দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে ভারতে স্বর্ণ চোরাচালান বেড়েই চলেছে। বিদায়ী বছরে এ চোরাচালান ভয়াবহ রূপ পেয়েছে। সক্রিয় ৫০টিরও বেশি চক্র সীমান্তের ১৮৪ কিলোমিটারের ২০টিরও বেশি স্থান ব্যবহার করে চালিয়ে যাচ্ছে চোরাচালান। বিভিন্ন মহলের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সীমান্ত-ভৌগোলিক অবস্থা, অব্যাহত চাহিদা, সহজ বহন সুবিধা, ভালো বাজার সুবিধা ও দ্রুত বিক্রয় নিশ্চয়তার কারণে দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত হয়ে উঠেছে স্বর্ণ পাচারের সবচেয়ে নিরাপদ রুট।
দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে কর্মরত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কর্মকর্তারা বলছেন, বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার পর গত বছর বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ চোরাচালান আটক করা হয়েছে।
বিজিবি সূত্র জানায়, খুলনা বিভাগের ১০ জেলার মধ্যে সীমান্ত এলাকা রয়েছে মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, যশোর ও সাতক্ষীরায়। এক বছরে এসব জেলার সীমান্ত দিয়ে পাচারকালে প্রায় ১২৯ কোটি টাকার স্বর্ণ জব্দ করেছে বিজিবি। জব্দকৃত স্বর্ণের পরিমাণ ১৬০ কেজি। ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ এ স্বর্ণ জব্দ করা হয়।
২০২১ সালে উদ্ধার হয় ১৩ কেজি ১৪৩ গ্রাম স্বর্ণ। যার মূল্য ৯ কোটি ৫ লাখ ৬ হাজার টাকা। ২০২০ সালে বিজিবি ৪১ কেজি ৭২২ গ্রাম স্বর্ণ জব্দ করে, যার মূল্য ২৭ কোটি ৯৩ লাখ ৮২ হাজার ৩৪০ টাকা।
২০২২ সালে স্বর্ণ জব্দের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে যশোর বিজিবি ৪৯ ব্যাটালিয়ন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ২১ বিজিবি খুলনা ব্যাটালিয়ন।
যশোর ৪৯ ব্যাটালিয়নের জব্দ স্বর্ণের পরিমাণ ৭৯ কেজি ৪৭৩ গ্রাম। যার বাজারমূল্য ৬৬ কোটি ৮৭ লাখ ৩৬ হাজার ৭০০ টাকা। অন্যদিকে ২১ ব্যাটালিয়নের জব্দ স্বর্ণের পরিমাণ ৪৬ কেজি ৭৩৭ গ্রাম। যার মূল্য প্রায় ৩২ কোটি ২৯ লাখ ৮২ হাজার ১৭৮ টাকা।
সর্বশেষ ১৭ জানুয়ারি যশোরের শার্শা উপজেলার অগ্রভুলাট সীমান্ত থেকে ৭ কেজি ৩৩৭ গ্রাম ওজনের ৬৩টি স্বর্ণের বারসহ একজনকে আটক করে বিজিবি।
বিজিবি জানিয়েছে, আটক স্বর্ণের দাম আনুমানিক ৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এ সময়ের মধ্যে বিজিবির হাতে আটক হয় ৪২ পাচারকারী। এর মধ্যে যশোর বিজিবি আটক করে ১৬ জন এবং খুলনা বিজিবি আটক করে ১৮ পাচারকারীকে।
এ সময়ের মধ্যে বড় স্বর্ণের চালান জব্দ করা হয় গত ১ সেপ্টেম্বর শার্শার সাতমাইল এলাকায়। সেখানে অভিযান চালিয়ে ৮ কোটি টাকা দামের ৯ কেজি ৭৫৮ গ্রাম ওজনের ৩০টি স্বর্ণের
বারসহ দুজনকে আটক করা হয়। গত ৭ নভেম্বর শার্শার গোড়পাড়ার আমতলা থেকে গোড়পাড়া
ফাঁড়ি পুলিশ অভিযান চালিয়ে সাড়ে ৫ কোটি টাকার ৭ কেজি ২৫ গ্রাম ওজনের ৬২টি স্বর্ণের
বারসহ নাইম হোসেন ও আজহারুল ইসলামসহ দুজনকে আটক করে।
সম্প্রতি সীমান্ত এলাকায় নানা প্রক্রিয়ায় অনুসন্ধান চালিয়ে যশোর, চুয়াডাঙ্গা, খুলনা ও সাতক্ষীরার কয়েকটি বর্ডার পয়েন্টে ৫০টির মতো স্বর্ণ চোরাকারবারি চক্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সক্রিয় রয়েছে ২০টিরও বেশি। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এ চোরাচালান চক্রগুলো পরিচালিত হয়।
একাধিক সূত্র জানায়, একেকটি চালান যখন ভারতে পাচার হয় তার পেছনে সক্রিয় থাকে প্রায় ৩০-৪০ জন কর্মী। এদের মধ্যে রয়েছে প্রথম বাহক, দ্বিতীয় বাহক হয়ে চতুর্থ বাহক পর্যন্ত, কেউ লাইনম্যান, কেউ ইনফরমার।
খুলনা ২১ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তানভীর রহমান জানান, বিজিবি সর্বোচ্চ সজাগ ও সতর্ক অবস্থানে থাকে। সাম্প্রতিক স্বর্ণ পাচার বেড়ে গেছে কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন পরিস্থিতি সে রকমই। তিনি জানান, এসব প্রতিরোধে বিজিবি আরো নতুন স্ট্র্যাটেজি নিচ্ছে।
যশোর ৪৯ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাহেদ মিনহাজ সিদ্দিকী বলেন, ‘তারা সীমান্তে গত বছর অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ জব্দ করেছেন। সীমান্তজুড়ে চোরাচালান রোধে তত্পরতা বাড়ানো হয়েছে।’
৫৮ বিজিবি ঝিনাইদহ মহেশপুর ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাহীন আজাদ বলেন, ‘বিজিবির সব চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।’
বিজিবির দক্ষিণ-পশ্চিম রিজিয়ন কমান্ডার অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কেএম আজাদ বলেন, ‘বিজিবি সীমান্তে আগের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয়। চোরাচালানের পেছনের ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার চেষ্ট চলছে। তাদের তালিকা আপডেট করা হচ্ছে। বিজিবিকে এসব চোরাকারবারি
ধরেই কাজ শেষ করতে হয়।’
খুলনা ২১ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তানভীর রহমান বলেন, ‘বিজিবি স্বর্ণ জব্দ করে ও আসামির বিরুদ্ধে মামলা দেয়। এরপর এসব মামলার তদন্তভার পুলিশের ওপর বর্তায়। নেপথ্যে থাকা চোরাকারবারিকে সামনে আনার দায়িত্ব অন্য সংস্থার।’
এ নিয়ে একাধিক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে কেউ মুখ খুলতে চাননি। তারা জানান, এটা বিজিবি করে থাকে। তারাই মামলা দেন। পুলিশ শুধু চার্জশিট প্রস্তুত করে আদালতে জমা দেয়।
যশোরের আলোচিত সাত কেজি স্বর্ণ চোরাচালান মামলার তদন্ত করছেন শার্শা থানার এসআই সুমন সরকার। তিনি জানান, ওই সিন্ডিকেটে জড়িত অনেকের নাম এসেছে, যা যাচাই-বাছাই চলছে।










