গত অর্থবছরে জংশনটি থেকে ১১ লাখের বেশি যাত্রী ভ্রমণ করে রেলকে প্রায় ২৪ কোটি টাকা রাজস্ব দিলেও সেবার সংকট কাটেনি। ফলে আয় বাড়লেও সেবার মান নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।

যশোর রেলওয়ে জংশন সূত্র থেকে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ জংশন থেকে মোট ১১ লাখ ৩৫ হাজার ৫৯৬ জন যাত্রী ভ্রমণ করেছে। এর মাধ্যমে রাজস্ব আদায় হয়েছে ২৩ কোটি ৯৫ লাখ ৮৩ হাজার ২৭৫ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ জংশন থেকে মোট ৮ লাখ ৭৬ হাজার ৭৩০ জন যাত্রী ভ্রমণ করেছে। এ যাত্রীদের টিকিটের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় হয়েছে ১৮ কোটি ২৫ লাখ ১৯ হাজার ৪২৯ টাকা। অর্থাৎ বিগত অর্থবছরে যশোর জংশন থেকে যাত্রী বেড়েছে প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার জন। রাজস্ব আয় বেড়েছে ৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। যাত্রী বৃদ্ধির হার প্রায় ৩০ শতাংশ ও রাজস্ব আয় বৃদ্ধির হার ৩১ শতাংশ।

তবে ট্রেনের যাত্রী বাড়লেও রেলসেবার মান নিয়ে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। যাত্রীদের মতে, বিভিন্ন সমস্যা ও সংকটের কারণে ট্রেন পিছিয়ে রয়েছে। এগুলো দূর করা গেলে রেলওয়ের যাত্রীসেবার মান বাড়বে। সেবার মান বাড়লে যাত্রী যেমন বাড়বে, তেমনি বাড়বে রাজস্ব আয়।

যাত্রীদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—ট্রেনের সময়সূচি মেনে চলা, ক্রসিংয়ের সময় সংখ্যা কমিয়ে আনা, রেলস্টেশনে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং স্টেশনের বিশ্রামাগার, টয়লেটসহ অন্যান্য সুবিধা বাড়ানো। তাদের অভিযোগ, যশোর-খুলনা রুটে ট্রেনের সবচেয়ে বড় সমস্যা ক্রসিং। সিঙ্গেল লাইন হওয়ায় ক্রসিং পড়লেই দীর্ঘ সময় স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। ট্রেনে দায়িত্বরত পুলিশ যাত্রীদের নিরাপত্তা চেয়ে নানা অজুহাতে টাকা তোলায় ব্যস্ত থাকে। বিভিন্ন মালামাল, গবাদিপশু, গ্যাসের সিলিন্ডার—এসব বহনকারীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করাই যেন তাদের দায়িত্ব। এছাড়া প্লাটফর্মের নিরাপত্তা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। এমনকি যশোর স্টেশনের এ প্লাটফর্মে হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাও ঘটেছে। ছিনতাই তো সাধারণ ঘটনা।

নিরাপত্তার বিষয়ে যশোর রেলওয়ে ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই মো. লিটন মিয়া বলেন, ‘ট্রেনের অভ্যন্তরে নিরাপত্তার জন্য আলাদা পুলিশ রয়েছে। এখানে মোট ১৫ জন সদস্য রয়েছেন। এদের মধ্যে দুজন বদলি হয়ে গেছেন। আর চারজন করে পালাক্রমে ডিউটি করি। এত বড় স্টেশনে মাত্র চারজন পুলিশ দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা খুবই কঠিন। ছিনতাইকারীরা সাধারণত ট্রেন চলতে শুরু করলে প্লাটফর্ম এলাকার বাইরে গিয়ে ব্যাগ টেনে নিয়ে পালিয়ে যায়। ফলে অধিকাংশ সময় তাদের শনাক্ত বা আটক করা কঠিন হয়ে পড়ে। এজন্য স্টেশনে পুলিশ ফোর্স বাড়ানো প্রয়োজন।’

বৃহত্তর যশোর রেল যোগাযোগ উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির সদস্য সচিব প্রকৌশলী রুহুল আমিন বণিক বার্তাকে জানান, রেলওয়ের যাত্রীসেবার মান বৃদ্ধি ও রাজস্ব আয় আরো বাড়াতে বেনাপোল বা দর্শনা সীমান্ত থেকে যশোর-ঢাকা রুটে একটি প্রভাতীসহ তিনটি নতুন আন্তঃনগর ও নিয়মিত কমিউটার ট্রেন চালু করতে হবে। এছাড়া কিছু আন্তঃনগর ট্রেনে পর্যাপ্ত সাধারণ বগি যুক্ত করা, দর্শনা-খুলনা ও বেনাপোল-যশোর রুটে দ্রুত ডাবল লাইন স্থাপন এবং সিঙ্গিয়া স্টেশনে ‘রেল কনটেইনার টার্মিনাল’ চালু করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘এসব ন্যায্য দাবি আদায়ে বৃহত্তর যশোর রেল যোগাযোগ উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটি ২০২৩ সাল থেকে শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করে যাচ্ছে।’

যশোর রেলওয়ে জংশনের স্টেশনমাস্টার সাইদুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত এক বছরে যশোর জংশনে যাত্রী ও রাজস্ব আয়ের পরিমাণ অনেক বেড়েছে। তবে টিকিটবিহীন যাত্রীর সংখ্যা কমানো গেলে এ হার আরো বাড়বে।’

জনবল সংকটের কারণে অনেক সময় ঠিকমতো টিকিট চেকিং করা সম্ভব হয় না বলে তিনি স্বীকার করেন। পাশাপাশি যাত্রীসেবার মান আরো বাড়ানোর প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন। স্টেশনের বিশ্রামাগার ও ওয়াশরুম বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে সাইদুজ্জামান বলেন, ‘এ স্টেশন থেকে গড়ে প্রতিদিন পাঁচ-ছয় হাজার যাত্রী ভ্রমণ করে। যাত্রীদের জন্য অন্তত ছয়টি ওয়াশরুম দরকার। এছাড়া পাশের রেলবাজারেও কোনো পাবলিক টয়লেট নেই। ফলে এ বাজারে কেনাকাটা করতে আসা মানুষের চাপও স্টেশনের টয়লেটের ওপর পড়ে। বাজারের কোনো ডাস্টবিন না থাকায় স্টেশনের পার্কিং এলাকায় ময়লার স্তূপ জমে থাকে। এ সংকটেরও সমাধান জরুরি।’