অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র সংস্কারে অনেক কমিশন গঠন হয়েছে। শিক্ষা খাতে কোনো পরিবর্তনের প্রত্যাশা ছিল কি?

জুলাইয়ের অভ্যুত্থান ছিল মূলত তরুণদের দ্বারা পরিচালিত। তরুণদের ক্ষোভের বড় একটি কারণ ছিল এ শিক্ষা ব্যবস্থায় পাস করার পর তাদের জন্য পর্যাপ্ত চাকরির সুযোগ না থাকা। তাদের অর্জিত শিক্ষা যে বিশ্বমানের নয়, এ উপলব্ধি থেকেই তাদের মধ্যে বঞ্চনার বোধ তৈরি হয়েছিল। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা ছিল যে শিক্ষা খাতে বড় ধরনের একটি সংস্কার আসবে। আমরা যারা দীর্ঘকাল ধরে শিক্ষাঙ্গনে আছি, তারা আশা করেছিলাম ভারত বা পাকিস্তানের মতো একটি স্বাধীন ‘হায়ার এডুকেশন কমিশন’ গঠন করা হবে, যা শিক্ষার মান ও গবেষণাকে একটি স্ট্রাকচারড মডেলে এগিয়ে নেবে। কিন্তু সরকার এখনো সেই উদ্যোগ নেয়নি। বর্তমানে ইউজিসি বা অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের মতো যেসব কমিশন আছে, তারা ‘ফ্যাসিলিটেশন’ বা সহায়কের চেয়ে ‘কন্ট্রোল’ বা প্রশাসনিক খবরদারিতে বেশি ব্যস্ত। ফলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এখনো আসেনি। তবে ভবিষ্যতে আমাদের এ শিক্ষা ব্যবস্থা রিভিজিট করতেই হবে।

গত দেড় দশকে শিক্ষার মান নিয়ে বড় প্রশ্ন ছিল, এখনো সে অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। তাহলে এ সময়ের প্রজন্ম বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’-এর আসলে কী অবস্থা?

সত্য বলতে আমরা আমাদের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুবিধা নিতে পারিনি। প্রতি বছর প্রায় ১০ থেকে ১৫ লাখ শিক্ষার্থী দ্বাদশ শ্রেণী শেষ করে বের হয়। কিন্তু আমরা তাদের উচ্চশিক্ষার সঠিক ধারায় আনতে পারছি না। আর যাদের আনছি, তাদেরকেও বৈশ্বিক মানের দক্ষতা বা জ্ঞান দিতে পারছি না। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, আমাদের দ্বাদশ শ্রেণীর একজন শিক্ষার্থীর দক্ষতা বৈশ্বিক মানের তুলনায় অনেক নিচের স্তরের। আমরা প্রায়ই বলি যে আমাদের ছেলে-মেয়েরা বিদেশে গিয়ে খুব ভালো করছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো এরা মূলত ‘সেলফ-মেড’। প্রতিষ্ঠান বা সিস্টেমের কারণে তারা ভালো করছে না, বরং নিজেদের ব্যক্তিগত স্পৃহা ও চেষ্টায় তারা জ্ঞান অর্জন করছে। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাঠামোতে স্বাধীনতা, নমনীয়তা ও ফোকাসের অভাব রয়েছে। এ সমস্যার শুরুটা হয় একদম প্রাথমিক পর্যায় থেকে। আমরা শিশুদের নৈতিকতা, মূল্যবোধ বা খেলাধুলার মাধ্যমে শেখার সুযোগ না দিয়ে মুখস্থবিদ্যার ওপর জোর দিচ্ছি। ফলে জ্ঞানচর্চার জায়গাটিতে আমরা একটি ভুল ধারণার ওপর বসে আছি এবং একটি মানহীন গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছি।

বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার মূল সংকটের জায়গাটি কোথায়?

শিক্ষা ব্যবস্থার সংকটকে কোনো একটি নির্দিষ্ট উপাদানের ওপর চাপানো যাবে না। এটি একটি সামগ্রিক ইকোসিস্টেমের ব্যর্থতা। প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সব স্তরেই যোগ্য ও উপযুক্ত শিক্ষক নিয়োগে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। অযোগ্য শিক্ষক জাতির জন্য বোঝা বা ‘বারডেন’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা শিক্ষার গুণগত মানের চেয়ে সংখ্যার দিকে বেশি নজর দিয়েছি। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এখন মূলত সার্টিফিকেট ও ডিগ্রি অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে শিক্ষার্থীরা বিশ্লেষণধর্মী দক্ষতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অর্জন করতে পারছে না।

আমরা মাদ্রাসা শিক্ষাকে মূলধারার সঙ্গে সমন্বিত করতে পারিনি। সরকার মাদ্রাসা শিক্ষাকে ম্যাট্রিক বা ইন্টারমিডিয়েটের সমতুল্য করেছে ঠিকই, কিন্তু সেই মানের জ্ঞান অর্জনের নিশ্চয়তা দেয়নি। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি ভাষা (ইংরেজি), গণিত বা বিজ্ঞান শিখিয়ে যদি দুটোর সমন্বয় করা যেত, তবে শিক্ষার্থীরা অনেক বেশি উপকৃত হতো। এ স্ট্রাকচারাল রিভিজিট বা সংস্কার করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি।

বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ। আমাদের ধারণা, কেবল জীববিজ্ঞান পড়লে ডাক্তার আর গণিত পড়লে ইঞ্জিনিয়ার হওয়া যায়। অথচ উন্নত বিশ্বে লিবারেল আর্টসের শিক্ষার্থীরাও মেডিকেলে পড়ার সুযোগ পায়। শিক্ষার এ প্রথাগত দেয়াল ভেঙে জ্ঞান অর্জনের পথকে সবার জন্য উন্মুক্ত করা প্রয়োজন। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এখন পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর। সিনহুয়া ইউনিভার্সিটির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ডাক্তার হওয়ার আগে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। একইভাবে একজন ইঞ্জিনিয়ারের জন্য ড্রামা বা মানবিক বিদ্যা শেখা জরুরি, কারণ আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ সব ক্ষেত্রেই বিদ্যমান। শিক্ষার প্রতিটি স্তর হওয়া উচিত আন্তঃসম্পর্কিত। কেবল নির্দিষ্ট বিষয়ে নম্বর দিয়ে মেধা যাচাই না করে, শিক্ষার্থীদের এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে যাওয়ার স্বাধীনতা দিতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এনে একে আরো উন্মুক্ত করতে হবে, যাতে যেকোনো ব্যাকগ্রাউন্ডের মেধাবী শিক্ষার্থী তার পছন্দের উচ্চতর বিদ্যায় অবদান রাখতে পারে।

শিক্ষা খাতের বিভিন্ন সংকট থেকে উত্তরণে বাজেটের গুরুত্ব কতটুকু?

বাজেটের ক্ষেত্রে আমরা মারাত্মকভাবে পিছিয়ে আছি। বৈশ্বিক মানদণ্ডে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৬ শতাংশ খরচ করার কথা থাকলেও আমরা মাত্র ২ থেকে ২ দশমিক ৫ শতাংশ করছি। এর জন্য ২০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নিতে হবে। আগামী চারটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ধারাবাহিকভাবে বাজেট বৃদ্ধি এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করতে হবে। বাজেট একবার বাড়িয়ে আবার কমিয়ে ফেললে কোনো ফল আসবে না। আমরা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের ওপরে আছি। আগামী ৩০ থেকে ৪০ বছর আমাদের অবশ্যই এ জায়গাটা গুরুত্ব দিতে হবে। এ বিশাল জনশক্তিকে যদি আমরা বৈশ্বিক মানের শিক্ষা দিতে না পারি, তবে তারা হাইলি ভ্যালুড হওয়ার পরিবর্তে সমাজের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।

সমাজের বিভিন্ন অস্থিরতা কি গত দুই দশকের শিক্ষা ব্যবস্থার ফল? এ বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

গত দুই দশকে আমাদের জাতির পুরো চিন্তাধারা এবং মনস্তত্ত্বকে ভিন্ন এক দিকে প্রবাহিত করা হয়েছে। ২০ বছর আগে যে শিশুটি জন্মেছিল, সে এখন রাজপথে। সে এমন এক বাংলাদেশ দেখেছে, যা ছিল নিপীড়িত ও বিভক্ত। সে দেখেছে দেশটা কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য, তার জন্য কোনো সুযোগ খোলা নেই। উন্নত বিশ্বে মেধা থাকলে একজন শিক্ষার্থী যেকোনো অবস্থান থেকে উঠে আসতে পারে, কিন্তু আমাদের এখানে রাষ্ট্র নিজেই এক ধরনের ন্যারেটিভ বা আইডিওলজি চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে, যা শেষ পর্যন্ত দেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। মানুষকে কোনো দর্শন জোর করে গেলাতে গেলে হিতে বিপরীত হয়, বাংলাদেশেও তাই হয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির প্রভাব উচ্চশিক্ষায় কীভাবে পড়বে বলে মনে করেন?

এআই নিয়ে আমাদের দুইভাবে ভাবতে হবে। এক. এআই প্রযুক্তি হিসেবে শেখা (কোডিং, প্রোগ্রামিং)। দুই. এআইয়ের ব্যবহারিক প্রয়োগ (স্বাস্থ্য, ব্যবসা বা সমাজের সমস্যা সমাধানে)। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে আমাদের ‘ইন্টেলিজেন্স মেশিন ল্যাব’ আছে, যেখানে আমাদের ফ্যাকাল্টি ও ছাত্ররা বিশ্বমানের গবেষণা করছে। এছাড়া আমরা গুগলের সহযোগিতায় বাংলাদেশের প্রথম ‘সাইবার সিকিউরিটি ক্লিনিক’ এবং একটি অত্যাধুনিক ‘ফ্যাব ল্যাব’ ও ‘ইনোভেশন হাব’ তৈরি করছি। আমরা চাই বিশ্ববিদ্যালয় কেবল পেপার পাবলিশ না করে কমিউনিটির সমস্যা সমাধানে সরাসরি ভূমিকা রাখুক।

উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত?

ইউজিসি যে আউটকাম বেসড কারিকুলাম বা কোয়ালিটি সেল (IQAC) গঠনের কথা বলে, তা ইতিবাচক। কিন্তু সমস্যা হলো, তারা সব বিশ্ববিদ্যালয়কে একই পাল্লায় মাপে। একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় আর ৩৫ বছরের পুরনো প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্ষমতা এক নয়। উন্নত বিশ্বের মতো আমাদেরও প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘টায়ার’ বা ক্যাটাগরি অনুযায়ী ভাগ করে সেই অনুযায়ী স্বাধীনতা দেয়া উচিত। সেরা প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীনতা দিয়ে বলা উচিত—‘তোমরা তোমাদের মতো কাজ করো, ২০ বছর পর আমরা ফলাফল দেখব।’ অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ বা সবকিছুতে নাক গলালে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজস্ব স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলে।

ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার অভাব এবং বেকারত্ব প্রসঙ্গে আপনার মূল্যায়ন কী?

এখানে উভয় পক্ষেরই ঘাটতি রয়েছে। ইন্ডাস্ট্রিগুলো তাদের সমস্যা সমাধানে একাডেমিয়ার কাছে আসার সংস্কৃতি গড়ে তোলেনি। অন্যদিকে একাডেমিয়াও আন্তর্জাতিক মানের হয়ে উঠতে পারছে না। এ সংকট কাটাতে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ‘ইন্টারন্যাশনালাইজেশন’ বা আন্তর্জাতিকীকরণে জোর দিয়েছে। কারণ গ্লোবাল কানেক্টিভিটি ছাড়া বর্তমান বিশ্বে টিকে থাকা অসম্ভব।

গবেষণার ক্ষেত্রে আপনারা কী ধরনের আন্তর্জাতিক কোলাবরেশন বা প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করছেন?

আমরা গত ১৫ মাসে পাঁচটি বিদেশী (তিনটি চীনা ও দুটি জাপানি) কোম্পানির ফান্ড আনতে পেরেছি। বাংলাদেশের সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক জ্ঞান ও প্রযুক্তি ব্যবহার করছি। উল্লেখযোগ্য কিছু প্রজেক্ট যেমন কানাডিয়ান ফান্ডিংয়ে বঙ্গোপসাগরের ঢেউ এবং আর্লি সুনামি রেসপন্স সিস্টেম নিয়ে গবেষণা চলছে। এটি স্যাটেলাইট ডাটা ব্যবহারের মাধ্যমে একটি প্রেডিক্টিভ মডেল হিসেবে কাজ করছে। এআই, মেশিন লার্নিং এবং ডিপ লার্নিং ব্যবহার করে ঢাকার ট্রাফিক কনজেশন বা জ্যাম নিয়ে বিশ্লেষণ গবেষণা হচ্ছে। মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে ব্রেস্ট ক্যান্সারের সেল ডিটেক্ট বা শনাক্ত করার কাজ চলছে। ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া ও ডায়রিয়া নিয়ে আইসিডিডিআর,বি এবং আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর (যেমন জনস হপকিন্স, ইয়েল, কেমব্রিজ, ইউসি বার্কলে) সঙ্গে যৌথ গবেষণা চলছে।

বিদেশফেরত স্কলারদের কাজে লাগানো বা ‘ব্রেইন ড্রেইন’ রোধে আমাদের অবস্থান কেমন?

বাংলাদেশ নিজের দেশের মেধাবী হিউম্যান রিসোর্স বা স্কলারদের ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে খুবই ‘আনওয়েলকামিং’। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাঠামোয় বিদেশ থেকে আসা উচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন কাউকে হুট করে নিয়োগ দেয়া কঠিন। অথচ চীন, তুরস্ক বা মালয়েশিয়া তাদের বিদেশফেরত স্কলারদের কাজে লাগিয়ে এগিয়ে গেছে। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় গত কিছুদিনে বিদেশ থেকে ৩০-৪০ জন অভিজ্ঞ বাংলাদেশী গবেষক ও শিক্ষককে দেশে ফিরিয়ে এনে নিয়োগ দিয়েছে।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যেখানে বিদেশী শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে কড়াকড়ি করছে, সেখানে আমাদের শিক্ষার্থীরা কেন দেশ ছাড়তে চাইছে?

এটি একটি রূঢ় বাস্তবতা যে আমরা আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করতে পারিনি। বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষা কাঠামোয় জ্ঞান অর্জনের চেয়ে ‘সার্টিফিকেট’ দেয়াকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পার্ক করে রাখা হয় এবং শেষ পর্যায়ে একটি বিসিএস বা চাকরির আবেদনের যোগ্যতার সনদ দেয়া হয়। এতে মেধার বিকাশ ঘটে না। ফলে শিক্ষার্থীরা যখন দেখে যে দেশের ডিগ্রিতে তাদের প্রত্যাশিত ক্যারিয়ার গড়তে পারছে না, তখন তারা বাধ্য হয়ে দেশ ত্যাগ করতে চায়। এমনকি জিওপলিটিক্স বা বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে উন্নত বিশ্বের দ্বার সংকুচিত হয়ে এলেও শিক্ষার্থীরা উপায় না দেখে প্রতিবেশী বা অন্যান্য দেশে চলে যাচ্ছে।

‘সার্টিফিকেট প্রডাকশন’ বা সনদ তৈরির যে কথা আপনি বললেন, তার সমাধান কী?

আমরা অনেক সময় বড় বড় কথা বলি যে আমরা হাজার হাজার ফিলোসফার বা হিস্টোরিয়ান তৈরি করছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো তারা কি আসলে ওই সাবজেক্টের গভীরতা ধারণ করে? চার বছরের একটি প্রোগ্রামে প্রথম বর্ষ থেকে চতুর্থ বর্ষ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তির উৎকর্ষ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ানো উচিত। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা চেষ্টা করি শিক্ষার্থীদের অন্ট্রাপ্রেনরিয়াল জ্ঞান (উদ্যোক্তা হওয়ার শিক্ষা) দিতে। যেকোনো সাবজেক্টের শিক্ষার্থী হোক না কেন, তাদের অ্যাপটিটিউড লেভেল একটি নির্দিষ্ট মানে উন্নীত করা দরকার, যাতে তারা জীবনে যেকোনো পরিস্থিতিতে সফল হতে পারে।

পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান এবং এদের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য সম্পর্কে আপনার মতামত কী?

আমাদের দেশে একটি ভুল ‘ইকোসিস্টেম’ তৈরি হয়েছে যে পাবলিক মানেই ভালো আর বেসরকারি মানেই খারাপ। আসলে আমরা ধনী বা গরিবের সন্তানকে পড়াই না, আমরা বাংলাদেশের নাগরিকের সন্তানদের পড়াই। দেশে ৫০টির বেশি পাবলিক এবং প্রায় ১৫০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। কিন্তু মানের দিক থেকে বিচার করলে উভয় ক্ষেত্রেই হাতেগোনা ১০-১৫টি ছাড়া বাকিদের মান নিয়ে প্রশ্ন আছে।একটি প্রতিষ্ঠানের মান নির্ভর করে তার ‘র ম্যাটেরিয়াল’ এবং ‘প্রসেস’-এর ওপর। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো গুণগত মানের শিক্ষক। আপনি যদি শিক্ষকদের মান এবং স্ট্যান্ডার্ডাইজড প্রসেস ঠিক রাখতে পারেন, তবেই প্রতিষ্ঠানের মান নিশ্চিত হবে।

এত সমস্যার ভিড়েও আপনি কি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আশাবাদী?

আমাদের তরুণ ও শিক্ষকদের নিয়ে আমি আশাবাদী। আমি দেখেছি, বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় (যেমন স্ট্যানফোর্ড) থেকে পিএইচডি করা বা বিদেশে ২০ বছর শিক্ষকতা করা বাংলাদেশীরা এখন দেশে ফিরে আমাদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছেন। তারা উন্নত জীবনের মোহ ত্যাগ করে দেশের জন্য কাজ করতে আসছেন। আমাদের তরুণদের মধ্যেও অপার সম্ভাবনা আছে। শুধু দরকার তাদের হাত-পা বেঁধে না রাখা। যেমন কোনো মেধাবী ছাত্র যদি সাড়ে তিন বছরে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করতে পারে, তাকে চার বছর আটকে রাখা উচিত নয়। আমাদের সিস্টেমের এ জটগুলো খুলে দিলে এবং মেধাবীদের সঠিক নার্সিং করলে বাংলাদেশ অবশ্যই ঘুরে দাঁড়াবে।

তরুণরা যারা ভবিষ্যতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আসবে, তাদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?

তরুণদের মধ্যে রাষ্ট্র পরিবর্তনের যে উন্মাদনা বা স্পৃহা দেখা যাচ্ছে, তা ইতিবাচক। তবে শুধু আবেগ দিয়ে রাষ্ট্র পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত ‘হিউম্যান রিসোর্স’ এবং আধুনিক প্রযুক্তিগত জ্ঞান। সাইবার সিকিউরিটি, ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিক্স ও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মতো বিষয়গুলোতে দক্ষতা অর্জন করতে হবে। শুধু দালানকোঠা বানালেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয় না। আমাদের শিক্ষকদের যথাযথ ট্রেনিং দিতে হবে। একজন অনুপযুক্ত শিক্ষকের চেয়ে শিক্ষক না থাকা বরং ভালো, কারণ ভুল শিক্ষা মেধা ধ্বংস করে দেয়।