আয়ারল্যান্ড থেকে ২০০৯ সালে ইজারায় নিয়ে চালানো দুটি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ উড়োজাহাজ কিনে নিচ্ছে রাষ্ট্রীয় সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। ২০০১ সালে তৈরি করা পুরনো এ উড়োজাহাজ দুটি কিনতে ব্যয় হবে প্রায় ১৬৮ কোটি টাকা। এ উড়োজাহাজ দুটি ক্রয়ের আমদানি অনুমতির জন্য গতকাল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। তবে বিমানের বহরে থাকা ইজারায় নেয়া উড়োজাহাজগুলো প্রায়ই নষ্ট হয়। তাই ত্রুটিযুক্তগুলো না কিনে আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন নতুন উড়োজাহাজ কেনার পক্ষে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় চিঠিতে বলেছে, বোয়িং ৭৩৭-৮০০ এমএসএন২৮৬৪৮, এস২-এএফএল এবং এমএসএন২৮৬৫৩, এস২-এএফএম উড়োজাহাজ দুটি কিনতে আয়ারল্যান্ডের সেলেসটিয়াল এভিয়েশন ট্রেডিং ৪১ লিমিটেডের সঙ্গে গত ২৩ ডিসেম্বর চুক্তি করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। উড়োজাহাজ দুটি একই প্রতিষ্ঠান থেকে ২০০৯ সালের অক্টোবরে ড্রাই লিজের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছিল, যা বর্তমানে বিমানের বহরে
যুক্ত রয়েছে।
চিঠিতে আরো বলা হয়, বোয়িং ৭৩৭-৮০০ উড়োজাহাজের প্রত্যেকটির দাম ধরা হয়েছে ৯৭ লাখ ৮২ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার করে। সে হিসেবে স্থানীয় মুদ্রায় প্রতিটি উড়োজাহাজের দাম পড়ছে ৮৩ কোটি ৯৮ লাখ ২৭ হাজার ৬২৫ টাকা। উড়োজাহাজ দুটি ২০০১ সালে তৈরি করা এবং ২০০৯ সাল থেকে ড্রাই লিজে বিমান বহরে যুক্ত আছে, তাই পুরনো হিসেবে বিবেচনা করা হবে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের নিজস্ব অর্থ দিয়ে উড়োজাহাজ দুটি কেনা হবে। এছাড়া উড়োজাহাজ দুটির জন্য এরই মধ্যে সাধারণ বীমা করপোরেশন থেকে ইন্স্যুরেন্স পলিসি নেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কারিগরি ছাড়পত্রও পাওয়া গেছে।
বিমান বলছে, উড়োজাহাজ দুটি তাদের বহরে সংযুক্ত থাকায় জাতীয় পতাকাবাহী বিমানের যাত্রী ধারণক্ষমতা স্বাভাবিক রাখতে এবং যাত্রী সাধারণের জন্য বিমানের সেবার মান উন্নয়নে ও রাজস্ব আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। উড়োজাহাজ দুটি কেনা হলে বিমানের রাজস্ব বাড়ানোর পাশাপাশি যাত্রীদের নির্বিঘ্নে সেবা দেয়া সম্ভব হবে। তাই বিষয়টি সার্বিকভাবে বিশ্লেষণ করে উড়োজাহাজ দুটি ক্রয়ের জন্য বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের অনুকূলে ১৬৭ কোটি ৯৬ লাখ ৫৫ হাজার ২৫০ টাকা আমদানি অনুমতিপত্র ইস্যুর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে অনুরোধ জানিয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।
এ প্রসঙ্গে বিমানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, সাশ্রয়ী মূল্যের নামে কেনা কম গতিসম্পন্ন পুরনো উড়োজাহাজ দিয়ে বিমানের অভ্যন্তরীণ রুটের বেশ কয়েকটি ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে। পুরনো উড়োজাহাজগুলোতে প্রায়ই দেখা দেয় নানা সমস্যা। এতে করে অভ্যন্তরীণ রুটগুলোতে চরম শিডিউল বিপর্যয় দেখা দেয়। বারবার ইঞ্জিন বিকল হওয়ায় সেগুলো সারিয়ে আনতে মোটা অংকের ক্ষতিতেও পড়ে বিমান। তাই ত্রুটিযুক্ত পুরনোগুলো না কিনে আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন নতুন উড়োজাহাজ কেনা উচিত বলে মনে করেন এ কর্মকর্তা।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী, সচিব মো. মোকাম্মেল হোসেন এবং বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও ড. আবু সালেহ্ মোস্তফা কামালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।
বিমান সূত্র জানায়, বর্তমানে বিমানের বহরে ২১টি উড়োজাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি লিজ নেয়া। এ দুটি উড়োজাহাজ কেনা হলে লিজে নেয়া উড়োজাহাজের সংখ্যা দাঁড়াবে তিনটি। এসব বিমানের মধ্যে চারটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর, চারটি বোয়িং ৭৮৭-৪, দুটি বোয়িং ৭৮৭-৯, ছয়টি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ এবং পাঁচটি ডিসি ৮-৪০০। বর্তমানে ১৯টি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ফ্লাইট চালাচ্ছে বিমান; এর বেশির ভাগই স্বল্প বা মাঝারি দূরত্বের। এছাড়া দেশের সাতটি অভ্যন্তরীণ রুটে নিয়মিত চলছে বিমানের ফ্লাইট।
জানা গেছে, ২০১৪ সালে বিমানবহরে যুক্ত হওয়ার এক বছর পরই ড্রাই লিজে আনা বোয়িং ৭৭৭-২০০ উড়োজাহাজটির (রেজিস্ট্রেশন নং এস২-এএইসএল) একটি ইঞ্জিন বিকল হয়। পরবর্তী সময়ে ইজিপ্টএয়ার থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৮ লাখ টাকায় (১০ হাজার ডলার) ভাড়ায় আনা ইঞ্জিন দিয়ে সচল করা হয় উড়োজাহাজটি। নষ্ট ইঞ্জিনটি মেরামতের জন্য পাঠানো হয় লন্ডনের ইউনাইটেড এয়ারলাইনসে। ওই ইঞ্জিন মেরামত করে ফেরত আনার আগেই আবারো নষ্ট হয়। আবারো ইজিপ্টএয়ার থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৮ লাখ টাকা ভাড়ায় আনা হয় আরেকটি ইঞ্জিন। বিকল ইঞ্জিনটি মেরামতের জন্য আবার পাঠানো হয় ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের কাছে। বারবার ইঞ্জিন নষ্ট হওয়ায় বিপত্তির মধ্যে পড়ে বিমান। অন্যদিকে শর্ত অনুযায়ী পাঁচ বছর না হওয়ায় চুক্তি বাতিলও করতে পারছিল না বিমান কর্তৃপক্ষ। ফলে উড়োজাহাজ দুটি ব্যবহার না করেই ভাড়া দিতে হচ্ছিল বিমানকে। একই রকমভাবে লিজে নেয়া অন্যান্য উড়োজাহাজেও প্রায়ই ত্রুটি দেখা দেয়।
বিমান কর্মকর্তারা জানান, ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে জাতীয় পতাকাবাহী এ বিমান সংস্থা বেশির ভাগ অর্থবছরে লোকসান করেছে। তবে ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৫৮ কোটি টাকা মুনাফা করেছে বিমান। বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারী শুরুর (২০২০-২১) অর্থবছরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস লিমিটেডের যাত্রী কমেছে ৫২ শতাংশ। ফলে সংস্থাটির মোট রাজস্ব আহরণ আগের বছরের চেয়ে কমেছে ১৮ শতাংশ। তবে একই সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত এ সংস্থাটি তাদের পরিচালন ব্যয় ৩০ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা কমিয়েছে। এতে করে আগের অর্থবছরে বিমান বাংলাদেশ ৮১ কোটি টাকা লোকসান করলেও গত অর্থবছর শেষে লাভ করেছে ১৫৮ কোটি টাকা।










