২৮ ডিসেম্বর উদ্বোধন হবে উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেলের একাংশ। মেট্রোটির পরিকল্পনা ও নির্মাণ পর্যায়ে সম্পৃক্ত প্রকৌশলী, আনুষঙ্গিক অবকাঠামো এবং মেট্রোয় ভ্রমণের নানা খুঁটিনাটি নিয়ে বণিক বার্তার ধারাবাহিক আয়োজনে আজ প্রকাশিত হলো তৃতীয় পর্ব 

পুরোপুরি উড়ালপথে তৈরি হচ্ছে ঢাকার প্রথম মেট্রোরেল। ২০ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ এ উড়ালপথ তৈরি করা হয়েছে মাটির প্রায় ১৩ মিটার ওপরে। একের পর এক পিয়ার দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে উড়ালপথ। এ পথের ভিত শক্তিশালী করতে পিয়ারগুলোতে মাটির গভীর পর্যন্ত পাইল করতে হয়েছে। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) তত্ত্বাবধানে মেট্রোর অবকাঠামো তৈরির কাজ করেছে বিভিন্ন দেশী-বিদেশী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। মেট্রোরেলের ভিত বা ফাউন্ডেশন গড়তে সময়ে সময়ে পরামর্শ দিয়েছেন এবং নানা কাজে সম্পৃক্ত থেকেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থীদের কাছে ‘ফাউন্ডেশনের গুরু’ হিসেবে খ্যাত অধ্যাপক আবুল মোকররম মোহাম্মদ শফিউল্লাহ। প্রকল্পের ‘প্যানেল অব এক্সপার্টস’ দলের দেশী সদস্য হিসেবে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে গেছেন তিনি।

স্বভাবগতভাবে প্রচারবিমুখ এ প্রকৌশলী মেট্রোরেল প্রকল্পে কাজ করেছেন নেপথ্যে থেকে। মেট্রোর গতিপথের মাটি ও মাটির গঠন অনুযায়ী ভূমিকম্প সহনীয় অবকাঠামো নির্মাণকাজে দেশী-বিদেশী প্রকৌশলীদের সবসময় সহায়তা করেছেন। উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেলের যেসব পিয়ার তৈরি করা হয়েছে, সেগুলোর উচ্চতা ১২-১৩ মিটারের মতো। উচ্চতা তুলনামূলক কম হওয়া সত্ত্বেও পিয়ারগুলো মাটির ওপরে খুব বেশি জায়গা নেয়নি। সড়ক বিভাজকের মধ্যেই পিয়ারগুলোর ব্যাপ্তি সীমিত রাখা সম্ভব হয়েছে। কাজটিতে দেশী-বিদেশী প্রকৌশলীদের মধ্যে অধ্যাপক শফিউল্লাহর অবদান সবচেয়ে বেশি বলে মনে করেন স্থপতি ইকবাল হাবীব।

এ সম্পর্কে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকার মাটির কাঠামো সব জায়গায় এক রকম নয়। মেট্রোরেলের গতিপথেও বিভিন্ন স্থানে মাটির ভিন্নতা রয়েছে। মেট্রোরেলের যে স্ট্রাকচারগুলো আমরা দেখি, কাঠামোগত দিক দিয়ে অনেক বড় বড় পিয়ার না। পিয়ারগুলোর যে ব্যাপ্তি, সেটা দেখবেন তুলনামূলক ছোট। তার অন্যতম গুণগত কারণ ছিল শফিউল্লাহ স্যারের এ বিষয়ে কন্ট্রিবিউশন। উত্তরা এলাকায় বালিমাটি, মিরপুরে লালমাটি আর মধ্য ঢাকার মাটি কিছুটা মিশ্র। মাটির এ গঠনগত ভিন্নতা বিশ্লেষণ করে সে অনুযায়ী মেট্রোরেলের অবকাঠামো নির্মাণে শফিউল্লাহ স্যার ছিলেন অগ্রগণ্য একজন।’

‘জামিলুর রেজা চৌধুরী স্যারের মধ্যে অন্য একটা ব্যাপার ছিল। এসটিপি ও আরএসটিপি (সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা) দুটোই প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে তিনি শুধুু মেট্রোর কাঠামোগত গঠনই দেখেননি, বরং এর গণপরিবহনভিত্তিক সর্বাঙ্গীণতা নিয়ে কাজ করেছেন। রুটগুলোর ব্যাপারে, কোন কোন জায়গায় গণমানুষের অতিরিক্ত চলাচলের প্রকোপ আছে, সেই করিডোরগুলোকে চিহ্নিত করার ব্যাপারে ওনার বিশাল অবদান আছে। অন্যদিকে কাঠামো তৈরিতে বাংলাদেশের নিজস্ব প্রকৌশলগত জ্ঞান এবং দেশীয় যে প্রযুক্তিগত ধ্যান-ধারণা তা কাজে লাগাতে অবদান রেখেছেন অধ্যাপক শফিউল্লাহ। পাশাপাশি তিনি আমাদের এখানকার যারা প্রকৌশল দক্ষতায় দক্ষ হতে চায়, তাদের জন্য একটা বড় দুয়ারও খুলে দিয়ে গেছেন’— বলেন ইকবাল হাবীব।

অধ্যাপক শফিউল্লাহ ছিলেন ভূ-প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ। ২০০৬-২০১০ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন বুয়েটের দশম উপাচার্য হিসেবে। পুরকৌশল ও ভূ-প্রযুক্তিতে বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন দেশের একাধিক বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পে। ট্রান্সমিশন টাওয়ার, স্টেডিয়াম, বন্দর ও জেটি, সড়কের ‘সফট গ্রাউন্ড’সহ বড় বড় সেতু নির্মাণকাজে সম্পৃক্ত থেকেছেন। যমুনা নদীতে বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণ প্রকল্পের ‘প্যানেল অব এক্সপার্ট’ দলে ভূ-প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেছেন। উপকূলীয় এলাকায় সাইক্লোন শেল্টার কর্মসূচির আওতায় মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজে সম্পৃক্ত থেকেছেন। সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের ‘প্যানেল অব এক্সপার্টস’ দলেও। ২০১৮ সালের ২০ মার্চ তিনি মেট্রোরেল প্রকল্পের ‘প্যানেল অব এক্সপার্টস’ দলে দেশী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। ২০২১ সালের ২৪ এপ্রিল মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করে যান তিনি।

ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী, ড. আইনুন নিশাত, ড. শামীম জেড বসুনিয়া ও ড. এএমএম শফিউল্লাহ—এ চার প্রকৌশলী সম্মিলিতভাবে বঙ্গবন্ধু সেতু, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ দেশের বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন বলে মনে করেন স্থপতি ইকবাল হাবীব। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে এ মানুষগুলোই পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলের মতো বড় প্রকল্পের মূল দায়িত্বগুলো পালন করেছেন। তাদের পারস্পরিক যূথবদ্ধতায় আসলে আমরা মেট্রোরেল এবং পদ্মা সেতুতে অভাবনীয় দেশজ জ্ঞাননির্ভর, সাশ্রয়ী ও স্থান উপযোগী কাঠামো তৈরিতে সক্ষম হলাম।’

এর মধ্যে অধ্যাপক শফিউল্লাহ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘শফিউল্লাহ স্যারকে ফাউন্ডেশনের ব্যাপারে সবাই গুরু মানত। বিভিন্ন কাজ করতে গিয়ে আমরা যখনই ফাউন্ডেশন সম্পর্কিত কোনো ঝামেলায় পড়েছি, তাত্ক্ষণিকভাবে স্যারের দ্বারস্থ হয়েছি। হাতিরঝিল যখন আমরা করি, তখন শফিউল্লাহ স্যারের মতো মানুষরা না থাকলে বাংলাদেশের প্রকৌশলবিদ্যা এবং স্থাপত্যবিদ্যা দিয়ে হঠাৎ করে হাতিরঝিলের মতো বড় প্রকল্প করা সম্ভব হতো না।’