দেশে একজন ব্যক্তি নিজের জিম্মায় নগদে কত টাকা রাখতে পারবেন, সে বিষয়ে আইনে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই। বৈধ আয়ের উৎস দেখাতে পারলে যেকোনো অংকের নোট নিজের কাছে সংরক্ষণ করা সম্ভব। তবে প্রতিবেশী দেশ ভারতে সর্বোচ্চ ২০ লাখ রুপি নগদে রাখা যায়। এর চেয়ে বেশি অংকের অর্থ হলে সেটি রাখার কারণ ব্যাখ্যা করতে হয়। 

দেশে প্রচলিত মানি লন্ডারিং আইন অনুযায়ী, ২৭ ধরনের অপরাধকে এ আইনের অধীনে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। এ আইনের সংজ্ঞা অনুযায়ী, অর্থ বা সম্পত্তি পাচারের অর্থ হচ্ছে দেশের বিদ্যমান আইন লঙ্ঘন করে দেশের বাইরে অর্থ বা সম্পদ পাঠানো কিংবা রক্ষণ করা। দেশের বাইরে এমন অর্থ বা সম্পত্তি, যাতে বাংলাদেশের স্বার্থ রয়েছে, কিন্তু তা আনা হয়নি, তাও মানি লন্ডারিং। আবার বিদেশ থেকে প্রকৃত পাওনা দেশে না আনা কিংবা বিদেশে প্রকৃত দেনার অতিরিক্ত টাকা পরিশোধ করা এ আইনে অপরাধ বলে বিবেচিত হয়। মানি লন্ডারিং আইনের অধীনে উল্লেখযোগ্য অপরাধের মধ্যে রয়েছে দুর্নীতি ও ঘুসের মাধ্যমে সম্পদ অর্জন, মুদ্রা জাল করা, দলিল-দস্তাবেজ জাল করা, চাঁদাবাজি, প্রতারণা, জালিয়াতি, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসা, অবৈধ মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের ব্যবসা, চোরাই ও অন্যান্য দ্রব্যের অবৈধ ব্যবসা, অপহরণ, অবৈধভাবে আটক রাখা, খুন ও মারাত্মক শারীরিক ক্ষতি, নারী ও শিশু পাচার, চোরাকারবারি, দেশী-বিদেশী মুদ্রা পাচার, চুরি,–ডাকাতি,–দস্যুতা,–জলদস্যুতা বা বিমানে দস্যুতার মতো অপরাধ। 

দেশের আনুষ্ঠানিক (ফরমাল) অর্থনীতির প্রধান উৎস হলো ব্যাংক। অর্থনীতির সিংহভাগ আবর্তিত হচ্ছে ব্যাংক খাতকে ঘিরে। গত এক বছরে ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৮ দশমিক ৪০ শতাংশ। যদিও এর চেয়ে প্রায় তিন গুণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ব্যাংকের বাইরে চলে যাওয়া নগদ অর্থের। গত এক বছরে অর্থনীতিতে নগদ অর্থের প্রবাহ বেড়েছে ২৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ। ব্যাংকের বাইরে চলে যাওয়া নগদ এ অর্থ অনানুষ্ঠানিক বা ছায়া অর্থনীতিকে আরো বড় ও শক্তিশালী করে তুলছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জুন শেষে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইস্যু করা নগদ অর্থের পরিমাণ ৩ লাখ ১১ হাজার ৯৪৭ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। এর মধ্যে ব্যাংকের বাইরে গেছে ২ লাখ ৯১ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা। দেশের ব্যাপক মুদ্রার (ব্রড মানি) প্রায় ১৬ শতাংশই এখন নগদ অর্থ হিসেবে ব্যাংকের বাইরে রয়েছে। আর জুন শেষে দেশের নগদনির্ভর অর্থনীতির আকার দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৮২ হাজার ৯১২ কোটি টাকা। দেশের অর্থনীতিতে এত বেশি পরিমাণ নগদ টাকা এর আগে কখনই দেখা যায়নি।

যদিও সাধারণ জনগণের হাতে এ মুহূর্তে নগদ টাকার অভাব দেখা যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতির বাজারে জীবিকা নির্বাহ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে মানুষ। এ অবস্থায় রেকর্ড পরিমাণ নগদ অর্থ এখন কাদের হাতে সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা। 

ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের গন্তব্য নিয়ে কয়েক বছর ধরেই কথা উঠছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো অনুসন্ধান করতে দেখা যায়নি। বরং ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ চলে যাওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিনিয়ত নতুন টাকা ছাপিয়ে যাচ্ছে। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক বলেন, ‘আমরা ধরে নিচ্ছি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ছাপানো টাকা জনগণের হাতে আছে। হুন্ডিসহ অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির আকার বড় হয়ে ওঠার কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। আমি দেখছি, মূল্যস্ফীতির কারণে জনগণের ব্যয় বেড়ে গেছে। এ কারণে নগদ অর্থের প্রয়োজনীয়তাও বেড়েছে। আবার নেতিবাচক প্রচারের কারণে আতঙ্কিত কিছু গ্রাহক ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিয়ে নিজের কাছে রাখছেন। মূল্যস্ফীতির চেয়ে আমানতের সুদহার কম হওয়ায় মানুষ টাকা তুলে ভিন্ন খাতে বিনিয়োগও করে থাকতে পারেন।’

গত অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে মাত্র ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত রেমিট্যান্স প্রবাহ না বেড়ে উল্টো কমেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রফতানি খাতে ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও আমদানি ১৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ কমেছে। এর মধ্যে অর্থবছরের শেষ মাস জুনে আমদানি কমেছে ৩৩ শতাংশেরও বেশি। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহও আটকে গেছে ১০ শতাংশের ঘরে। নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে চলছে স্থবিরতা। বিপরীত চিত্র মূল্যস্ফীতি ও টাকার অবমূল্যায়নের ক্ষেত্রে। গত জুলাইয়েও দেশের মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৬৯ শতাংশ। আর গত এক বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণ হলো দেশে নগদ অর্থের বড় অংশই এখন অপরাধমূলক অর্থনীতির বিস্তারে ব্যবহৃত হচ্ছে। হুন্ডির বাজার আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বড় হয়েছে। একই সঙ্গে বাড়ছে ঘুস-দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত কালো টাকার দৌরাত্ম্য। দেশের বিমানবন্দর ও সীমান্ত এলাকা ঘিরে স্বর্ণ চোরাচালানের আন্তর্জাতিক চক্রও শক্তিশালী হয়েছে। মাদক ব্যবসা, অবৈধ মজুদদারিসহ নগদনির্ভর অন্যান্য লেনদেনও বাড়ছে। ব্যাংকের ওপর আস্থার ঘাটতি তৈরি হওয়ায় মানুষ স্থায়ী সম্পদ তথা রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। আর আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অসৎ রাজনীতিবিদ ও দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তারা নগদ অর্থ জমা করছেন। এসব কারণে অর্থনীতিতে নগদ অর্থের প্রবাহ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়ে গেছে। তবে নগদ প্রবাহ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ার জন্য উচ্চ মূল্যস্ফীতিরও দায় রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা দাবি করেছেন।

দেশের অর্থনীতি বড় হলে অর্থের পরিমাণ ও চাহিদা বাড়বে এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশে যে হারে নগদ অর্থের চাহিদা বাড়ছে সেটি অস্বাভাবিক। শুধু গত পাঁচ বছরেই দেশের ব্যাংক খাতের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ অন্তত ১০৭ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৮ সালের জুন শেষেও ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৪০ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুন শেষে এ অর্থের পরিমাণ ২ লাখ ৯১ হাজার ৯১৩ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। এ হিসাবে পাঁচ বছরের ব্যবধানে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ বেড়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা।

অনেক আগেই লেনদেন ব্যবস্থা প্লাস্টিক মানি বা কার্ডে রূপান্তর করেছে উন্নত বিশ্ব। যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের দেশগুলো এখন ঝুঁকছে ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ভার্চুয়াল মুদ্রায়। চীন চালু করেছে নিজস্ব ই-কারেন্সি ব্যবস্থা। বিশ্বের অনেক দেশেই এখন নগদে বড় অংকের অর্থ লেনদেন দুরূহ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের লেনদেন ব্যবস্থা ডিজিটাল করে তোলার গল্প শোনা যাচ্ছে কয়েক বছর ধরে। কিন্তু দেশের মানুষ নগদ টাকা ঘরে রাখার প্রবণতা থেকে বেরোতে পারেনি। উল্টো দেশের মানুষ আগের তুলনায় বেশি নগদ অর্থ নিজেদের কাছে রাখছেন। গত এক বছরে নগদে টাকা তোলার প্রবণতা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে বলে ব্যাংক নির্বাহীরা জানিয়েছেন। 

দেশের দুটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী বণিক বার্তাকে বলেছেন, ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া গ্রাহকরাও এখন নগদ টাকা তুলে নিতে আসছেন। অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে অনুমোদন হওয়া ঋণ নগদে উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে অর্থের গন্তব্য সম্পর্কে তেমন কোনো প্রমাণ থাকছে না। নগদে উত্তোলন করা ঋণের বড় অংশ আর ব্যাংকে ফিরছে না। অনিয়মের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে নেয়া অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। আবার অনেকে ডলার, স্বর্ণ, জমিসহ স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি কিনে রাখছেন। এখন ডলারের সংকট থাকায় টাকা জমিয়ে রাখা হচ্ছে।

সম্প্রতি দেশের সবক’টি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার বৈঠকে বসেন। ওই বৈঠকে ব্যাংকের বাইরে থাকা অর্থ ব্যাংকে ফেরানোর উদ্যোগ নিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে তাগিদ দেয়া হয়। যদিও গভর্নরের সে নির্দেশ কোনো কাজে আসছে না বলে ব্যাংক নির্বাহীরা জানিয়েছেন। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘নেতিবাচক কর্মকাণ্ড ও প্রচারের কারণে দেশের ব্যাংক খাতের প্রতি কিছুটা হলেও গ্রাহকদের আস্থায় চিড় ধরেছে। আবার আমানতের সুদহারও এখন মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। ব্যাংকে টাকা রাখলে সরকারকে ভ্যাট-ট্যাক্সও দিতে হয়। এসব কারণে মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা তুলে জমি-জমা কিনছেন। অনেকে নগদ অর্থ নিজেদের কাছেও রাখছেন। আস্থা পুরোপুরি ফিরে না আসা পর্যন্ত ব্যাংকের আমানত প্রবৃদ্ধি বাড়ানো কঠিন।’

একটি দেশের অর্থনীতিতে কী পরিমাণ নগদ অর্থ থাকবে সেটির একটি আদর্শ অনুপাত রয়েছে। কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ব্যাপক মুদ্রার (ব্রড মানি) সর্বোচ্চ ১২ শতাংশ। ২০২০ সালে কভিডসৃষ্ট দুর্যোগের মধ্যে এ অনুপাত কিছুটা বেড়ে যায়। তার পরও ২০২১ সালের জুনে ব্যাংকের বাইরে ছিল ব্যাপক মুদ্রার সর্বোচ্চ ১৩ দশমিক ৪২ শতাংশ। ২০২২ সালেও এটি ১৩ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু চলতি বছর এ অনুপাত ১৬ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সঞ্চয়হীনতা আর ঋণের দুষ্টচক্রে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি আটকে গেছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের এ চেয়ারম্যান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হুন্ডি, হাওলা আর অর্থ পাচারের মতো অপরাধের কারণে দেশের আনুষ্ঠানিক অর্থনীতি বড় হতে পারছে না। উল্টো অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি বড় হয়ে যাচ্ছে। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থপ্রবাহ বাড়ালে তা আনুষ্ঠানিক খাতের চেয়ে অনানুষ্ঠানিক খাতে বেশি ব্যবহার হচ্ছে। বিশেষ করে অর্থনীতির অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের মাত্রা বাড়ছে।’