সংবাদপত্রের মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি এ কে আজাদ বলেছেন, পুড়িয়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা যায় না। এ পোড়া ভবন নতুন করে শিল্পকর্ম হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছে। এর পাশাপাশি সাংবাদিকেরা এ হামলায় ভয় পেয়ে পালিয়ে যাননি। পরিস্থিতি মোকাবেলা করে তারা সাহসের সঙ্গে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। ভবিষ্যতেও হয়তো সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের ওপর আঘাত আসতে পারে। এ শঙ্কা থেকেই পরিস্থিতি প্রতিহত করার জন্য সাংবাদিকদের প্রস্তুতি নিতে হবে। আমাদের ঐক্য আরো সুদৃঢ় করতে হবে।

আজ বুধবার সকাল ১১টায় রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলোর অগ্নিদগ্ধ ভবনে শুরু হওয়া শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ‘আলো’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এতে আরো অংশ নেন দেশের সংবাদপত্রের মালিক, সম্পাদক, সাংবাদিক নেতা ও গণমাধ্যমের কর্মীরা। শিল্পী মাহ্‌বুবুর রহমানের শিল্পকর্ম নিয়ে এ প্রদর্শনী চলবে আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। সর্বস্তরের দর্শকদের জন্য এ প্রদর্শনী প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে ১টা এবং বেলা ৩টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকবে।

এর আগে, গত বছর ১৮ ডিসেম্বর রাত পৌনে ১১টার দিকে প্রথম আলোতে সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়। ওই সময় ব্যাপক ভাঙচুর, লুটপাট এবং প্রথম আলোর একটি ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এরপর পরই দ্য ডেইলি স্টার ভবনেও হামলা হয়। সেখানেও ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সঞ্চালক প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ অতিথিদের স্বাগত জানিয়ে বলেন, আজ সম্পাদক, সাংবাদিক নেতা ও গণমাধ্যমকর্মীদের এ উপস্থিতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আমরা এখানে শুধু বিধ্বস্ত ভবন দেখব না; চিন্তাকে রুদ্ধ করার ঘৃণ্য হামলা এবং সেখান থেকে উত্তরণে চেষ্টাও দেখব। আমদের কথা বলার অধিকারে সোচ্চার থাকার প্রেরণাও জোগাবে এ প্রদর্শনী।

অনুষ্ঠানের শুরুতে শিল্পী মাহবুবুর রহমান তার প্রতিক্রিয়ায় জানান, তিনি এ ধ্বংসস্তূপের ভেতর নতুন প্রাণশক্তির উত্থানের বিষয়টি তুলে ধরতে চেয়েছেন। এখানে যেসব বস্তু দগ্ধ হয়েছে, সেগুলো যেন এই কর্মস্থলের প্রাণস্পন্দনের কথা ও দগ্ধ হওয়ার যন্ত্রণার কথাই বলেছে। সেই যন্ত্রণা ও সেখান থেকে প্রতিষ্ঠানটির ঘুরে দাঁড়ানো— উভয় বিষয়কে তিনি তুলে ধরেছেন।

ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে আগুন দেয়ার ঘটনাটি কেবল এ দুটি প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ নয়; এটা স্বাধীন সাংবাদিকতার ও চিন্তার স্বাধীনতার বিরুদ্ধে আগুন। এ হামলা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এর পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও লক্ষ্য ছিল।

মাহফুজ আনাম নতুন সরকারের প্রতি এ হামলার ঘটনা যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে এর নেপথ্যের পরিকল্পনাকারী, হামলাকারীসহ জড়িত প্রত্যেকের মুখোশ জনসমক্ষে উন্মোচন করার আহ্বান জানান। তিনি এ বিপর্যয়ের মধ্যেও সাহসের সঙ্গে কাজে ফিরে এসে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সংবাদপ্রবাহ চালু রাখার জন্য উভয় প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিকসহ সব কর্মীর সাহস ও নিষ্ঠার কথা স্মরণ করেন।

জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি কবি হাসান হাফিজ বলেন, প্রথম আলোয় যে ভয়ানক বর্বরতা চালানো হয়েছে, সেখানে একই সঙ্গে ধ্বংস ও সৃষ্টির সমন্বয় করেছেন শিল্পী। প্রদর্শনীটি খুবই বিস্ময়কর ও গভীর অর্থময়তা প্রকাশ করেছে। নতুন সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সহিষ্ণুতার সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠায় তারা গুরুত্ব দেবে

প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, এ প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে শিল্পী ধ্বংসের মধ্যেও একটি গভীর প্রাণশক্তি ও আশাবাদের প্রকাশ ঘটিয়েছেন। আমাদের এখন এ আশা ও শক্তিকে নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। অনেক বছর ধরে সাংবাদিকদের মধ্যে বিভক্তি, বিরোধ বিরাজ করছিল। কিন্তু অতীতে যা–ই থাক, যা কিছু হোক, সেখানে থেকে উঠে এসে স্বাধীন সাংবাদিকতা ও নিরাপত্তার জন্য নিজেদের ভেতরের ঐক্য শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে আমাদের সত্যনিষ্ঠভাবে সাংবাদিকতাও করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, সত্যই হলো আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।

অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ, সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদুল ইসলাম, ফটোসাংবাদিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কে এম মহসীন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মঈনুল হাসান সোহেল, ডিক্যাবের সাধারণ সম্পাদক ইমরুল কায়েস, ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি দৌলত আক্তারসহ অনেকে।