দেশে কাঁঠাল উৎপাদনে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক কোনো পদ্ধতির প্রয়োগ হচ্ছে না। উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহ চেইনের কোনো পর্যায়েই দেখা যায় না প্রযুক্তির সামান্যতম ব্যবহার। ফলে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষক। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, প্রতি ১০০ কাঁঠাল উৎপাদন করতে গিয়ে গড়ে প্রায় ২ হাজার ২৭৩ টাকা আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন কৃষকরা। কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের (কেজিএফ) অর্থায়নে পরিচালিত বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএআরআই) এক প্রতিবেদনে এ পরিসংখ্যান উঠে আসে।

‘জ্যাকফ্রুট পোস্ট হারভেস্ট লস রিডাকশন অ্যান্ড মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি: ওয়েজ টু মুভ ফরোয়ার্ড’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে কাঁঠাল উৎপাদনকারী কৃষকের মাত্র ২২ শতাংশ ব্যবসার উদ্দেশ্যে ফলটি আবাদ করছেন। বাকি ৭৮ শতাংশ উৎপাদন করছেন কোনো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য ছাড়াই।

বিএআরআই বলছে, ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকরা এখন কাঁঠাল উৎপাদনে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। বিকল্প ভালো ব্যবহার না থাকায় বাজারে চাহিদা কম পণ্যটির। প্রত্যেক কাঁঠাল বিক্রি করে কৃষক পান গড়ে মাত্র ৪২ টাকা। উৎপাদন খরচ, বিপণন, সুযোগ ব্যয় ও সংগ্রহোত্তর ক্ষতি হিসাবে নিলে প্রতি ১০০ কাঁঠালে কৃষকের অর্থনৈতিক ক্ষতি দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার ২৭৩ টাকা।

এছাড়া উৎপাদনে বসতবাড়ি নির্ভরতার কারণেও ফলটির উৎপাদন কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়ানো যাচ্ছে না। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৮৬ শতাংশ কৃষক এখনো ফলটি উৎপাদনে বসতবাড়িনির্ভর। বাগানে আবাদ করছেন মাত্র ১৪ শতাংশ। অথচ বাগানে আবাদ করলে ফলটির হেক্টরপ্রতি উৎপাদন হয় আড়াই হাজার পিস। বসতবাড়িতে এ ফলনশীলতা দাঁড়ায় হেক্টরপ্রতি মাত্র ৬০০ পিসে।

অবাণিজ্যিক উৎপাদন প্রক্রিয়ার কারণে ফলটি উৎপাদন করতে গিয়ে ব্যাপক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন কৃষকরা। প্রতিবেদনের ভাষ্যমতে, এখনো দেশে কাঁঠালের পোস্ট হারভেস্ট লস বা সংগ্রহোত্তর ক্ষতি ২৫-৪৫ শতাংশ। কখনো কখনো এ অপচয়ের পরিমাণ অনেক বেশি হয়ে থাকে। দেশে প্রতি বছর প্রায় ৫০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ কাঁঠাল অপচয় হয়ে থাকে।

অন্যদিকে কাঁঠালের সংগ্রহোত্তর ক্ষতির ক্ষেত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সংস্থাটি বলছে, এর মধ্যে কৃষক পর্যায়েই ক্ষতি হচ্ছে ১৬ শতাংশ। এছাড়া আড়তদার পর্যায়ে ১০ শতাংশ, পাইকারিতে ১১ ও খুচরা পর্যায়ে ৭ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হচ্ছে। এ ক্ষতি কমিয়ে আনার পাশাপাশি কাঁঠালের বিকল্প ব্যবহার বাড়ানো গেলে কৃষকের মুনাফা বৃদ্ধি সম্ভব। মধ্যপ্রাচ্য, ইতালি, ফ্রান্স, স্পেনসহ ইউরোপের অনেক দেশেই এখন কাঁঠালের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বছরব্যাপী উৎপাদন নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রক্রিয়াকরণ বিষয়ে প্রযুক্তি সহযোগিতাকে কাজে লাগানো গেলে দেশে ও বিদেশে ফলটির চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পাবে। কাঁচা অবস্থা থেকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে বহুমুখী ব্যবহারের মাধ্যমে ফলটির অপচয় বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। তাহলে আমাদের দেশেই থাইল্যান্ড বা ভিয়েতনামের মতো কাঁঠালের চিপসসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের বাজার তৈরি করা সম্ভব।

খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যমতে, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৩৭ লাখ টন কাঁঠাল উৎপাদিত হয়, যার অধিকাংশই হয় ভারতে। দেশটিতে উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ১৮ লাখ টন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান এখন দ্বিতীয়। দেশে বর্তমানে ফলটির উৎপাদন ছাড়িয়েছে প্রায় ১০ লাখ টন। চীন উৎপাদনে তৃতীয়। এর পরই রয়েছে যথাক্রমে ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ড। পুষ্টি বিবেচনায় চীন, জাপান, মালয়েশিয়াসহ পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশই ফলটিকে প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করছে। এজন্য উৎপাদন চলমান রাখতে বাইরে থেকে কাঁঠাল আমদানিও করছে দেশগুলো।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উত্কৃষ্টমানের ও সুনির্দিষ্ট জাত উদ্ভাবন এবং পাকানোর সঠিক ও যথাযথ উপায় নির্বাচনের মাধ্যমে বিদেশে ফলটি রফতানিরও যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তবে কাঁঠালের সুনির্দিষ্ট জাত না থাকার কারণে বিদেশে রফতানি ও প্রক্রিয়াজাতের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা পোহাতে হচ্ছে। এছাড়া দেশের কাঁঠাল প্রক্রিয়াকরণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিরও অভাব রয়েছে। ফলে এটিকে প্রক্রিয়া করে রফতানি বা স্থানীয় ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না।

উপমহাদেশের কাঁঠালের জাতের মধ্যে পরিচিত জাতগুলো হচ্ছে গালা, খাজা ও দোরোসা বা রস খাজা। এখন পর্যন্ত বিএআরআইয়ের উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র ফলটির নতুন তিনটি জাত উদ্ভাবন করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

প্রতিবেদনটি তৈরির ক্ষেত্রে মুখ্য গবেষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বিএআরআইয়ের পোস্ট হারভেস্ট প্রযুক্তি বিভাগের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ফলটি যখন পাকতে শুরু করে তখন একসঙ্গে গাছের বেশির ভাগ কাঁঠালই পেকে যায়। ফলে সে সময় ৩০-৪০ শতাংশ কাঁঠাল প্রাকৃতিকভাবেই গাছ থেকে পড়ে যায়। এগুলো আর খাওয়ার উপযোগী থাকে না। কিন্তু কাঁঠালকে বাণিজ্যিকীকরণের যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে এবং পরিচর্যা ও প্রক্রিয়াজাতকৃত খাদ্যসামগ্রী তৈরিতে উদ্বুদ্ধ করা হলে ফলটিকে আমরা সারা বছরই খাওয়ার টেবিলে পেতে পারি। প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিদেশের কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বছরব্যাপী কাঁঠালের তৈরি খাদ্যসামগ্রীকে জনসাধারণের কাছে সহজলভ্য করেছে। দেশেও কাঁঠালজাত খাদ্যের বহুমুখী সামগ্রী তৈরি করতে হলে বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসতে হবে। বছরব্যাপী কাঁঠাল উৎপাদনের জন্য উপযোগী জাত ও আকৃতির বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলে উদ্যোক্তারা সারা বছরই ফলটির বহুবিধ প্রক্রিয়াকরণ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যবহার করতে পারেন।

পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাঁঠালের বহুবিদ গুণাগুণ রয়েছে। এটি মানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয় আমিষ, শর্করা ও বিভিন্ন ভিটামিনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উৎস হয়ে উঠতে পারে। বিভিন্ন রোগব্যাধি উপশমেও কাঁচা কাঁঠাল বেশ কার্যকর। এছাড়া এটি দেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও অনেক গুণ বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া এর ক্যান্সারপ্রতিরোধী গুণাগুণও রয়েছে। এর বাইরেও ফলটিতে বিপুল পরিমাণে খনিজ উপাদান রয়েছে, যা হাড় ও হাড়ের গঠন শক্তিশালী করার পাশাপাশি রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে আনতে সাহায্য করে। কাঁঠালের শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট মানবদেহকে ক্ষতিকর ফ্রি-র্যাডিক্যালস থেকে রক্ষা করে।