ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন স্থানে গত ছয়দিনে অন্তত ১৩টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা ও গণহত্যার অভিযোগে মামলা হয়েছে ১১টি, একটি হয়েছে অপহরণের অভিযোগে। এসব মামলায় ক্ষমতাচ্যুত সরকারের এমপি-মন্ত্রী ও আমলাদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ এবং তাদের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীকেও আসামি করা হয়েছে।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হন শেখ হাসিনা। বর্তমানে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। ক্ষমতাচ্যুত সরকারের যেসব ব্যক্তি দেশে আছেন, তাদের অনেকেই এরই মধ্যে বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন। এ তালিকায় দ্বাদশ সংসদের ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এবং সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানও রয়েছেন।

শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধ গতকাল চারটি মামলা হয়। একটি মামলা হয় ২০১৩ সালে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে গণহত্যা চালানোর অভিযোগে। এতে শেখ হাসিনাসহ ৩৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। বাংলাদেশ পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান বাবুল সরদার চাখারী বাদী হয়ে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকী-আল-ফারাবীর আদালতে এ মামলা করেন। আদালত মামলাটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য মতিঝিল থানার ওসিকে নির্দেশ দিয়েছেন। 

মামলায় বাদীর অভিযোগ, ১৩ দফা দাবিতে ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলাম মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান নেয়। আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে রাত ১১টার দিকে বিদ্যুৎ লাইন বন্ধ করে দেন। এরপর শাপলা চত্বরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালিয়ে মাদ্রাসাছাত্র ও পথচারীদের ওপর গণহত্যা চালায়। পরে লাশ সিটি করপোরেশনের গাড়িতে করে নিয়ে গুম করা হয়। নিহত ব্যক্তিদের পরিবার থানায় মামলা করতে গেলেও নেয়া হয়নি।

গতকাল শেখ হাসিনাসহ ৪০ জনের নামে একটি মামলা হয় রংপুরে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহত আব্দুল্লাহ আল তাহিরের বাবা মো. আব্দুর রহমান বাদী হয়ে রংপুর মেট্রোপলিটন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এ মামলা করেন। আসামির তালিকায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের নামও রয়েছে। 

শেখ হাসিনা ও ওবায়দুল কাদেরসহ ১২৮ জনের বিরুদ্ধে গতকাল আরেকটি হত্যা মামলা হয় জয়পুরহাটে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহত শিক্ষার্থী নজিবুল সরকার বিশালের বাবা মজিদুল সরকার এ মামলা করেন। জয়পুরহাট চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত মামলাটি এজাহার হিসেবে নথিভুক্ত করতে জয়পুরহাট সদর থানার ওসিকে নির্দেশ দিয়েছেন। 

গতকাল মামলা হয় কবি নজরুল সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ইকরাম হোসেন কাউসার ও ওমর ফারুক হত্যার অভিযোগে। এতে শেখ হাসিনাসহ ১২ জনকে আসামি করা হয়েছে।

ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে প্রথম মামলা হয় ১৩ আগস্ট। মুদি দোকানি আবু সায়েদকে হত্যার অভিযোগে দায়েরকৃত এ মামলায় আসামি করা হয় সাতজনকে। 

দুটি মামলা হয় ১৪ আগস্ট। এর একটি হয় হত্যার অভিযোগে, আরেকটি অপহরণের। 

১৫ আগস্ট শেখ হাসিনার নামে মামলা হয় তিনটি। একটি মামলা হয় রাজধানীর মোহাম্মদপুরে জোবাইদ হোসেন ইমন নামের এক শিশুকে হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালিয়ে হত্যার অভিযোগে। একটি মামলা হয় আগারগাঁওয়ে পুলিশের গুলিতে অটোরিকশার চালক সাহাবুদ্দিনের মৃত্যুর ঘটনায়। আরেকটি মামলা হয় মিরপুর সিফাত নামের এক শিশুকে হত্যার অভিযোগে।

১৬ আগস্ট শেখ হাসিনার নামে হত্যা মামলা হয় বগুড়ায়। শিক্ষক সেলিম হোসেনকে হত্যার অভিযোগে সদর থানায় এ মামলা হয়। একই দিন চট্টগ্রামে শেখ হাসিনা ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়। কলেজছাত্র তানভীর ছিদ্দিকী হত্যার ঘটনায় তার চাচা মোহাম্মদ পারভেজ এ মামলা করেন। ১৭ আগস্ট শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমান ও তার ভাই সেলিম ওসমানসহ ৪৮ জনের নামে হত্যা মামলা হয় নারায়ণগঞ্জে। নিহত আবুল হাসানের ভাই আবুল বাশার বাদী হয়ে সদর মডেল থানায় এ মামলা করেন।

(প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন বণিক বার্তার রংপুর, জয়পুরহাট ও নারায়ণগঞ্জের প্রতিনিধি)