা আইন করা হয়। বিপিসি আইন ২০১৬-এর ২১ ধারায় বিপিসির সব শ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারী জনগণের সেবক গণ্য হবেন বলে উল্লেখ রয়েছে। বিপিসি একটি জনসেবামূলক পাবলিক বডি হিসেবে দেশের সব এলাকার জনগণের দোরগোড়ায় একই মূল্যে জ্বালানি তেল পৌঁছে দেয়ার বিষয়টি যথাযথভাবে নিশ্চিত করার জন্য পেট্রোলিয়াম সেক্টরের বিভিন্ন কোম্পানি জনস্বার্থে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে।

জ্বালানি বিভাগের প্রস্তাব অনুযায়ী বিপিসিকে জনসেবামূলক স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করতে আয়কর হার হ্রাস করে ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চিঠিতে অনুরোধ করা হয়।

এ বিষয়ে কমিটির সভাপতি ওয়াসিকা আয়শা খান বণিক বার্তাকে জানান, বিপিসির উৎসে কর প্রদান পদ্ধতি, লাভ-ক্ষতি নিয়ে সংসদীয় কমিটির বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে বিপিসি জানিয়েছে, জনসেবা কাজে নিয়োজিত স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে তারা কম হারে আয়কর দেয়ার তালিকাভুক্ত। আমরা মন্ত্রণালয়কে এনবিআরের সঙ্গে বসে বিষয়টি সুরাহা করার জন্য বলেছি।

সংসদীয় কমিটির বৈঠকে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বিপিসির মাধ্যমে আমদানি করা জ্বালানি তেলের জন্য আমদানি পর্যায়ে অগ্রিম আয়কর, ডিউটি, ভ্যাট ও অন্যান্য অগ্রিম কর পরিশোধ করতে হয়। বর্তমানে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের ট্যারিফ ভ্যালুর ওপর ২ শতাংশ হারে অগ্রিম আয়কর, ১০ শতাংশ হারে ডিউটি এবং ট্যারিফ ভ্যালু ও ডিউটির সমষ্টির ওপর ১৫ শতাংশ হারে উৎসে ভ্যাট ও ৫ শতাংশ হারে অগ্রিম কর পরিশোধ করতে হয়। এছাড়া অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ট্যারিফ ভ্যালুর ওপর ২ শতাংশ হারে অগ্রিম আয়কর, ৫ শতাংশ হারে ডিউটি এবং ট্যারিফ ভ্যালু ও ডিউটির সমষ্টির ওপর ১৫ শতাংশ হারে উৎসে ভ্যাট পরিশোধ করতে হয়।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, প্রতি বছর আর্থিক বিবরণী সম্পন্ন করে সংশ্লিষ্ট কর সার্কেলে রিটার্ন জমা দিতে হয়। বর্তমানে চট্টগ্রামের সার্কেল ৫২-এর কর অঞ্চল-৩-এ রিটার্ন দাখিল করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষ বিপিসিকে অতালিকাভুক্ত কোম্পানি হিসেবে আয়কর অ্যাসেসমেন্ট করে। ২০২১-২২ করবর্ষের জন্য অতালিকাভুক্ত কোম্পানির আয়কর হার ৩০ শতাংশ। ওই বছরে সংশ্লিষ্ট নির্ণীত আয়কর থেকে অগ্রিম আয়কর বাদ দিয়ে অবশিষ্ট প্রদেয় আয়কর নির্ণয় করা হয়, যা আয়কর রিটার্নের সঙ্গে প্রদান করতে হয়। অন্যদিকে অগ্রিম আয়কর নির্ণীত আয়কর অপেক্ষা বেশি দেয়া থাকলে তা বিপিসিকে ফেরত দেয়ার কথা। কিন্তু আয়কর কর্তৃপক্ষ বিপিসির আমদানিজনিত লাভ-ক্ষতিকে ১৯৮৪ সালের আয়কর অধ্যাদেশের ৮২ (সি) ধারা অনুযায়ী আয়কর অ্যাসেসমেন্ট করে। ফলে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত উভয় ধরনের জ্বালানি তেল আমদানি পর্যায়ে দেয়া অগ্রিম আয়করকে সর্বনিম্ন আয়কর হিসেবে বিবেচনা করে। তাই আমদানি পর্যায়ে দেয়া অতিরিক্ত অগ্রিম আয়কর সমন্বয়ের সুযোগ থাকছে না। এতে কোনো কোনো বছর সামান্য মুনাফা বা ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও বিপিসিকে আয়কর দিতে হচ্ছে।