বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত ঢাকা নদীবন্দরের অবকাঠামো নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। নদী তীরের ঐতিহাসিক স্থাপনা আহসান মঞ্জিল, লালকুঠি হল ও রূপলাল হাউজের সৌন্দর্যবর্ধন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এর সামনের স্থাপনা উচ্ছেদের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে ডিএসসিসি। যার মধ্যে রয়েছে বিআইডব্লিউটিএর টার্মিনালও। সংস্থাটিকে এ স্থাপনা সরিয়ে নিতে চিঠি দিয়েছে করপোরেশন। আর বিআইডব্লিউটিএ বলছে, করপোরেশনের এ দাবি একেবারেই অযৌক্তিক। এ পথ দিয়ে রোজ হাজারো মানুষ যাতায়াত করে, ফলে গুরুত্বপূর্ণ এ বন্দর সরিয়ে নেয়া সম্ভব নয়।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে নৌপথের গুরুত্ব বেড়েছে। ফলে নৌপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের পরিমাণও আগের চেয়ে বেশি। এ চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে ঢাকা নদীবন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে নানান অবকাঠামো নির্মাণ করেছে বিআইডব্লিউটিএ। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে রূপলাল হাউজ, আহসান মঞ্জিল ও লালকুঠি হলের সামনের নদীর তীরভূমি থেকে সব অবকাঠামো অপসারণে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়েছে ডিএসসিসি।
বিআইডব্লিউটিএ বলছে, এ বন্দর দিয়ে প্রতিদিন ৩০-৪০ হাজার যাত্রী চলাচল করে। মালামাল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথও এটি। ফলে সিটি করপোরেশন যে দাবি করেছে তা অযৌক্তিক। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতেও।
সার্বিক বিষয় জানিয়ে গতকাল সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে একটি প্রতিবেদন দেয় বিআইডব্লিউটিএ। সেখানে বলা হয়, আহসান মঞ্জিলের সামনে ওয়াটার বাসের ঘাট ও এমপি ঘাট রয়েছে। পাশাপাশি বিআইডব্লিউটিএর নিজস্ব নৌযানগুলোও সেখানে রাখা জয়। লালকুঠি ও রূপলাল হাউজের সামনে থেকে চাঁদপুর, শরীয়তপুর, ঢাকা-বরিশাল, ঢাকা-ইলিশা রুটে লঞ্চ ও বিআইডব্লিউটিসির স্টিমার চলাচল করে। এসব ঘাট দিয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শতাধিক নৌযান চলাচল করে। ফলে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর।
অন্যদিকে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যানকে দেয়া চিঠিতে ডিএসসিসি বলেছে, মোগল নির্মাণশৈলী ও কৌশল অবলম্বনে ১৮৭২-১৮৭৯ সালে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে নর্থব্রুক হল (লালকুঠি) নির্মিত হয়। ভারতের তত্কালীন গভর্নর জেনারেল টমাস জর্জ ব্যারিং নর্থব্রুক ঢাকা সফরে এলে তার সফরকে স্মরণীয় করে রাখতেই এ ভবনের নাম নর্থব্রুক হল রাখা হয়। বর্তমানে ভবনটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে জানিয়ে চিঠিতে বলা হয়, প্রাচীন সৌন্দর্যময় স্থাপনাটির সম্মুখভাগে বিভিন্ন স্থাপনা থাকার কারণে এটি এখন নদী থেকে দেখা যায় না। স্থাপনা নির্মাণের ফলে পাশের রাস্তা, ভাসমান হকার, কুলি ও মালামাল বহনকারী পরিবহনের কারণে যানজট সৃষ্টি হয়। ফলে লালকুঠি হলের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। ভবনটির নির্মাণশৈলী অক্ষুণ্ন রেখে সংস্কারের জন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। শিগগিরই ভবনটির চারপাশের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে এর সংস্কারকাজ শুরু হবে। সেই জন্য লালকুঠি হলের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত বিআইডব্লিউটিএর টার্মিনালসহ অন্যান্য স্থাপনা দ্রুত অন্য স্থানে সরিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য চিঠিতে বলা হয়। গত বছরও একই বিষয়ে চিঠি দেয়া হয়েছিল বলেও নতুন চিঠিতে উল্লেখ করেছে ডিএসসিসি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমডোর গোলাম সাদেক বণিক বার্তাকে বলেন, সিটি করপোরেশনের আবেদনের পরিপ্র্রেক্ষিতে সংসদীয় কমিটি আমাদের কাছে প্রকৃত ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছে। জবাবে আমরা বলেছি, রূপলাল হাউজ, আহসান মঞ্জিল ও লালকুঠি হলের সামনের স্থাপনা না সরিয়েই দর্শনার্থীদের জন্য নদী থেকে এগুলোর সৌন্দর্য উপভোগের ব্যবস্থা করা সম্ভব। এক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সমন্বয় করেই কাজটি করা হবে বলেও তিনি জানান।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ঊনবিংশ শতকে বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষে সুত্রাপুরের ফরাশগঞ্জ এলাকায় প্রায় ৫২ মিটার দীর্ঘ একটি দ্বিতল ভবন নির্মাণ করেন তত্কালীন ব্যবসায়ী ভ্রাতৃদ্বয় রূপলাল দাস ও রঘুনাথ দাস। তৎসময়ে ভবনটির নামকরণ করা হয় রূপলাল হাউজ। প্রায় দুইশ বছরের ঐতিহাসিক এ স্থাপনা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায়। ভবনটির সৌন্দর্য ফিরিয়ে এনে প্রকৃতি ও ইতিহাসপ্রেমী দেশ-বিদেশের পর্যটকদের জন্য তা উন্মুক্ত করার বিশদ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে ডিএসসিসি। এজন্য রূপলাল হাউজ ও আহসান মঞ্জিলের সামনের ও নদী-তীরবর্তী স্থাপনা থেকে সব অবকাঠামো স্থানান্তর ও অপসারণ চায় তারা।










