নিমতলী, চুড়িহাট্টা, আরমানিটোলা—এমন সব নানা ট্র্যাজেডির পরও ঘুম ভাঙেনি পুরান ঢাকাবাসীর। ভবনে ভবনে থাকা প্লাস্টিক ও কেমিক্যাল গোডাউন আর কারখানাগুলো যেন একেকটি মৃত্যুকূপ। ২০১০ সালে নিমতলীতে আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয় ১২৪ তাজা প্রাণ, আর ২০১৯ সালে চুড়িহাট্টায় ৭১ জন। দুর্ঘটনার পর প্রতিবারই সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে বলা হয়েছিল, দ্রুতই স্থানান্তর করা হবে দাহ্য রাসায়নিকের ব্যবসা। তবে আজও কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের হাত থেকে মুক্ত হয়নি পুরান ঢাকা। দিন যত গেছে ধীরে ধীরে কমেছে তত্পরতা এবং কমতে কমতে একসময় থেমে গেছে। এমনকি ফাইলবন্দি হয়ে আছে ফায়ার সার্ভিসের সুপারিশমালাও।

পুরান ঢাকার কেমিক্যাল গোডাউন স্থানান্তরে ২০১৮ সালে একটি প্রকল্প হাতে নেয় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। কিন্তু ফলাফল শূন্য, সাত বছরেও স্থানান্তর হয়নি এসব কেমিক্যাল গোডাউন। উল্টো প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে তিন দফা। সম্প্রতি ঢাকা ও চট্টগ্রামে বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণ ও অগ্নিদুর্ঘটনার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে পুরান ঢাকার কেমিক্যাল গোডাউন স্থানান্তরের বিষয়টি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুরান ঢাকায় কয়েকবার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে, সামনেও ঝুঁকি রয়েছে। স্থায়ী সমাধান যেহেতু দেরি হচ্ছে তাই সরকারের উচিত ছিল একটি স্বল্পমেয়াদি সমাধানের পথে হাঁটা। এতে অনেকটাই ঝুঁকি কমানো সম্ভব। তবে এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের নীরবতাকে দায়হীন আচরণ বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। মুন্সিগঞ্জে যে বিসিক কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক হচ্ছে সেটির সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে কেবল ৪৬ শতাংশ। এখনো ভূমি উন্নয়নের কাজই (অগ্রগতি ৮০ শতাংশ) শেষ করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।

প্রকল্পকাজের ধীরগতির বিষয়ে জানতে চাইলে বিসিক কর্তৃপক্ষ বলছে, মূলত ভূমি অধিগ্রহণজনিত জটিলতার কারণেই কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের অগ্রগতি থমকে ছিল দীর্ঘ সময়। তবে আগামী বছরের জুনের মধ্যে প্লট বরাদ্দ দেয়া হবে। এ প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক মো. হাফিজুর রহমানের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। বিসিক চেয়ারম্যান মুহ. মাহবুবুর রহমানকে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি ধরেননি। এমনকি খুদেবার্তা পাঠিয়েও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, পুরান ঢাকার মতো জনঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এভাবে কেমিক্যাল কোম্পানিকে লাইসেন্স দেয়াটাই অন্যায়। তাছাড়া লাইসেন্স দেয়ার পর শর্ত মেনে কারখানা পরিচলানা করছে কিনা সেটিও যথাযথ তদারক করে না প্রশাসন। ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কেমিক্যাল কারখানা স্থানান্তরের উদ্যোগটি দীর্ঘায়িত হওয়া দুঃখজনক। খুবই ঝুঁকিপূর্ণ যে কারখানাগুলো আছে অন্তত সেগুলোকে স্বল্পমেয়াদেই কোথাও স্থানান্তর করা যেত। রাজধানীর আশপাশে বিশেষ করে পূর্বাচল, কেরানীগঞ্জে কত জায়গাই তো খালি পড়ে আছে। সাময়িকভাবে সেখানেও গুদামগুলো সরাতে পারল না। তাই যেসব অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটছে এর দায় রাষ্ট্রকেও নিতে হবে।’

এক হিসাব বলছে, পুরান ঢাকায় রয়েছে ২৫ হাজার রাসায়নিক দাহ্য বস্তুর গুদাম। এসবের মধ্যে ১৫ হাজার আছে বাসাবাড়িতেই। মাত্র আড়াই হাজার গুদামকে ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছে সিটি করপোরেশন। বাকি ২২ হাজারের বেশি গুদামই অবৈধ। আড়াই শতাধিক ক্ষতিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের ব্যবসা রয়েছে ঘনবসতিপূর্ণ এ এলাকায়। আর গুদামগুলোয় রয়েছে গ্লিসারিন, সোডিয়াম অ্যানহাইড্রাস, সোডিয়াম থায়োসালফেট, হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড, মিথাইল ইথাইল কিটন, থিনার, আইসোপ্রোপাইলসহ ভয়ংকর সব রাসায়নিক দাহ্য পদার্থ। এ রাসায়নিক পদার্থগুলো সামান্য আগুনের স্পর্শে এলেই ঘটতে পারে ভয়াবহ অগ্নিদুর্ঘটনা। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কিছু ব্যবসায়ী এসব অবৈধ কেমিক্যাল ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাদের বাধার কারণেই সেগুলো সরানো যাচ্ছে না।

বিভিন্ন সময় পুরান ঢাকায় অগ্নিকাণ্ডের পর সরকারিভাবে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত শেষে অগ্নিদুর্ঘটনা রোধে বিভিন্ন সুপারিশও করা হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তদন্ত কমিটিগুলোর সুপারিশ বাস্তবায়ন করা গেলেই পুরান ঢাকার অগ্নিদুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে আসবে। যদিও অদৃশ্য কারণে ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে থাকে সেগুলো। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঝুঁকি নিয়ে তারাও ব্যবসা করতে চান না। সরকারের পক্ষ থেকে স্থায়ী গুদামের পাশাপাশি অস্থায়ী গুদামও দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু সে বিষয়ে কোনো অগ্রগতি নেই।

বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইম্পোটার্স অ্যান্ড মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব আবুল কালাম আজাদ এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা নিয়ম মেনে ঝুঁকিমুক্ত ব্যবসা করতে আগ্রহী। কিন্তু সে সুযোগ পাচ্ছি না। আমাদের সুবিধামতো জায়গায় গুদাম দেয়ার কথা ছিল। সেটারও কোনো খবর নেই। আসলে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেই কেবল সরকার থেকে শুরু করে মিডিয়া সবাই নড়েচড়ে বসে। কয়দিন আলোচনা করে। তারপর আবার সব নীরব হয়ে যায়। আজ যে পুরান ঢাকায় আগুন লাগবে না তার তো কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাহলে আমরা কেন ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসা করব? আমাদেরও তো জীবনের মায়া আছে। সরকারকে এটা বুঝতে হবে।’

পুরান ঢাকার নিমতলীতে ২০১০ সালের ৩ জুন সংঘটিত রাসায়নিক দ্রব্যের গুদামে বিস্ফোরণে ১২৪ জনের মৃত্যু হয়। আহত হয় অনেকে। সম্পদেরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। সাধারণ অগ্নিকাণ্ড বিস্ফোরণে রূপ নেয় রাসায়নিক দ্রব্যের কারণে। এর পরই রাজধানীর পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি অলিগলি থেকে কেমিক্যাল গোডাউনগুলো সরাতে কেরানীগঞ্জে কেমিক্যাল পল্লী নির্মাণের প্রকল্প নেয়া হয় ২০১৮ সালে। যদিও সে কাজ পরে আর এগোয়নি। এরই মধ্যে ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। প্রাণ হারায় ৭১ জন। সেবারও ঢাকার ঘিঞ্জি এলাকা থেকে রাসায়নিক দ্রব্যের গুদাম সরিয়ে নিতে তোড়জোড় শুরু হয়। নেয়া হয় স্থায়ী কেমিক্যাল পল্লী গঠনের উদ্যোগ। যদিও ঘনবসতিপূর্ণ কেরানীগঞ্জের স্থানীয়দের বাধায় সেখান থেকে কেমিক্যাল পল্লী মুন্সিগঞ্জে সরিয়ে নেয়া হয়।

এরই অংশ হিসেবে ‘বিসিক কেমিক্যাল পল্লী, ঢাকা’ প্রকল্পটির নাম সংশোধন করে রাখা হয়েছে ‘বিসিক কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক, মুন্সীগঞ্জ’। অনুমোদনের এক বছরের কম সময়ের মধ্যে সংশোধন করা প্রকল্পটির ব্যয় বেড়েছে আট গুণ। অর্থাৎ ১ হাজার ৬১৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয় ধরে ২০১৯ সালের ৩০ এপ্রিল প্রকল্পের সংশোধনী অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। বর্তমানে প্রকল্পের ৪৬ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে বলে জানা গেছে।