বিশ্ববাজারে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম বাড়ছে। দেশে এলপিজির বাজার স্থিতিশীল রাখতে এর দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। সে অনুযায়ী এখন ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম মূসকসহ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৩৯ টাকা। সাধারণত চার সদস্যের একটি পরিবারে একটি সিলিন্ডার এক মাসও যায় না। বাড়তি খরচের ভয়ে এখন গ্যাসের বিকল্প খুঁজতে শুরু করেছে রাজধানীর স্বল্প আয়ের মানুষ। তাই আবারো ফিরছে কাঠের চুলার ব্যবহার।
গত বছরের ১২ এপ্রিল দেশে প্রথমবারের মতো এলপিজির দাম বেঁধে দেয় বিইআরসি। ঘোষণা অনুযায়ী প্রতি কেজি এলপিজি মূসকসহ ৮১ টাকা ৩০ পয়সা ধরে এ দাম নির্ধারণ করা হয়। সে হিসেবে তখন ১২ কেজি এলপিজির দাম ছিল ৯৭৫ টাকা। এরপর প্রায় প্রতি মাসেই পণ্যটির মূল্য সমন্বয় করেছে কমিশন। শুরুতে বেশ কয়েকবার পণ্যটির দাম কমলেও কভিড মহামারী ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে অন্যান্য জ্বালানি পণ্যের মতো এলপিজির দামও অস্বাভাবিক রকম বেড়ে যায়। সর্বশেষ গত রোববার প্রতি কেজি এলপিজির দাম ১১৬ টাকা ৮৮ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১১৯ টাকা ৯৪ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে একটি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম মূসকসহ পড়ছে ১ হাজার ৪৩৯ টাকা। গত ৩ মার্চও এর দাম ছিল ১ হাজার ৩৯১ টাকা।
সিলিন্ডারের দাম বেড়ে যাওয়ায় রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে এরই মধ্যে কমতে শুরু করেছে এলপিজির ব্যবহার।
রাজধানীর উত্তরখান, দক্ষিণখান, পূর্বাঞ্চল, ডেমরা, নাছিরনগর, চিটাগং রোড, শনির আখড়া, জুরাইন, ঢাকা উদ্যান, মিরপুর, কড়াইল এবং রাজধানীর পার্শ্ববর্তী হাসনাবাদ, তেঘরিয়া, কোন্ডা, বিবিরবাজার, নারায়ণগঞ্জ, সোনারগাঁ, গাজীপুরের ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ই জানিয়েছেন গ্যাসের ব্যবহার কমে যাওয়ার কথা। এসব এলাকার এলপিজি বিক্রেতারা জানান, ছয় মাস ধরেই এলপিজির ব্যবহার তুলনামূলক কমছে। কিন্তু গত কয়েকদিন তা প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে।
তেঘরিয়ার খুচরা এলপিজি বিক্রেতা রাশেদ তালুকদার বণিক বার্তাকে বলেন, প্রায় তিন মাস ধরেই সিলিন্ডার বিক্রি কমে গেছে। এখন সচ্ছল অনেক পরিবারও সিলিন্ডার ব্যবহার ছেড়ে দিয়েছে। কারণ হিসেবে তারা বাড়তি দামের কথা বলছেন। অনেকের পক্ষেই প্রায় দেড় হাজার টাকা দিয়ে সিলিন্ডার কেনা সম্ভব নয়। তাই তারা কাঠের চুলা ব্যবহার শুরু করেছেন।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে সিলিন্ডারের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা বলে মনে করছেন কেরানীগঞ্জের কোন্ডা ইউনিয়নের এলপিজি বিক্রেতা আরমান চৌধুরী। তিনি বলেন, আগে রমজানে মাটির চুলা ব্যবহারকারীরাও আরামের জন্য বা সুবিধার জন্য এলপিজি ব্যবহার করত, কিন্তু এবার ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। ছয় মাস আগেও প্রতি মাসে ১৫-২০টি সিলিন্ডার বিক্রি হতো। কিন্তু এখন মাসে তিনটি সিলিন্ডার বিক্রি করতেই কষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা সুমন হক জানান, সিলিন্ডারের মূল্যবৃদ্ধির ফলে আগের মতো কাঠের চুলায় ফিরে যেতে হয়েছে তাকে। কিন্তু সেখানেও শান্তি মিলছে না। ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বাড়তে শুরু করেছে কাঠের দামও। আগে যেখানে এক মণ কাঠ পাওয়া যেত ২৫০-৩০০ টাকায়, কিছুদিন হলো তা ৩৫০ টাকা ছাড়িয়েছে।
গ্যাসের চেয়ে এখন কাঠের চুলায় অনেক বেশি সাশ্রয় উল্লেখ করে হাসনাবাদের বাসিন্দা রুমিনা সায়মা বলেন, দেড় হাজার টাকা দিয়ে একটি সিলিন্ডার কিনলে সর্বোচ্চ ২৬-২৮ দিন ব্যবহার করা যায়। বিপরীতে ৩৫০ টাকায় এক মণ কাঠ কিনলে অনায়াসে এক মাস রান্নার কাজ চালানো যায়। আগে সুবিধার জন্য বা কিছুটা আরামের জন্য গ্যাসের চুলা ব্যবহার করলেও দামের কারণে আর তা সম্ভব হচ্ছে না।
রাজধানীর শনির আখড়ার বাসিন্দা হাবিবুর রহমান জানান, তার এলাকায় ঠিকমতো গ্যাস থাকে না। তাই বিকল্প হিসেবে সিলিন্ডার ব্যবহার করতেন। কিন্তু এখন সিলিন্ডারের দাম এত বেড়েছে যে উপায় না দেখে বাড়ির ছাদে কাঠের চুলায় রান্নার ব্যবস্থা করে নিয়েছেন।
ভোক্তাদের এ সমস্যা সমাধানে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে বলে মনে করেন কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ভোক্তারা যেন সহজে জ্বলানি পেতে পারে, এজন্য সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। বিইআরসিকেও ভোক্তার নাগালের মধ্যে গ্যাসের দাম নির্ধারণ করতে হবে। তাছাড়া কোথাও নির্ধারিত মূল্যের বেশি দামে গ্যাস বিক্রি হচ্ছে কিনা তা নজরদারির মধ্যে রাখতে হবে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শও দেন তিনি।










