বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা এক দফা দাবির অসহযোগ আন্দোলন ঘিরে বরিশাল নগরী রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। আওয়ামী লীগ, পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে ১ জন নিহত ও গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন ২০ জন।

বেলা ১টার দিকে নগরীর করিম কুটির এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের প্রতিহত করার চেষ্টা চালালে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় বরিশাল। এ সময় পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীমের বাসায় হামলা ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটে।

পরে বেলা দেড়টায় নগরীর করিম কুটির এলাকায় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের আরেক দফা সংঘর্ষ হয়। এ সময় আওয়ামী লীগ নেতা টুটুলকে কুপিয়ে ও ইট দিয়ে আঘাত করে জখম করে আন্দোলনকারীরা। পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

দুপুর ২টার দিকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ও মেডিকেল কলেজের স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সাধারণ সম্পাদক ডা. এ এস এম সায়েম সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

দুপুর ১টার দিকে নগরের সদর রোডস্থ বিএনপির এ দলীয় কার্যালয়টিতে হামলা চালানো হয়। দলীয় কার্যালয়ে ও কার্যালয়ের সামনে থাকা দুটি মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। তবে এ সময় দলীয় কার্যালয়টি বন্ধ থাকায় কেউ হতাহত হয়নি বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।

তারা জানান, হঠাৎ দুপুর ১টার দিকে নগরীর সদর রোডস্থ বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে কয়েকশ ছাত্রলীগের নেতাকর্মী জড়ো হন। এ সময় তারা দলীয় কার্যালয়ে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করেন এবং পিটিয়ে দরজা-জানালার গ্লাস ভাংচুর করেন। পরে তারা সেখানে থাকা বিএনপির নেতাকর্মীদের কিছু ব্যানার-পোস্টার ছিঁড়ে এবং দুটি মোটরসাইকেল ভাংচুর করে তাতে অগ্নিসংযোগ করেন। পরে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সদর রোডে মিছিল করেন।

এর আগে সকাল থেকেই ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কসহ বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা। রোববার (৪ আগস্ট) দুপুর ১২টার পর থেকে মহাসড়কে আগুন দিয়ে হাজার হাজার ছাত্র-জনতা রাস্তায় নেমে পড়েন। মহাসড়কের নথুল্লাবাদ থেকে চৌমাথা পর্যন্ত আন্দোলনকারীদের দখলে চলে গেছে।

বেলা পৌনে ১টার দিকে চৌমাথা থেকে নবগ্রাম সড়কে ঢুকে দখল করে নেন আন্দোলনকারীরা। তারা নবগ্রাম সড়কে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী কর্নেল অব. জাহিদ ফারুক শামীমের মমতাজ ভিলায় ব্যাপক ভাঙচুর চালান। তার বাসার গেটের মধ্যে এবং সামনের সড়কে অন্তত ১৫ থেকে ২০টি মোটরসাইকেলে আগুন দেয়া হয়েছে। এতে সেখানে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এর আগে বেলা ১১টা থেকে চৌমাথা-নবগ্রাম সড়কে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ সশস্ত্র অবস্থান করছিল। এ সময় যানবাহন থেকে নামিয়ে দেয়া হয় সাধারণ মানুষকে। মারধর করা হয় কিছু ছাত্রকে। তবে ছাত্র আন্দোলনকারীদের স্রোতে সরে যান ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা। এ কারণে বেলা সাড়ে ১১টার পর আর মহাসড়কে যান চলাচল করছে না।

অন্যদিকে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নগরীর প্রাণকেন্দ্র সদর রোডে অবস্থান করছে। তারা অশ্বিনী কুমার হলসংলগ্ন বিএনপি অফিসে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। সোহেল চত্ত্বরে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে অবস্থান করছে ক্ষমতাসীনরা। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত নবগ্রাম সড়কে প্রতিমন্ত্রীর বাসার কাছাকাছি পুলিশ অবস্থান নিয়ে মুহুর্মুহু সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করছে। একই খবর পাওযা গেছে বরিশালের নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকা থেকে। সেখানে পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ চলছে।

এদিকে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কয়েকশ যুবক মন্ত্রীর বাসার সামনে হামলা চালায়। এ সময় তারা মন্ত্রীর বাসার সামনে থাকা সব ব্যানার-ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলে এবং মোটরসাইকেল ভাংচুর করে তা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। পরে হামলাকারীরা মন্ত্রীসহ আশপাশের সবার বাসার ভেতরে ঢুকেও হামলা চালিয়েছে।

নবগ্রাম রোডের ডিভাইডারে থাকা পাইপ উঠিয়ে তা দিয়ে সাধারণ মানুষ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের ধাওয়া দেয় হামলাকারীরা। এতে গোটা এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় যে ছবি তুলতে গেছে তাকেই মারধর করেছে এবং হাতে থাকা মোবাইল ভাংচুর করেছে। আন্দোলনকারীরা কাউকে ভিডিও-ছবি তুলতে দেয়নি। আর হামলার সময় মন্ত্রীর বাসার আশপাশে কোনো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ছিল না।