বান্দরবানে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধীন ১১ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সদর উপজেলার টংকাবতি ইউনিয়নের হাতিরডেরা এলাকা থেকে কক্সবাজারের চরম্বা ইউনিয়নের অংশ পর্যন্ত নতুন এ সড়কের নির্মাণকাজ চলছে। শিডিউলে থাকা সত্ত্বেও সাববেজ (বালি ও ছোট আকারের ইটের খোয়ামিশ্রিত ঢালাই) ছাড়াই শুধু মেকাডম (শুধু ইটের বড় আকারের খোয়া ঢালাই) দিয়ে সড়ক নির্মাণের প্রস্তুতি চলছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে নির্মাণাধীন সড়কটিতে করা হয়নি পর্যাপ্ত বালি ভরাট।
জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয়রা জানান, গত বছর থেকে টংকাবতির হাতিরডেরা এলাকা থেকে শুরু হয়ে কক্সবাজারের চরম্বা ইউনিয়নের অভ্যন্তর পর্যন্ত প্রায় ১১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের একটি নতুন সড়কের নির্মাণকাজ শুরু করে এলজিইডি। শুরুতে সড়কের জন্য পাহাড় কাটা হয়। সম্প্রতি সড়কটির নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। চলমান কাজে কোথাও বালি দেয়া হচ্ছে আবার কোথাও দেয়া হচ্ছে না। একইভাবে কোথাও সাববেজ দেয়া হয়, কোথাও সাববেজ না করেই তড়িঘড়ি করে মেকাডম দিয়ে কার্পেটিং করার প্রস্তুতি চলছে। একই সঙ্গে কোথাও কোথাও মেকাডম ঢালাইয়ে নিম্নমানের ইট ব্যবহার করা হয়েছে। এ কাজে অফিসের তদারকি খুবই কম। মাঝে মাঝে নির্বাহী প্রকৌশলী, উপজেলা প্রকৌশলী, উপসহকারী প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্টদের দেড়-দুই ঘণ্টার মতো দেখা যায়। এরপর দুই সপ্তাহেও সংশ্লিষ্ট অফিসের কারো দেখা মেলে না। এটি সড়ক নির্মাণকাজে ঠিকাদারকে অনিয়ম করার সুযোগ করে দেয়ার কৌশল বলে মনে করেন স্থানীয়রা। এতে নতুন সড়কটির টেকসই নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে যাবে।
এলজিইডি অফিস সূত্র জানায়, হাতিরডেরা সড়কের মোট দৈর্ঘ্য ১০ হাজার ৯০০ মিটার। তিনটি প্যাকেজে এ সড়কের নির্মাণকাজ চলছে। এর মধ্যে শূন্য থেকে ৩ হাজার ৯২০ মিটার পর্যন্ত প্যাকেজের কাজটি নিয়েছে ইমু কনস্ট্রাকশন। এটির স্বত্বাধিকারী বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য কাঞ্চনজয় তঞ্চঙ্গ্যা। এ কাজের প্রাক্কলিত মূল্য ৫ কোটি ৯৮ লাখ টাকা, তবে চুক্তিমূল্য ৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। কাজটি বাস্তবায়ন করছেন মো. মোজাফফর নামের এক ব্যক্তি। ৩ হাজার ৯২০ মিটার থেকে ৬ হাজার ৭৩০ মিটার পর্যন্ত পরের প্যাকেজটি নিয়েছে এমএম ট্রেডার্স। এটির স্বত্বাধিকারী মংছো রাখাইন। এর প্রাক্কলিত মূল্য ৪ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। চুক্তিমূল্য ৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। এর বাস্তবায়নকারী তাপস কান্তি দাশ। এরপর ১০ হাজার ৯৮০ মিটার পর্যন্ত শেষের প্যাকেজটি নিয়েছে মেসার্স ইউটিমং। লাইসেন্সের স্বত্বাধিকারী উথোয়াইমং মারমা। এ কাজের প্রাক্কলিত মূল্য ৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। চুক্তিমূল্য ৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। কাজটি যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছেন আব্দুর রহিম চৌধুরী, জসিম ও জুয়েল। গত ১০ অক্টোবর তিনটি প্যাকেজেরই সময়সীমা শেষ হয়েছে। বর্ধিত সময় নিয়ে বর্তমানে সড়কের নির্মাণকাজ চলছে।
গত ২৬ নভেম্বর সরেজমিনে দেখা গিয়েছে, সুয়ালক-লামা সড়কের ৩০ কিলোমিটার অংশ থেকে শুরু হওয়া প্রথম প্যাকেজে আনুমানিক আড়াই কিলোমিটার থেকে প্যাকেজটির শেষ পর্যন্ত বালি ভরাট ও সাববেজ দেখা যায়নি। তবে মাটি কেটে করা কাঁচা সড়কের ওপর মেকাডম দেয়া হয়েছে। মেকাডম দেয়া হয়নি এমন দুটি স্থানে কাঁচা মাটি ও আনুমানিক তিন কিলোমিটার অংশে মেকাডমে নিম্নমানের ইট ও চালকবিহীন একটি রোলারও দেখা গিয়েছে। কথা হলে শ্রমিকরা জানান, নিয়ম-অনিয়ম জানি না। ঠিকাদারের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ চলছে। পরের প্যাকেজের কোথাও বালি ভরাট ও সাববেইজ ঢালাই করা অবস্থায় দেখা গেলেও কোনো শ্রমিককে দেখা যায়নি। তবে শেষের প্যাকেজটির পুরোটাই সাববেজ দেয়া হয়ে গিয়েছে এবং প্যাকেজটির অংশজুড়ে পানি দিয়ে ভেজানো ছিল।
নতুন সড়ক নির্মাণকাজে বালি ভরাট না করা ও সাববেজ না দেয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রথম প্যাকেজটির বর্তমান ঠিকাদার মো. মোজাফফর তার অফিসে আসতে বলেন। এছাড়া অপ্রাসঙ্গিক আরো কথা বলেন তিনি।
বর্ধিত সময় নিয়ে কাজ করা হচ্ছে বলে স্বীকার করেছেন দ্বিতীয় প্যাকেজের কাজ বাস্তবায়নকারী তাপস কান্তি দাশ। সিডিউল অনুযায়ী এ পর্যন্ত সাববেজ দেয়া হয়েছে ও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের প্যাকেজের অংশের কার্পেটিংয়ের কাজ শেষ করা হবে বলে জানিয়েছেন ঠিকাদার মো. জসিম।
হাতিরডেরা এলাকাটি টংকাবতী ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের অন্তর্গত। প্রথম অংশের প্যাকেজে কোনো বালি ভরাট করা হয়নি বলে জানিয়েছেন এ ওয়ার্ডের মেম্বার মো. নুরুল কবির। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, প্রথম প্যাকেজ অংশে সড়কের শেষের দিকে প্রায় দেড় কিলোমিটার পর্যন্ত সড়কে বালি ভরাট ও সাববেজ দেয়া হয়নি। মাটি কেটে করা কাঁচা সড়কের ওপর তড়িঘড়ি করে ঢেলে দেয়া মেকাডম রোলার দিয়ে মেলানো হচ্ছে। সড়কের মধ্যের অংশ কাজের দিক দিয়ে কিছুটা পিছিয়ে ও শেষের প্যাকেজটির কাজ এগিয়ে রয়েছে। এছাড়া এ সড়কের চার কিলোমিটারের বেশি অংশ কক্সবাজারের চরম্বা ইউনিয়নে পড়েছে বলে জানান তিনি।
নির্মাণাধীন সড়কটির একটি অংশ চরম্বা ইউনিয়নের অভ্যন্তরে পড়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন এলজিইডির বান্দরবান প্রকৌশলী মো. জিয়াউল ইসলাম মজুমদার। জনবল কম জানিয়ে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, সড়ক নির্মাণকাজে প্রাক্কলন অনুযায়ী বালি ভরাট ও সাববেজ করা না হলে আবার নতুনভাবে করানো হবে। উপজেলা ও জেলা অফিসের দুটি টিম পাঠানো হবে। আমি নিজে যাব। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ আদায় করা হবে। অন্যথায় এ কাজের চুক্তি বাতিল করা হবে।










